skip to Main Content

সঙ্গানুষঙ্গ I বিগলিত বিস্ময়

উপচে পড়া পানি, বয়ে চলা স্রোত কিংবা সাগরের ঢেউয়ের মতো; যা আটকে থাকে না ধরাবাঁধা নিয়মে। নেই জ্যামিতিক সমীকরণ। ফ্যাশন অনুষঙ্গ তৈরির এমনই এক আবেদন

দৃশ্যমান বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করে না অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট। দেখে মনে হয় যেন আঁকিবুঁকি কাটা হয়েছে ক্যানভাসে। যেখানে আবেগই প্রধান। অনুভূতিই নিয়ন্ত্রক। ফলে প্রতিটি ছবি হয়ে ওঠে অনন্য। ধারণ করে নিজস্বতা। বিজ্ঞান আর অঙ্কের নিয়মের বাইরে, চিত্রশিল্পের এই ধারার মতোই ফ্যাশন মোটিফ—‘মেল্ট’। ফ্যাশনে এই অ্যাসথেটিকের নাম মেল্টেড।
দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি
ক্যানভাসে আঁকা চিত্রশিল্প থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া ফ্যাশনের জন্য নতুন নয়। মেল্ট মোটিফের বিষয়টিও তাই। গেল শতকের বিশের দশকে স্বাধীন চিন্তা-চেতনার আলাপে যখন সজাগ হয়ে উঠেছিল ফ্রান্সের প্যারিস, সেখান থেকে বিশ্বময় শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আলাপ। সব যুক্তিবাদী চিন্তা পাশ কাটিয়ে গুরুত্ব পেয়েছিল মানুষের অবচেতন আর উন্মুক্ত হতে চাওয়া মনের অনুভূতিগুলো। এই ইচ্ছার নাম দেওয়া হয় পরাবাস্তববাদ আন্দোলন, যার সাক্ষ্য দেয় বিখ্যাত স্প্যানিশ আর্টিস্ট সালভাদর দালির আঁকা ‘দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি’। বাংলায় এর অর্থ স্মৃতির স্থায়িত্ব। পরাবাস্তববাদী ছিলেন দালি। তুলির আঁচড়ে অলীকতা সৃষ্টি করতেন। বাস্তবের সঙ্গে মিল না থাকলেও জিজ্ঞাসু মনের অদ্ভুত চেতনাগুলোর সঙ্গে মিলে যেত। স্বপ্ন ও বাস্তবতা এক হতো তার শিল্পে। তৈরি হতো পরাবাস্তবতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্প ও সাহিত্যে এই চিন্তাধারার সূত্রপাত ঘটে; যা সাধারণ যুক্তিবাদ ও প্রথাগত বাস্তবতার বিরুদ্ধে একধরনের শৈল্পিক ও দার্শনিক বিদ্রোহ। এটি ছিল চেতনা ও অবচেতনের মধ্যকার সেতু।
১৯৩১ সালে আঁকা এই চিত্রকর্মে গলতে থাকা ঘড়িগুলো সময়ের সঙ্গে স্মৃতির পরিবর্তনশীলতাকে চিহ্নিত করে। যেন সময় ও স্মৃতি—দুটোই তরল এবং বহমান। অর্থাৎ দুটোই সমানতালে বদলায়। ধারণা করা হয়, দালি তার পরাবাস্তবধর্মী এই কর্মের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণ এবং অবচেতন মনসম্পর্কিত তত্ত্ব থেকে; যেখানে মনুষ্য মন কোনো নিয়ম বা নিয়ন্ত্রণে আটকে না থেকে ইচ্ছেমতো পথ চলতে চায়। শৃঙ্খলার কাছে হার মানতে নারাজ, ধারণ করে বহমানতা।
