skip to Main Content

বিশেষ ফিচার I প্রসঙ্গ: ফ্যাশন সাংবাদিকতা

ফ্যাশনকে মানুষের কাছে নিয়ে আসার অসাধ্য সাধন করেন তারা। যাপিত জীবনের খুঁটিনাটি তুলে ধরেন। সামান্যতেই অসামান্যতা খুঁজে ফেরেন। প্রতিনিধিত্বশীল সাত ফ্যাশন সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতার কিয়দংশ থাকছে এখানে

 

ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে তিরিশ বছর
শেখ সাইফুর রহমান
কনসালট্যান্ট, হাল ফ্যাশন

শেখ সাইফুর রহমান

আমার চাকরিজীবন শুরু হয়েছিল একটি সদাগরি অফিসে। কিন্তু মন পড়ে থাকত লেখালেখির জগতে। সেই তাড়নাই ১৯৯২ সালে আমাকে নিয়ে যায় ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউ নেশনে। ক্রীড়া ছিল আমার প্রথম প্রেম, শুরুটাও তাই সেখানে। সাপ্তাহিক রোববারে লিখেছি; ক্রীড়ালোক, অন্যদিনের খেলা, খেলার আসর ও খেলা—বাংলাদেশের পাঠকনন্দিত ও তুমুল জনপ্রিয় ক্রীড়া সাময়িকীর জন্মপর্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম। জীবনের বড় মোড় আসে ১৯৯৬ সালে। যোগ দিই দৈনিক জনকণ্ঠে। ক্রিকেট বিশ্বকাপের আবহে শুরু হওয়া সেই যাত্রাই আমাকে নিয়ে যায় ফ্যাশন সাংবাদিকতায়। স্পোর্টস ও ফ্যাশন সম্পাদক আরিফ রহমান শিবলীই প্রথম আমাকে এই জগতে হাতেখড়ি দেন। শুরুটা ছিল বিদেশি ফ্যাশন ডিজাইনার ও ফ্যাশন উইক নিয়ে অনুবাদ দিয়ে। পরে বুঝলাম, বাংলাদেশের ফ্যাশনের গল্পও কম সমৃদ্ধ নয়।
পেছনে তাকালে মনে হয়, বাংলাদেশের আধুনিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির বেড়ে ওঠার প্রায় পুরো ইতিহাসটাই খুব কাছ থেকে দেখেছি। হাতে গোনা কয়েকটি ফ্যাশন হাউসের সময় থেকে আজকের বিস্তৃত শিল্পে পরিণত হওয়ার যাত্রার সাক্ষী। কেউ টিকে আছেন, কেউ হারিয়ে গেছেন, কেউ চিরবিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাদের প্রত্যেকেই এই শিল্পের ইতিহাসের অংশ।
জনকণ্ঠে থাকাকালে বাংলাদেশের প্রথম সাংবাদিক হিসেবে লন্ডন ফ্যাশন উইক কভার করার সুযোগ পেয়েছি। প্যারিস কামস টু ঢাকার মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনও কাছ থেকে দেখেছি। তবে বিদেশের ঝলকানির চেয়ে আমাকে বেশি টেনেছে এ দেশের মানুষ। আরিফ রহমান শিবলী, শামীম আজাদ ও এমদাদ হক—তিনজনের কাজ আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। চন্দ্র শেখর সাহার কাছে শিখেছি নান্দনিকতার পাঠ। রুবি গজনবী শিখিয়েছেন প্রাকৃতিক রঙের দর্শন। রোকসানা মরিয়মের সৃষ্টিশীলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে বারবার। আনিলা হকের অ্যান্ডেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কষ্ট আজও রয়ে গেছে। গাজী ওবায়দুল্লাহ স্বপনের মতো মানুষদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই বাংলাদেশের ফ্যাশন ইতিহাসে একেকটি অধ্যায়।
এই দীর্ঘ পথচলায় সব অভিজ্ঞতা অবশ্য সুখের ছিল না। সমালোচনা লিখে বিরাগভাজনও হয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করেছি, গঠনমূলক সমালোচনাও শিল্পের প্রতি ভালোবাসারই আরেক প্রকাশ।
জনকণ্ঠের পর দীর্ঘ সময় কাজ করেছি ক্যানভাস ম্যাগাজিনে। কাজ করেছি একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলে। ছয় বছর ধরে আছি প্রথম আলোর সঙ্গে। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তিগুলোর একটি হলো বাংলাদেশে প্রথম এবং এখনো একমাত্র ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ওয়েব পোর্টাল হাল ফ্যাশনের পরিকল্পনা, কনটেন্ট দর্শন থেকে শুরু করে পথচলার নানা পর্যায়ে আমার শ্রম ও স্বপ্ন জড়িয়ে আছে।
তিরিশ বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পদবি বা পুরস্কার নয়; বড় প্রাপ্তি হলো, সাংবাদিক পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রির মানুষ আমাকে তাদেরই একজন মনে করেন। এই পথচলায় তারাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ, স্মৃতিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তির ভান্ডার। শেষ পর্যন্ত বুঝেছি, ফ্যাশন নিয়ে শুধু লিখিনি; ফ্যাশনই আমার জীবনকে লিখে দিয়েছে।

