ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন I কাঠগড়ায় পশ্চিম
ছিনতাইয়ের অভিযোগ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে! প্রথমে দুই শ বছরের ব্রিটিশ শাসন; আর আজকাল দক্ষিণ এশীয় বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নিহিত ফ্যাশন উপাদান তারা চালিয়ে দিচ্ছে নিজেদের নামে। তল্লাশে আবৃতি আহমেদ
বিভিন্ন সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া ফ্যাশনের জন্য নতুন নয়। তবে কোনো চর্চার শিকড়কে স্বীকার না করে সেটি নিজের বলে ইচ্ছেমতো নামকরণের চেষ্টা গুরুতর অপরাধই বটে। এমন ঘটনা ঘটছে একের পর এক। অপরাধী হিসেবে বারবার আসছে একই নাম—পশ্চিমা ফ্যাশন বিশ্ব। দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী নানা ফ্যাশন চর্চাকে প্রথমে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিলেও পরে সেগুলোর পুরো ইতিহাস ও উৎসকে অস্বীকারের নজির আছে তাদের; বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে পশ্চিমাকৃত ফ্যাশনের ক্ষেত্রে। পোশাক থেকে অনুষঙ্গে—সবই আছে সেই বিতর্কে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্কার্ফ বিতর্ক
সাধারণ দৈর্ঘ্যের স্কার্ফের চেয়ে বেশ লম্বা এক টুকরা কাপড় গলায় জড়াচ্ছেন পশ্চিমা ফ্যাশনিস্তারা। গাউন বা মিডি ড্রেসের সঙ্গে, টিকটক-ইনস্টাগ্রামে অহরহ দেখা যাচ্ছে ছবি। এটা নাকি নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড; আর গলায় জড়ানো কাপড়কে বলা হচ্ছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্কার্ফ! শুধু তা-ই নয়, ফিটেড নি-লেন্থ টপ ও ঢিলেঢালা প্যান্টের সঙ্গেও এই স্কার্ফ পরে সেটিকে বলা হচ্ছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্টাইল। এতে বেশ চটেছেন দক্ষিণ এশীয়রা। কারণ, স্টাইলটি মিলে যায় এই অঞ্চলের সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে। আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্কার্ফ? সেটি তো দক্ষিণ এশীয় নারীদের হাজার বছর পুরোনো ওড়না; যাকে ভারতীয় ও পাকিস্তানিরা বলেন দোপাট্টা! নেপালিরা ডাকেন চুনারি। মালদ্বীপে ধোবাট্টা, শ্রীলঙ্কায় সিনহালা আর আফগানিস্তানে চাদ্দার নামে চল এর। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে শুধু ভুটানেই ওড়নার ব্যবহার খুব একটা নেই। সেখানকার নারীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গে এক কাঁধে রঙিন রাচু পরেন, আর নারী-পুরুষ সবার পরনে থাকে চাদরের মতো খাবনি।
