সংরক্ষণ সমাধান I ফল ফন্দি
দ্রুত পচনশীল পণ্যের মধ্যে ফল অন্যতম। তবে সময়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি এবং পরম্পরায় পাওয়া কৌশল অবলম্বন করে দীর্ঘদিন আহারযোগ্য রাখা সম্ভব
সাধারণত তিনটি কারণে ফলের পচন শুরু হয়। অণুজীবের সংক্রমণ, অনিয়ন্ত্রিত এনজাইমের বিক্রিয়া আর বায়ুমণ্ডলীয় অক্সিডেশন বা জারণ প্রক্রিয়া। ফলের পচন রোধে প্রথমে প্রয়োজন এই তিনের গতি কমানো। অণুজীবের সংক্রমণ ঠেকাতে ফল পরিষ্কার ও শুকনা অবস্থায় রেখে ঠান্ডা পরিবেশে সংরক্ষণ করা যায়। তাপ প্রয়োগ বা ব্লাঞ্চিংয়ের মাধ্যমে এনজাইমের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। অন্যদিকে, বাতাসের সংস্পর্শ কমাতে বায়ুরোধী প্যাকেজিং ব্যবহার করলে জারণ প্রক্রিয়া ধীর হয়।
ফল সংরক্ষণে কোল্ডস্টোরেজ, ফ্রিজ ডাইং এবং এডিবল কোটিং রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কোল্ডস্টোরেজের মাধ্যমে ফলের তাপমাত্রা কমিয়ে জীবাণুর বