skip to Main Content

পুরাবৃত্ত I রেবতী মোহন লজ

পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে ঔপনিবেশিক আমলের অনন্য এক নিদর্শন। প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত এই স্থাপনা পুরোনো স্থাপত্য ঐশ্বর্যের নানা চিহ্ন এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে

১৯০০ সালে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে জমিদার, সমাজহিতৈষী ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী রেবতী মোহন দাস নির্মাণ করেন অনিন্দ্যসুন্দর একটি বাড়ি। নিজের নামেই নাম দেন রেবতী ভবন। তার মৃত্যুর পর ছোট ছেলে জমিদার হেমেন্দ্র কুমার দাস মূল ভবনের উত্তর পাশে আরেকটি বাড়ি নির্মাণ করেন। ১৯৪২ সালে নির্মিত এই অংশের নাম দাস লজ। দুটি ভবন মিলে হয়ে ওঠে রেবতী মোহন লজ। বাড়িটিতে ব্রিটিশরাজের কমিশনার, সিভিল সার্জন, ম্যাজিস্ট্রেটসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ছিল নিয়মিত যাতায়াত।
আলো-ছায়ার খেলা
দুটি ভিন্ন সময়ের স্থাপনাকে একসূত্রে গেঁথেছে বাড়িটি। দক্ষিণে রেবতী ভবনে ছিল প্রায় ৩৫টি ভিন্ন আকারের কক্ষ। দাস লজেও প্রায় সমানসংখ্যক। স্থাপত্যে ইউরোপীয় নিও ক্ল্যাসিক্যাল রীতির প্রভাব স্পষ্ট। সামনে দাঁড়ালে প্রথমে নজর কাড়বে এর স্তম্ভগুলো। যেন রেনেসাঁ যুগের কোনো স্থপতি ঢাকার বুকে বানিয়েছেন একটুকরো কোরিন্থিয়ান ক্যাপিটাল! কলামের চূড়ায় সূক্ষ্ম লতাপাতা আর ফুলেল খোদাই। চোখ ওপরে তুলতেই অলংকৃত আর্চ বা খিলানের মায়াজাল দৃশ্যমান হয়। একটি বড় অর্ধবৃত্তাকার তোরণের পেটের ভেতর জন্ম নিয়েছে দুটি ছোট খিলান। এগুলোর মাথায় বসানো একটি বৃত্ত—স্থাপত্যের ভাষায় ওকুলুস বা ঈশ্বরের চোখ। বিকেলের রোদ যখন এই আর্চের খাঁজে এসে পড়ে, ভবনজুড়ে খেলা করে আলো-ছায়া।
দুই স্তরের ফরাসি ল্যুভর ধাঁচের জানালা। গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে রোদকে ফাঁকি দিয়ে মিষ্টি হাওয়া এসে নামে অন্দরমহলে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি ওপরের কার্নিশ আর ছাদঘেরা রেলিং। ভারী কার্নিশের নিচে ছোট ছোট ব্র্যাকেটের পুনরাবৃত্তি। ওপরে অলংকৃত প্যারাপেট পুরো সম্মুখভাগকে দিয়েছে নাটকীয় উপসংহার। ঔপনিবেশিক বাংলায় রাজকীয় ব্যালুস্ট্রেড দিয়ে সাজানো হয়েছিল এর ছাদ।
কালের পরিক্রমা
সাতচল্লিশের দেশভাগে রেবতী মোহন দাসের উত্তরসূরিরা পাড়ি জমান ভারতে। বর্তমানে ভবনটি প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হিসেবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে বাস করছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা। সময়ের প্রবহমানতায় ভবনের মূল স্থাপত্যে হানা দিয়েছে ক্ষয় ও মলিনতা। প্রশস্ত অভ্যন্তরীণ পরিসরের কোথাও যুক্ত হয়েছে রান্নাঘর ও শৌচাগার। প্রাঙ্গণে তৈরি হয়েছে বেমানান স্থাপনা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ভবনটি তবু ঔপনিবেশিক নগরজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমাজসংস্কার ও স্থাপত্যের সাক্ষ্য বহন করছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

 লাইফস্টাইল ডেস্ক
ছবি: মানিক চন্দ্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top