এই অঞ্চলের ওড়না পশ্চিমে গিয়ে কীভাবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্কার্ফ হয়ে গেল, সেই অনুসন্ধানে জানা যায়, বিপ্টি নামের একটি রেন্টাল ফ্যাশন ব্র্যান্ড ওড়নাকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্কার্ফ আখ্যা দিয়ে টিকটকে একটি ভিডিও দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয় তাদের। বিতর্ক বাধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শুরু হয় লেখালেখি। সরব প্রতিবাদ জানায় ভারতীয় গণমাধ্যম। এটি ২০২৪ সালের ঘটনা। সে সময় বিতর্কের মুখে ক্ষমা চেয়ে বিপ্টির প্রতিষ্ঠাতা স্বীকার করেন, শৈলীটি ইউরোপীয় ছিল না। এই ধরনের নামকরণ ভুল ছিল বলেও দায় স্বীকার করেন তারা। কিন্তু এর পরেও ওড়নাকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান স্কার্ফ বলতে পিছপা হন না অনেক পশ্চিমা-ফ্যাশনিস্তা। অবশ্য দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির প্রতি তাদের এমন আচরণ নতুন নয়।
এখান থেকে ওখানে
একের পর এক রাজত্বের শাসন-শোষণে অনেক কিছু হারালেও কিছু যুক্ত হয়েছে লাভের খাতায়; বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে। মৌর্য ও গুপ্তদের সাড়ে তিন শ বছরের শাসন; তারপর ভারতবর্ষে প্রবেশ মুসলিম শাসকদের। দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠা করে আরও তিন শ বছর ধরে একে একে শাসন করেন মামলুক, খিলজি, তুঘলক, সাইয়্যেদ ও লোদীরা। এরপর শুরু হয় মোগল সাম্রাজ্য। এসব শাসনকালে অনেক বহিরাগত ফ্যাশন প্রবেশ করেছে এই অঞ্চলে। পারস্য, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান থেকে সেখানকার ফ্যাশনও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল শাসকগোষ্ঠী। এখানকার আবহ আর আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল সেগুলো। আজও ভারতীয় পোশাক থেকে গয়নার অনুপ্রেরণায় দেখা যায় সেসব ধাঁচ; বিশেষ করে বিলাসবহুল ফ্যাশনে। এই অঞ্চলের রাজা-রাজ্য কিছুটা হলেও পেয়েছিলেন ব্রিটিশরা। মোগলদের রেখে যাওয়া সম্পদের মধ্যে পোশাক থেকে অনুষঙ্গ—সবই দখল করেছিলেন তারা। ঘটেছে পাচারের ঘটনাও। ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান লুট’-এর কথা কে না জানে! পোশাক-আশাক, গয়না আর পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রত্ন কোহিনূর; যা আজও শোভা পায় ব্রিটিশ রাজপরিবারে।
পুরোনো কথা বলে এই তর্ক এড়িয়ে যেতে চাইলেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেন না পশ্চিমারা। কারণ, দক্ষিণ এশিয়া তাদের ফ্যাশন অনুপ্রেরণা হলেও স্বীকৃতি দেওয়ার বেলায় কিপটেমি কারোরই চোখ এড়ায় না। যেমন এ বছরের মেট গালায় ফ্যাশন ব্র্যান্ড সেইন্ট লরেনের একটি পোশাক পরে এসেছিলেন রোড কসমেটিকসের স্বত্বাধিকারী হেইলি বিবার। ফিটেড স্কার্ট, করসেট টপ এবং গলায় লম্বা ওড়না—পোশাকটি দেখাচ্ছিল লেহেঙ্গার মতো। কিন্তু ভোগ ম্যাগাজিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে পোশাক নিয়ে তেমন কিছুই বলেননি তিনি। এ নিয়ে ভিডিওর কমেন্টে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। বলেছেন, অনুপ্রেরণার জায়গাগুলো অন্তত স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কেউবা প্রশ্ন তুলেছেন, দক্ষিণ এশীয় মানে যাদেরকে তৃতীয় বিশ্ব বলেন পশ্চিমারা, সে জন্যই কি স্বীকৃতি দিতে এত অনীহা?