 

আমি লেইস ফিতার সাংবাদিক
মোহসীনা লাইজু
লাইফস্টাইল এডিটর, দৈনিক দেশ রূপান্তর

মোহসীনা লাইজু

সমকালের লাইফস্টাইল পাতা শৈলী দিয়ে আমার লাইফস্টাইল সাংবাদিকতা শুরু হলো। আমি বরাবরই ফ্যাশনবিমুখ। ফ্যাশনের কনসেপ্ট নিয়েও ছিল অনেকটা ধোঁয়াশা। নতুন চ্যালেঞ্জে নিজেকে তৈরি করতে হবে। সে সময় ইন্টারনেটের সেভাবে প্রসার হয়নি। আজকের সময়ের মতো অনলাইনে পৃথিবীর বিভিন্ন লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন, পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়া, এআই অটোমেশন—কিছুই ছিল না। আমার ভরসা হলেন চন্দ্র শেখর সাহা, প্রয়াত এমদাদ হক, শাহানাজ পারভীন, বিপ্লব সাহা, বিজলী হক, শৈবাল সাহা, কানিজ আলমাস খান, রহিমা সুলতানা রীতা, তানজিমা শারমিন মিউনী, ফারজানা শাকিল, প্রয়াত শাহারুখ শহীদ, মাহাবুব আলম পল্লব, শেখ সাইফুর রহমান, এনামুল করিম নির্ঝর—এ রকম অসংখ্য গুণী মানুষ। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বারবার ছুটে গেছি তাদের কাছে। শেখার ও জানার চেষ্টা করেছি প্রতিনিয়ত। পল্টনে গিয়ে বিদেশি পুরোনো ম্যাগাজিন কিনে আনতাম। সানন্দার গ্রাহক হলাম। সব সময় চেষ্টা ছিল নতুন কিছু করার।
পরিকল্পনা, লেখা, ফটোশুট, পেজ মেকআপ প্রতিটি বিষয়ে মনোযোগ ছিল পুরোটাই। ছাপা হওয়ার পর দেখতাম কোন ছবিটা কেমন লাগছে, কোন রঙের ছাপা ভালো হয়নি, লেখাটা কোথায় আরেকটু ভালো করতে পারতাম। আবার একটা সংখ্যার কাজ শেষে পরেরটিকে অতিক্রম করার চেষ্টা। কালের কণ্ঠের ট্যাবলয়েড এটুজেড দিয়ে আমার লাইফস্টাইল সাংবাদিকতার দ্বিতীয় ধাপ শুরু। সাড়ে নয় বছর সম্পাদনা করেছি এটি। চেষ্টা ছিল শৈলীতে যা করেছি, তার চেয়ে নতুন কিছু করার। এরপর দৈনিক দেশ রূপান্তরের লাইফস্টাইল পাতা রূপ রূপান্তর সম্পাদনার শুরু। কয়েক মাস আগে নাম পরিবর্তন হয়, মালঞ্চ নামে।
পাঠকের কাছে ফ্যাশনের নিত্যনতুন খবর পৌঁছে দিতে কাজ করে চলেছি নিরলস। ফ্যাশন বিশ্বের বিশাল কলেবরকে ছাপা অক্ষরে উপস্থাপনের চেষ্টা সব সময়।

