ফিচার I ইকিগাই: আশা, অভ্যাস ও আনন্দ
জীবনকে কী কী অর্থবহ করে তোলে? সাফল্য, কাঙ্ক্ষিত পেশা, আর্থিক নিরাপত্তা, পরিবার, ভালোবাসা; নাকি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার কোনো ছোট্ট কারণ। অনুসন্ধানে নাঈমা তাসনিম
জাপানি ভাষায় ‘ইকি’ অর্থ জীবন বা বেঁচে থাকা এবং ‘গাই’ মানে মূল্য বা কারণ। সহজ অর্থে, ইকিগাই হলো জীবনের মূল্য বা বেঁচে থাকার কারণ। যে কারণে মানুষ প্রতিদিন জীবনের অর্থ খুঁজে পায়, কাজে ফিরতে চায় এবং আগামী দিনের দিকে তাকানোর জন্য কোনো আশা বোনে। কারও ইকিগাই হতে পারে সন্তানকে বড় করে তোলা, কারও বাগানবিলাস, কারও প্রেম-ভালোবাসা, কারও রান্নাবান্না, কারওবা সাহিত্য রচনা করা। আবার কারও কাছে প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হওয়া, পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কিংবা নিজের হাতে কিছু তৈরি করাই হতে পারে বেঁচে থাকার তাৎপর্য। আধুনিক বিশ্বে এই দর্শনকে চারটি প্রশ্নে বোঝানো হয়—আমি কী ভালোবাসি, কী ভালো পারি, পৃথিবীর কী প্রয়োজন এবং কোন কাজের বিনিময়ে আমার পক্ষে অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। এই চারের মিলনস্থল হলো ইকিগাই। একজন মানুষের জীবনে একটিমাত্র ইকিগাই থাকতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এর রূপ বদলাতে পারে। তরুণ বয়সে যে কাজ জীবনের উদ্দেশ্য মনে হয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার জায়গা নিতে পারে পরিবার, বন্ধুত্ব, সৃজনশীলতা কিংবা অন্যকে সাহায্য করার আকাঙ্ক্ষা। তাই একে কোনো চূড়ান্ত উত্তর না ভেবে জীবনের সঙ্গে অর্থপূর্ণভাবে যুক্ত থাকার একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা সম্ভব।
বইয়ের বয়ান
ইকিগাই ধারণাকে সারা বিশ্বে পরিচিত করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে হেক্টর গার্সিয়া ও ফ্রান্সেস মিরালেসের লেখা ‘ইকিগাই: দ্য জাপানিজ সিক্রেট টু আ লং অ্যান্ড হ্যাপি লাইফ’। জাপানিদের দীর্ঘ ও সুখী জীবনের পেছনের কিছু অভ্যাস ও জীবনযাপনের ধরন তুলে ধরেছে বইটি। বিশেষ করে ওকিনাওয়ার মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, কাজের প্রতি আগ্রহ এবং সক্রিয় থাকার অভ্যাসের আলোকে এর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘বোধিট্রি’র যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সিইও এবং আমেরিকান লেখক ও উদ্যোক্তা ক্রিস মায়ার্সের ভাবনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে—মানুষের আবেগ বা ভালো লাগা এবং সেই আবেগ প্রকাশের মাধ্যম এক জিনিস নয়। কেউ হয়তো প্রযুক্তিকে ভালোবাসেন না, কিন্তু এর সাহায্য নিয়ে জীবনকে সহজ করা সম্ভব। কেউ ব্যবসাকে ভালোবাসেন না, কিন্তু একে নিজের সৃজনশীলতা বা মানুষের জন্য কাজ করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। অর্থাৎ ইকিগাই খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ‘আমি কী করতে চাই’ প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়; বরং জানতে হয়, ‘আমার কাছে কী মূল্যবান এবং কোন মাধ্যমে সেটিকে জীবনে প্রকাশ করতে পারি?’ এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নিজের ভালো লাগাকে সব সময় পেশায় পরিণত করতে হবে, এমন নয়; বরং পেশা হতে পারে মূল্যবোধ ও আবেগ প্রকাশের একটি মাধ্যম।
প্রাচ্য বনাম পাশ্চাত্য
ইকিগাইকে বোঝার ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়ার বহু সমাজে মানুষের জীবনের অর্থ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং পরিবার, দায়িত্ব, সামাজিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক নির্ভরতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। একজন বাবা হয়তো সারা জীবন একই দোকান চালিয়ে যান। কাজটি তার কাছে শুধু আয়ের উৎস নয়; এটি পারিবারিক ঐতিহ্য, পরিচয় ও দায়িত্বের অংশ। একজন মা হয়তো পরিবারের সবার জন্য রান্না করেন। এর সরাসরি আর্থিক মূল্য না থাকলেও পরিবারের প্রতি যত্নের মধ্যে তিনি নিজের ভূমিকা ও তাৎপর্য খুঁজে পান। কেউ নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটান, কেউ স্থানীয় কমিউনিটির কাজে যুক্ত থাকেন, কেউ নিজের বাগানের যত্ন নেন, কেউ প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখেন। আধুনিক অর্থে এগুলোকে হয়তো বড় সাফল্য বলা যায় না। কিন্তু মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয়তা, সংযোগ ও উদ্দেশ্য তৈরি করার ক্ষেত্রে এসবের মূল্য কম নয়। আলাদা করে ইকিগাই শব্দটি না জানলেও পরিবার, দায়িত্ব, সম্পর্ক ও দৈনন্দিন কাজের মধ্য দিয়ে অর্থ খুঁজে নেওয়া বাংলাদেশের পারিবারিক জীবনে অনেকটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
আধুনিক পশ্চিমা সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ক্যারিয়ারে সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ। কিন্তু এর পাশাপাশি বাড়ছে কাজের চাপ, একাকিত্ব এবং জীবনের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন। সাফল্যের একটি নির্দিষ্ট সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার পরও যদি মনে হয় কোথাও পৌঁছানো যায়নি, তখন সামনে আসে—‘এরপর কী?’ এখানেই ইকিগাই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সাফল্যের পরিবর্তে অর্থপূর্ণতার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। মানুষ ভাবতে শুরু করে, ‘আমি যে কাজ করছি, সেটি কি সত্যিই আমার মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত? আমার দক্ষতা ও আবেগ কি কোনো কাজে লাগছে? আমার কাজ কি শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম, নাকি এর মধ্যে ব্যক্তিগত তাৎপর্যও নিহিত?’