এই অঞ্চলের কোমরবন্ধনী ওখানে গিয়ে হয়ে গেছে ব্রিটিশ অভিজাতদের কোমরে পরিহিত ব্যাক-টাই। পরবর্তী সময়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে ছেলেদের বেল্ট আর মেয়েদের স্টাইলিস্ট ওয়েস্ট চেইনের। পশ্চিমারা যে নরম-আরাম সুতি কাপড়কে সিরসাকা নাম দিয়েছেন, সেটি এসেছে ফারসি ‘শির-ও-শক্কর’ থেকে। এর অর্থ দুধ ও চিনি। দুধের মতো মসৃণ কাপড়ে চিনির দানার মতো বুননের কারণে এমন নামকরণ। এই অঞ্চলের লুঙ্গি ও গামছার ছাপ মার্কিন ডিজাইনার রালফ লরেনের ছোঁয়ায় হয়ে গেছে মাদ্রাজ প্রিন্ট। ভারতীয় কোলাপুরি চপ্পলের নকশায় স্যান্ডেল বানিয়ে লাখ টাকায় বিক্রি করছে প্রাডা। এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বন্ধনী ছাপশিল্প আর চুনরি প্রিন্ট নিয়ে কাজ করছে ডিওর এবং লুই ভিতোঁ। নাম দিয়েছে হ্যান্ড-ডাই লাক্সারি প্রিন্ট। জারদৌসির নকশার নামকরণ করেছে কতুর মেটালিক এমব্রয়ডারি বা হ্যান্ড এমবেলিশমেন্ট। নেহরু জ্যাকেটকে নাম দিয়েছে ম্যান্ডারিন কলার জ্যাকেট। কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী পেইজলি বুননকে প্রিন্টে তৈরি করছেন পশ্চিমারা। নাম দিয়েছেন লাক্সারি পেইজলি প্রিন্ট। এগুলোর ভারতীয় শিকড়কে প্রায়ই অস্বীকার করে কিংবা ঊহ্য রেখে নিজেদের নাম চালিয়ে দিচ্ছে পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো।
নেকলেস তাজমহল
হৃৎপিণ্ড আকৃতির একটি নেকলেস, তাতে আরবিতে খোদাই করে লেখা ‘নূর জাহান’। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ছিলেন তিনি। সতেরো শতকে স্বামীর কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন বিশেষ এই গয়না। পরে উত্তরাধিকারসূত্রে এটি পান তার সৎপুত্র শাহজাহান। উপহার দেন প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজকে। ব্রিটিশদের লুট করে নিয়ে যাওয়া অসংখ্য জিনিসের মধ্যে এই নেকলেসও ছিল; যা পরে কিনে নেয় লাক্সারি জুয়েলারি ব্র্যান্ড কারটিয়ের। নাম দেয় কারটিয়ের তাজমহল ডায়মন্ড নেকলেস। ১৯৭২ সালে ব্রিটিশ অভিনেতা রিচার্ড বার্টন তার স্ত্রী এলিজাবেথ টেইলরকে এই নেকলেস উপহার দেন। তারপর আর দেখা যায়নি ৪০০ বছরের পুরোনো গয়নাটি। কিন্তু এ বছরের জানুয়ারিতে ‘উদারিং হাইটস’ সিনেমার প্রিমিয়ার অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ান অভিনেত্রী মারগোট রবির গলায় নেকলেসটি দেখে চমকে ওঠেন নেটিজেনরা। এই নেকলেস নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নে মারগোট বলেন, ‘এটি এলিজাবেথ টেইলরের ছিল। তার আগে ছিল তাজমহলে কবরস্থ যিনি, সেই নারীর।’ মমতাজ কিংবা নূর জাহানের নামটুকুও উচ্চারণ করেননি এই হলিউড তারকা। এতে ক্ষোভ প্রকাশের পর অনেকে কটাক্ষ করে বলেছেন, স্বীকৃতি দিতে গিয়ে চুরি না ধরা পড়ে যায়!