সে সময় দালির এই চিত্রকর্মে ভীষণ অনুপ্রাণিত হন ইতালীয় ফ্যাশন ডিজাইনার এলসা স্ক্যাপারেল্লি। পরাবাস্তববাদী শিল্পীদের সঙ্গে মিলে তৈরি করেন বেশ কিছু ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ। নিয়মিত আকৃতির বাইরে একেবারে অন্য রকম কিছু। সংগ্রহে ছিল দ্য শু হ্যাট, ব্যুরো ড্রয়ার স্যুট ও টেলিফোন পার্স। ঠিক মেল্টেড ধাঁচের না হলেও তার কাজ ফ্যাশনে পরাবাস্তব মোটিফের প্রচলন ঘটায় এবং পরবর্তী নকশাগুলোর ভিত্তি স্থাপন করে।
ফ্লুইড ডিজাইন
সব সময় নতুন কিছু চায় ফ্যাশন। সেই সূত্রে দ্রুতই পসার পেয়েছিল মেল্ট মোটিফ। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, মোমের ছাঁচ এবং ধাতু খোদাই করে তৈরি প্রবাহিত, তরলের মতো পৃষ্ঠতলযুক্ত আংটি, কানের দুল এবং নেকলেস দেখা যেত আন্তর্জাতিক ফ্যাশন রানওয়েতে। নির্দিষ্ট আকারহীন ও জ্যামিতিক নিয়মের বাইরে, প্রতিটি পিসই হতো অনন্য। শুরুতে এগুলোর গঠনকে বলা হতো ফ্লুইড ডিজাইন। পরে স্বল্পমূল্যে এ ধরনের ডিজাইন তৈরিতে ব্যবহার করা হতো রেজিন। তবে গয়না থেকে পোশাকের অনুষঙ্গ, এমনকি জুতায় বসানো নকশায়ও বেশি ব্যবহৃত হতো সোনা, রুপা ও ব্রোঞ্জের মতো মেটালে তৈরি মেল্ট মোটিফ।
লিকুইড রেভল্যুশন
১৯৭০ সালে লাক্সারি জুয়েলারি ব্র্যান্ড টিফানি অ্যান্ড কোম্পানির হয়ে বোন কাফ ডিজাইন করেছিলেন এলসা পেরেত্তি। অসম ও তরলসদৃশ নকশার এই গয়না হয়ে উঠেছিল সে সময়ের অন্যতম আইকনিক পিস। বিষয়টি নজর এড়ায়নি হাই-ফ্যাশন মহলে। সুগঠিত জ্যামিতিক নকশা থেকে বেরিয়ে গয়নার নকশায় যুক্ত হয়েছিল মেল্ট থিম। দেখে মনে হতো যেন শরীরের ওপর গড়িয়ে পড়া তরল। গয়নাটিকে এমনকি শরীরেরই অংশ মনে হতো। ফ্যাশন অনুষঙ্গের ধারায় এই পরিবর্তনের নাম দেওয়া হয় মেল্টেড মেটাল রেভল্যুশন।
নন-ট্র্যাডিশনাল স্টাইল
কাটছাঁট ধাঁচ ও সুবিন্যস্ত নিয়মের বাইরে অনিয়মিত কৌশলে তৈরি হয় মেল্টেড স্ট্রাকচারের অ্যাকসেসরিজ। এ সময় যখন ফ্যাশনে আবারও পথ তৈরি করছে ম্যাক্সিমালিজম, তখন এই ধারার অনুষঙ্গগুলোও নজরে আসতে শুরু করেছে। ফ্যাশন অ্যাসথেটিকে দেখা মিলছে ড্রিপিং ইয়াররিং, লিকুইড কাফ ব্রেসলেট, মোল্টেন রিং এবং পেনডেন্ট বা চোকার। লাক্সারি ফ্যাশনে মেল্ট মোটিফে তৈরি মেটাল বা রেজিনের করসেট টপের ঘটেছে আবির্ভাব। ব্যাগ ও জুতায়ও করা হচ্ছে মেল্ট মোটিফের নকশা। আরও রয়েছে ঢেউখেলানো আকৃতির সানগ্লাস। ম্যাক্সিমালিস্ট আবহের হলেও মিনিমালিস্টিক উপায়েও স্টাইল করা যেতে পারে এই মোটিফের গয়না, ‘লেস ইজ মোর’ কৌশলে।

 আবৃতি আহমেদ
মডেল: অমৃতা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব ও জুয়েলারি: সারিয়াল ফরেস্ট বাই হিবা শরফুদ্দীন
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top