 

পাঠক থেকে লেখক
লাবণ্য লিপি
সাংবাদিক, আমাদের সময়

লাবণ্য লিপি

প্রস্তুতি নিয়ে আমি ফ্যাশন সাংবাদিকতা শুরু করিনি। ভালো লাগা থেকে এর সঙ্গে জড়িয়ে যাই। স্টুডেন্ট লাইফ থেকে আমি তারকাদের ফ্যাশন ও লাইফস্টাইলের প্রতি আগ্রহী ছিলাম। কোন তারকা কেমন পোশাক পরছেন, তার হেয়ারস্টাইল, মেকআপ, জুয়েলারি, জুতা—সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতাম। জানার চেষ্টা করতাম তার যাপিত জীবনের রুটিন, ডায়েট সম্পর্কে। আর এটা হয়েছিল ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ‘সানন্দা’ পড়তে পড়তে। তিন মাস পর পর সানন্দা বের হতো। আর সেটি বাংলাদেশে আসতে আরও কয়েক দিন লাগত। তারপর বাবা কিনে এনে টেবিলে রাখামাত্রই আমাদের বোনদের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু হতো। বলা বাহুল্য, আমিই আগে পড়তাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবি দেখতাম। মূলত ওখান থেকে ফ্যাশন অ্যান্ড লাইফস্টাইল বিষয়টার প্রতি আগ্রহের জন্ম। যখন সাংবাদিকতা পেশায় আসি, প্রথমে যুগান্তর পত্রিকায় ফিচার বিভাগে যোগ দিই। শুরুতে আমাকে নারী ও বিনোদন বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু চোখ থাকত ফ্যাশন পাতায়। নিজের আগ্রহে তাতে লেখালেখি করতাম। কিছুদিন পর ফ্যাশন ট্যাবলয়েডের দায়িত্ব পেয়েছি।
প্রায় দুই যুগে আমার ফ্যাশন সাংবাদিকতা। বাংলাদেশে ফ্যাশন জগতে তখন মোটামুটি বিপ্লব ঘটে গেছে। মানুষ পশ্চিমা ফ্যাশন থেকে মুখ ফিরিয়ে আমাদের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় পোশাকে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এর পেছনে কাজ করছে একদল তরুণ ডিজাইনার। বিনিয়োগ বেড়েছে দেশীয় পোশাক খাতে। গড়ে উঠেছে নতুন নতুন ফ্যাশন হাউস। তখন বুটিকশিল্প ও হ্যান্ডলুম বা তাঁতের কাপড় জনপ্রিয়। সেই সময়ে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলো ফ্যাশনবিষয়ক সাপ্লিমেন্ট; যেমন প্রথম আলোর নকশা, যুগান্তরের ঘরে বাইরে, সমকালের শৈলী ট্যাবলয়েডগুলোও পাঠকপ্রিয়তা পায়। জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তরুণ ডিজাইনাররাও। তাদের কাজ নিয়ে নিয়মিত লিখতাম। পাঠকের সেকি ফিডব্যাক! ছবির নিচে ক্যাপশন দেওয়ার পরও পাঠকেরা ফোন করে মডেলের পরনের শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইতেন—কোথায়, কত দাম সেই পোশাক। ফ্যাশন খাত থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রাজস্বও পাচ্ছে। কাজেই ফ্যাশন বাজারে মানুষের চাহিদা পূরণে দেশীয় শিল্পের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এখানেই ফ্যাশন সাংবাদিকতার সার্থকতা।

আমার মঙ্গলবারের গল্প
রয়া মুনতাসীর
জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, প্রথম আলো