বিনিময় ব্যাখ্যা
আধুনিক জীবনের একটি বড় সমস্যা হলো, ক্যারিয়ার, পরিবার, সামাজিক জীবন, শরীরচর্চা, ভ্রমণ, শখ, বিশ্রাম—সবকিছু আমরা একসঙ্গে পেতে চাই। কিন্তু সময় সীমিত। ফলে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অদৃশ্য মূল্যটি হলো একটি জিনিস বেছে নেওয়ার অর্থ অন্য কোনো সম্ভাবনাকে কিছু সময়ের জন্য ছেড়ে দেওয়া। দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করে হয়তো কিছু বেশি টাকা আয় করা সম্ভব। কিন্তু সময়টি যদি সন্তানের সঙ্গে কাটানোর, বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের কিংবা নিজের প্রিয় কাজ করার একমাত্র সুযোগ হয়, তাহলে সেই সময়ের মূল্য কত? অর্থনীতির ভাষায় একে বলা যায় অপরচুনিটি কস্ট বা সুযোগ-ব্যয়। জীবনের ভাষায় এটিই সেই অদৃশ্য মূল্য বা বিনিময়।
পড়াশোনা শেষ করা, চাকরি পাওয়া, বিয়ে, বাড়ি কেনা, সন্তানের লালনপালন, অবসর নেওয়া—এভাবে জীবনকে আমরা অনেক সময় কয়েকটি অধ্যায়ে ভাগ করি। যেন প্রতিটি পর্যায় শেষ হলেই পরবর্তী ধাপে গিয়ে জীবনের আসল অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু জীবন কোনো প্রকল্প নয়, যার নির্দিষ্ট সমাপ্তির তারিখ থাকবে। চাকরি, সম্পর্ক, শরীর, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি—সবই বদলাতে পারে। বহু বছরের স্বপ্ন একসময় আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ না থাকাও সম্ভব। এই পরিবর্তনের মধ্যেও যদি জীবনের সঙ্গে সংযোগ রাখার মতো কিছু থাকে, সেটিই ইকিগাইয়ের শক্তি। একে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য না ভেবে ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়। জীবন যেহেতু থেমে থাকে না; আমাদের ইকিগাইও একই জায়গায় হয় না থিতু।
উত্তরের অন্বেষণ
নিজের ইকিগাই খুঁজতে গিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে একটি নিখুঁত উত্তরের অনুসন্ধান করা। ‘আমার জীবনের আসল উদ্দেশ্য কী?’—প্রশ্নটি অনেক সময় এত বড় হয়ে ওঠে, যার উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। তার বদলে আমরা ভাবতে পারি—‘কী করলে আনন্দ পাই, কোন কাজটি করতে কিংবা কার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে, কোন দায়িত্ব পালনকে প্রয়োজন মনে করি, কোন কাজ বারবার করতে চাই, আগামীকাল সকালে ঘুম থেকে ওঠার জন্য আমার কাছে কী কারণ আছে, কেন আজকের দিনটিতে বাঁচতে চাই’ ইত্যাদি। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রতিদিন একই হবে না। জীবনের সঙ্গে সঙ্গে তা বদলাবে। কখনো ক্যারিয়ার, কখনোবা পরিবার, সৃজনশীলতা কিংবা অন্যের জন্য কিছু করা—প্রতিটি পর্যায়ে ইকিগাইয়ের চেহারা আলাদা হতে পারে।
জীবনের উদ্দেশ্য কোনো একদিন আবিষ্কার করে ফেলার বিষয় নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ, সম্পর্ক, অভ্যাস ও আনন্দের মধ্য দিয়ে তা তৈরি করে যাওয়ার নামই ইকিগাই। আশা মানুষকে আগামীকালের দিকে তাকাতে শেখায়। অভ্যাস তাকে প্রতিদিন সেই আগামীকালের দিকে এগিয়ে নেয়। আর আনন্দ আসে চলার পথের ছোট ছোট মুহূর্ত থেকে। কারণ, অর্থপূর্ণ মানেই সব সময় বড় জীবন নয়। কখনো কখনো যে জীবনে আগামীকাল সকালে জেগে ওঠার মতো একটি কারণ থাকে, সেটিই যথেষ্ট।
ইলাস্ট্রেশন: সংগ্রহ