সরব সমন্বয়
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন রানওয়েতে দক্ষিণ এশিয়া বহুদিন ধরে অনুপ্রেরণার উৎস। তবে দেশ থেকে দেশান্তরে ফ্যাশনের লেনদেন একপক্ষীয় হলে বিতর্ক তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে তা একই সঙ্গে স্বীকৃতিহীনও; অবশ্য সব ক্ষেত্রে নয়। যেমন এ বছর লুই ভিতোঁর স্প্রিং-সামার মেন’স ওয়্যার শোতে রানওয়ে থিম ছিল এই অঞ্চলের বহু পুরোনো সাপ-লুডু খেলার আদলে। ওদিকে বেশ কয়েক বছর ধরে গাউন কিংবা ড্রেপ ড্রেস নামে নয়, ‘শাড়ি’ নামেই শাড়ি তৈরি করছে গুচি। সমালোচনার মুখে পড়ে কোলাপুরি চপ্পলের সত্যিকার উৎপত্তিস্থলকে স্বীকৃতি দিয়েছে প্রাডা। এমনকি ভারতের কোলাপুরে নিজেদের একটি দল পাঠিয়ে বিশেষ এই স্যান্ডেল তৈরির প্রক্রিয়া তুলে ধরেছে ব্র্যান্ডটি।
ব্রিটিশ ফ্যাশন ডিজাইনার ভিভিয়েন ওয়েস্টউড প্রথমবারের মতো ভারতে ফ্যাশন শো করেছেন, যেখানে এই অঞ্চলের খাদি ও চান্দেরির মতো কাপড়ে তৈরি হয়েছে পুরো সংগ্রহ। শ্যানেল কাজ করেছে জারদৌসি, আরি, মিরর ওয়ার্ক, মোগল মোটিফ নিয়ে; স্বীকার করেছে এর ভারতীয় সত্তা। ২০১২ সালে ব্র্যান্ডটির প্যারিস-বোম্বে মেটিয়ার্স ডি’আর্ট কালেকশনে দেখা গেছে মহারাজা অ্যাটায়ার, নেহরু জ্যাকেট, টারবান হেড পিস, ভারতে তৈরি গয়না ও কাশ্মীরি সূচিকর্মে। তবে সে সময় ভারতীয় কারিগরদের যথাযথভাবে তুলে না ধরলেও এখন সে কথা এড়িয়ে যেতে পারে না লেবেলটি। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সক্ষম মানুষ। তাই কোনো কিছুর শিকড়কে অস্বীকার করা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বেশ মুসকিল হচ্ছে প্রতিবার।
চাণক্য চমক
দক্ষিণ এশীয় ফ্যাশনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে ভারতেই সবচেয়ে বেশি আনাগোনা আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর। এই অঞ্চলের কাপড় ও নকশা যে এখান থেকেই তারা সংগ্রহ করে, সেই সাক্ষ্য দেয় বিশেষ করে দ্য চাণক্য স্কুল অব ক্রাফট। ডিওর, প্রাডা, গুচির দক্ষিণ এশীয় নকশার পোশাকগুলোর মূল কারিগর এই প্রতিষ্ঠান। মুম্বাইভিত্তিক এমব্রয়ডারি অ্যাটেলিয়ারটি এত দিন ভিনদেশি ও বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর ছায়ায় কাজ করে গেলেও এ বছর নিজস্ব ব্র্যান্ড কোরাস উন্মোচন করেছে। এখন থেকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে কাজের পাশাপাশি নিজেদের ভারতীয় পরিচয়েও ফ্যাশন পণ্য তৈরি করবে তারা।
খুব বেশি নয়, মাত্র এক শ বছর আগেও যদি কেউ বলত, দক্ষিণ এশিয়া ফ্যাশনেবল তো বটেই, আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের অংশ ও অনুপ্রেরণাও হতে পারে, তাহলে হয়তো হেসে ফেলতেন পশ্চিমারা। অস্বাভাবিকও মনে হতো না সেটি; কারণ, ঔপনিবেশিক সময়টাই এমন ছিল। অথচ এখন এই অঞ্চলই অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে তাদের। পিছু হটছে না অনুকরণেও। স্বীকৃতি দেওয়ার বেলায় যত গড়িমসি! তবে পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল। সচেতন ক্রেতারা এখন তার ফ্যাশন অনুষঙ্গের সত্যিকার উৎপত্তিস্থল ও অনুপ্রেরণার উৎস জানতে চান। শিকড়কে অস্বীকার করা তাই হয়তো খুব একটা টেকসই মন্ত্র হবে না। বাকিটা ভবিষ্যৎ বলে দেবে।
ছবি: ইন্টারনেট