রয়া মুনতাসীর

মঙ্গলবারটা আমাদের কাছে নকশাবার। নামটি আমাদের দেওয়া নয়, পাঠকদের কাছ থেকে পাওয়া। সেই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নকশার সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।
নকশায় আমার যাত্রা শুরু ২০০৮ সালে, ইন্টার্ন হিসেবে। ভাবিনি, এই পথ এতটা লম্বা হবে। হাতেকলমে কাজ শিখতে শিখতে, একের পর এক সংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়ে কবে যেন নকশা নিজের কাঁধে এসে পড়েছে! এখনো সেই প্রথম দিনের মতোই কৌতূহল, উদ্দীপনা আর খানিকটা চাপ কাজ করে। বারবার মনে হয়, পাঠকের হাতে কি এমন কিছু তুলে দিতে পারছি, যা তিনি আগ্রহ নিয়ে পড়বেন, যা তার সময়ের মূল্য দেবে? নতুন দিনের জীবনযাপন কোন দিকে যাচ্ছে, সেটা কি পাঠককে ঠিকঠাক বোঝাতে পারছি!
প্রতিটি সংখ্যা নতুন, প্রতিটি কাজ নতুন—কোনো সংখ্যা খুব ভালো হয়েছে, কোনোটা প্রত্যাশামতো হয়নি। পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সহজ কাজের চেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা আমাকে বেশি গড়ে তুলেছে।
শুরুর দিকে আমার দায়িত্ব ছিল, নকশার প্রায় সব ফিচার পাতার ফটোশুটের সমন্বয় করা। মডেল নির্বাচন, লোকেশন খোঁজা, বাজার ঘুরে পোশাক ও প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ সংগ্রহ, শুটের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম।
এমনও হয়েছে, আমি আর কবির ভাই (প্রথম আলোর ফ্যাশন ফটোগ্রাফার কবির হোসেন) সকাল ১০টায় গিয়েছি শুটের জায়গায়, মডেল এসেছেন রাত ৮টায়। অথচ পরদিন পাতার মেকআপ। রাত ১২টা পর্যন্ত শুট। একবার তো এক বলিউড তারকা নকশার ফটোশুটের জন্য সময় দিলেন রাত একটায়। বরাবরের মতো নকশার সেই শুটে পাশে পেলাম পারসোনা ও ক্যানভাসকে। নুজহাত খানের সঙ্গে পরিকল্পনা করে গভীর রাতে খোলা হলো ক্যানভাস স্টুডিও। পারসোনার সৌন্দর্যকর্মী দিদিরা রাত জেগে মেকআপ করলেন। শুট করা হলো ভোররাত পর্যন্ত।
পরপর দুবার মস্কোতে গিয়েছিলাম ফ্যাশন উইক কভার করতে। তখন মনে হয়েছে, তাহলে নকশাও আছে ঠিক পথেই। কারণ, নকশার মূল ফোকাস দেশীয় পণ্য। একজন ফ্যাশন জার্নালিস্টের কাজ শুধু নতুন পোশাক, ট্রেন্ড বা ফ্যাশন শো নিয়ে লেখা নয়। এটি অনেকটাই রিপোর্টিং, গবেষণা, পরিকল্পনা ও গল্প বলার সমন্বয়। কাজ করতে গিয়ে ফ্যাশনের নতুন চলতি ধারা, রং, কাপড় ও নকশা বুঝেছি। দেশের কোনো প্রান্তে গিয়ে যখন জেনেছি, নকশা পড়ে একজন নারী তার স্টাইল ঠিক করেছেন, তার ঘর সাজিয়েছেন, তখন গর্বে বুক ভরে ওঠে। এভাবেই কবে যেন নকশা দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, কারুশিল্প ও জীবনযাপনেরও অংশ হয়ে গেছে।
হয়তো সে কারণেই এত বছর পরও প্রতি মঙ্গলবার নতুন একটি সংখ্যা প্রকাশের আনন্দ কমে যায়নি। এখনো মনে হয়, বলার আছে অনেক কিছু, অনেক গল্প।

