এডিটর’স কলাম I সুহৃদ সমর্পণ -কানিজ আলমাস খান
কারও কথা ধৈর্য নিয়ে শোনা, বঞ্চিত মানুষের পক্ষে সোচ্চার হওয়া, জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলোকে আনন্দময় করে তোলা কিংবা সমাজের অবহেলিত কোনো সমস্যার দায়িত্ব নেওয়া—এ সবই চ্যারিটি
চ্যারিটি শব্দটা শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে অনুদানের টাকা, চেক কিংবা বড় কোনো ফান্ডরেজিং ইভেন্ট। আর্থিক সহায়তা নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু চ্যারিটির পরিধি সেখানেই শেষ হয়ে যায় না। চ্যারিটি শুধু পকেটের বিষয় নয়, বরং মানসিকতা। অন্যের জন্য ভালো কিছু করার তাগিদ, সহানুভূতির সঙ্গে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং যেসব দায়িত্ব অন্যরা এড়িয়ে যায়, তা নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া।
দুই
৫ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক চ্যারিটি দিবস ঘিরে মনে হয়, এই শব্দের মূল অর্থ নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। চ্যারিটি হলো নিজের অবস্থানে থেকে ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা করে যাওয়া। সমাজ যাদের এড়িয়ে চলে কিংবা ট্র্যাজেডির শিকার হয়ে যারা দিশেহারা, করুণার চোখে না তাকিয়ে, তাদের আত্মমর্যাদা এবং আনন্দ ফিরিয়ে দেওয়াই আসল চ্যারিটি।
তিন
আমরা যখন পারসোনার মাধ্যমে অ্যাসিড-সহিংসতার শিকার নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন আর কাজের সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিই, তখন আমাদের লক্ষ্য শুধু সহানুভূতি দেখানো ছিল না। সহানুভূতি তো সাময়িক, কিন্তু স্বাবলম্বিতা চিরস্থায়ী। প্রতিকূলতা জয় করে সেই নারীদের দক্ষতা অর্জন করতে এবং নিজের আয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে দেখা আমাকে শিখিয়েছে, প্রকৃত চ্যারিটি হলো কারও হাতে সাহায্য তুলে দেওয়ার বদলে তাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া।
চার
একইভাবে ২০১০ সালে নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর রাষ্ট্র যখন পরিবার হারানো তিন কন্যা—রুনা, রত্না ও আসমার বিয়ের আয়োজন করেছিল, পারসোনা পরিবার থেকে আমরা সম্পূর্ণ নিজেদের দায়িত্বে তাদের বিয়ের সজ্জার ভার নিয়েছিলাম। জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি পার করে এসেছিলেন এই তিন কনে। তারা যেন জীবনের বিশেষ দিনে নিজেদের একা বা অসহায় না ভাবেন, পরম আদরের কন্যার মতোই কনেসাজে নতুন জীবন শুরু করতে পারেন, সেই অনুভূতি এনে দেওয়াই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। এটি কোনো ব্যবসায়িক কাজ ছিল না; ছিল ভালোবাসার, নিজের ভেতরের তাগিদ।
পাঁচ
চ্যারিটি করার জন্য অঢেল সম্পত্তি বা বিশেষ কোনো ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই একটি চর্চা। কারও কথা ধৈর্য নিয়ে শোনা, বঞ্চিত মানুষের পক্ষে সোচ্চার হওয়া, জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলোকে আনন্দময় করে তোলা কিংবা সমাজের অবহেলিত কোনো সমস্যার দায়িত্ব নেওয়া—এ সবই চ্যারিটি। আসুন, আন্তর্জাতিক চ্যারিটি দিবসে আমরা চ্যারিটির প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলি। আমাদের দক্ষতা, সময় ও মনোযোগ নিয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ালেই সমাজে সত্যিকারের স্থায়ী পরিবর্তন আসবে।