 

আমিই তো মিরান্ডা
অমিয়া খন্দকার
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, আইস টুডে

অমিয়া খন্দকার

যাত্রাটি বেশ দীর্ঘ। সত্যি বলতে, প্রায় ১৪ বছর আগে যখন আইস টুডেতে সাব-এডিটর হিসেবে যোগ দিই, তখন ফ্যাশন নিয়ে তেমন আগ্রহ ছিল না। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে গৌতম সাহার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে, যিনি বাংলাদেশের এডিটরিয়াল ফ্যাশনের অন্যতম পথিকৃৎ। তার কাছ থেকে প্রথম ফ্যাশনকে শুধু পোশাক হিসেবে নয়, শিল্পের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখতে শিখি। একটা লুক বা সামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাককে দৃষ্টিনন্দন করে তোলার পেছনে যে কতটা চিন্তা, সৃজনশীলতার গল্প থাকে, সেটা তখনই বুঝতে শুরু করি। আর এখন, এত বছর পর দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা টু দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো, ‘ওহ্ মাই গড! এ তো আমারই জীবন! আমিই তো মিরান্ডা!’
এই এতগুলো বছরে, বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে খুব কাছ থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হতে দেখেছি। শুধু দেশীয় ব্র্যান্ড আর ডিজাইনারদের সংখ্যাই বাড়েনি, পুরো ইকোসিস্টেমটাই বহুগুণে সমৃদ্ধ হয়েছে। মডেল, ফ্যাশন ফটোগ্রাফার, স্টাইলিস্ট, মেকআপ আর্টিস্ট—সবাই মিলে গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী সৃজনশীল কমিউনিটি। সবচেয়ে ভালো লাগে, যখন দেখি বাংলাদেশের ফ্যাশন নিয়মিত আন্তর্জাতিক রানওয়েসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে জায়গা করে নিচ্ছে। অবশ্য এখনো অনেক জায়গায় আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। অনেক কিছু করার বাকি। আর এখানেই আমাদের কাজ। মনে করি, ফ্যাশন সাংবাদিক হিসেবে শুধু এই ইন্ডাস্ট্রির গল্প বলাই আমাদের দায়িত্বের শেষ নয়; বরং নতুন ঘরানা তৈরি করা, উপযুক্ত আলোচনাকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্নভাবে ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ হওয়ার সুযোগও রয়েছে।

 

ইন দ্য পারসুউট অব হ্যাপিনেস
মেহরিন আফরোজ চৌধুরী
এডিটর, স্টার লাইফস্টাইল
দ্য ডেইলি স্টার

মেহরিন আফরোজ চৌধুরী

কর্মজীবনের শুরুতে কখনো ভাবিনি, সাংবাদিক হব। লাইফস্টাইলে কাজ করার কথাও তাই মাথায় আসেনি। তখন নিজেকে সাধারণ কোনো পেশার জন্য প্রস্তুত করেছিলাম। তবে এখন মনে হয়, সাংবাদিকতা আসলে আমার ভাগ্যে ছিল। কারণ, জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আমাকে সব সময় টানত। রান্নাঘরের পরিচিত ঘ্রাণ, পুরোনো হয়ে যাওয়া ছবি, কিংবা মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া শাড়ির মতো জীবনের খুব সাধারণ ব্যাপারগুলো। জীবনের ছোট ছোট এসব মুহূর্তই যেন রূপ নেয় অসাধারণ সব গল্পে। কোনো অপরিচিত গল্পগুলোর চেয়ে পরিচিতগুলোই যেন মানুষকে বেশি আনন্দ দেয়। সেই উপলব্ধি থেকে লাইফস্টাইল সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া। কোনো এক শান্ত সকালে ধোঁয়া ওঠা এক গরম কাপ চা, শুক্রবারে পারিবারিক আড্ডার আসর অথবা ‘কোয়ায়েট লাক্সারি’র মতো জীবনদর্শনকে মানুষের সামনে তুলে ধরার জন্য।
এক যুগের বেশি সময় ধরে এ পেশায় কাজের সূত্রে অনেকে জানতে চান, এটি কি শুধুই র‌্যাম্প, ফ্যাশন আর গ্ল্যামারের গল্প? তখন সহজ করে বলি—হ্যাঁ, এগুলো অবশ্যই আছে। সঙ্গে আছে নানা রকম শিল্প-শৈলী, ভ্রমণ, সমাজের নানা বিষয় ছাড়াও মানুষের ব্যক্তিগত গল্প। এই পেশার আসল উদ্দেশ্য হলো পাঠক ও লেখকের মধ্যে গভীর সংযোগ তৈরি করা। মানুষ কেমন অনুভব করতে চায়, কী ধরনের জীবন কল্পনা করে, কীভাবে সাজতে চায়, নিজেকে তুলে ধরতে চায়, সেই অনুভূতিগুলো তুলে আনার চেষ্টা। অতীতের নস্টালজিয়া, বর্তমানের বাস্তবতা আর ভবিষ্যতের স্বপ্নকে এক সূক্ষ্ম ছন্দে মিলিয়ে এমন কিছু নির্মাণ করা, যা মানুষকে আরও শান্ত, পরিপূর্ণ ও তৃপ্ত একটি জীবনের আশা দেখাতে পারে।
মানুষের জীবনের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করতে পারলে গল্প বোনা এমনিতেই সহজ হয়ে যায়। কিন্তু কাজের প্রতি গভীর ভালোবাসা না থাকলে পেশাটি বেশ কঠিন মনে হতে পারে। যেমন ধরুন, বাংলাদেশের বর্ষা নিয়ে একটি ফটোশুট বা ফিচার করতে হবে। কিন্তু লাইফস্টাইল সাংবাদিকতার ইতিহাসে এর চেয়ে বেশি করা বিষয় হয়তো খুব কম আছে। তবু সাংবাদিক হিসেবে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করা যেতে পারে বর্ষাকে। মেঘলা আকাশের বিষণ্নতার সঙ্গে মিলিয়ে বেছে নেওয়া যেতে পারে মডেলের শাড়ির রং। ফ্যাশন নিয়ে লেখায়ও থাকতে পারে বৃষ্টিভেজা মাটির ঘ্রাণ কিংবা শৈশবের কোনো স্মৃতি। মালাই চা, গরম পাকোড়া আর ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির জন্য আকুলতা ছাড়াও গল্পে ধরা দিতে পারে বর্ষার বিকেলে অন্তত এক শ বার পড়ে ফেলা হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই আবারও হাতে তুলে নেওয়ার নিঃশব্দ আনন্দ।
ছোট ছোট এসব ভাবনাই একটি গল্পকে আলাদা করে তোলে। পাঠককে নিয়ে যায় এমন এক অনুভূতির জগতে—যেখানে বাস্তবতার সঙ্গে মিশে থাকে কল্পনা, আনন্দ আর নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি। বহুলচর্চিত একটি বিষয়ও নতুন অনুভূতিতে, নতুন অর্থে ভরে ওঠে। সব শেষে প্রাপ্তি একটাই—যখন লেখা পড়ে পাঠকের মুখে একটুখানি হাসি ফুটে ওঠে। আর সেখানেই সব সার্থকতা।

শব্দের মেকওভার
জাহেরা শিরীন
সাবেক ফ্যাশন অ্যান্ড বিউটি এডিটর, ক্যানভাস

জাহেরা শিরীন

বন্ধুত্ব, প্রেম, বিচ্ছেদ! মনে হতে পারে কোনো নাটকের দৃশ্যপট। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন নয়। আমি আসলে বলতে চাইছি ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে আমার এন্ট্রির প্লটটা। নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ, কিন্তু দারুণ ইন্টারেস্টিং। জীবনের টার্নিং পয়েন্ট বললেও হয়তো ভুল হবে না। ফ্যাশন সাংবাদিকতাও আমার কাছে তেমন। পরতে পরতে নাটকীয়তা। প্রতিদিনকার জীবনের অংশ তো বটেই। আমার বিশ্বাস, এর জাদুকরি ক্ষমতাও আছে; যা ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন শোর রেড কার্পেট ট্রেন্ড আর ডিজাইনারদের সিজনাল কালেকশনে বুঁদ করে রাখতে পারে লেখককে। কেমিস্ট্রি ল্যাবের রাসায়নিক বিক্রিয়া আর ফিজিকসের গতিবিধির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বিউটি প্রডাক্টের উপাদানের তালিকায় সবচেয়ে কার্যকর মলিকিউলের খোঁজ। কত দ্রুতগতিতে তা সৌন্দর্য সমস্যার সমাধান করতে পারে, সে হিসাব মেলানোতেই যেন তখন সব ঝোঁক।
শখের বশে লেখা। প্রথমে পছন্দ, তারপর প্যাশন আর শেষে পুরোদস্তুর পেশা। ফ্যাশন সাংবাদিকতায় ১৮ বছর পর এখন সে কথা বলাই যায়।
আমার কাছে ফ্যাশন অ্যান্ড বিউটি, ইজ নট গ্ল্যামারাস, ইটস বিউটিফুলি কেওটিক। সব সময় হুলুস্থুল। কিন্তু সবার জন্যই কিছু না কিছু আছে। শুধু নিজেরাই একটু খুঁজে নিতে হয়, ব্যস! আর ফ্যাশন অ্যান্ড বিউটি জার্নালিস্ট হিসেবে সেই কাজ খানিকটা সহজ করতেই আমার বরাবরের আগ্রহ। এখানে প্রতিদিনই নতুন কিছু জানা যায়, সুযোগ হয় জানানোর। পাঠকের সত্তা আর স্বকীয়তার সঙ্গে মিলে যায়—এমন সব জিনিসের সন্ধান দেওয়া বেশ হ্যাপার হলেও ভীষণ পরিতৃপ্তির। তাই তো প্রতি মাসের ডেডলাইনের প্রেশার। লাস্ট মিনিটে ডামি চেঞ্জ, পাতার অদলবদল আর লেখার কাটাকুটিতে যে ডোপামিন বুস্ট মেলে, তার সামনে যেন সবকিছুই ফিকে। আর সবশেষে ম্যাগাজিন হাতে আসার পর নিজের লেখা প্রকাশের আনন্দ।
গেল বছরগুলোতে ফ্যাশন অ্যান্ড বিউটি বদলেছে। বদলাচ্ছে এখনো। ডিজিটালাইজেশন ইন্ডাস্ট্রিকে পাল্টেছে। আর সোশ্যাল মিডিয়া। স্টাইল আর সৌন্দর্য গ্রহণের ভোলই বদলে দিয়েছে। স্টোরিটেলিংয়ে যার প্রভাব পষ্ট। বদলেছে ঠিকই, কিন্তু বাদ পড়ে যায়নি। আমার মনে হয় ফ্যাশন অ্যান্ড বিউটি জার্নালিজমের কারিগরি শব্দের মেকওভারে। গল্পের বুননে, নতুনের খোঁজে, যেখানে পুরোনোর ফিরে আসায় কোনো সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণী নেই। যা পড়লে পাঠকের মনে হবে, আরে! এটা তো আমার জন্যই লেখা। এই একটা জায়গায় এই সবকিছুর সার্টিফিকেশন ছাড়াই নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। লেখক বা পাঠক—দুভাবেই। অ্যান্ড আই ক্যান প্রাউডলি সে, আই এম ওয়ান অব দেম। ব্যাপারটা মজার না! তাই বলতে চাই, ফ্যাশন অ্যান্ড বিউটি হ্যাজ স্পয়েলড মি ইন দ্য বেস্ট ওয়ে। আই অ্যাম থ্যাংকফুল।

গ্রন্থনা: আবৃতি আহমেদ ও সারাহ্ দীনা
ছবি: ক্যানভাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top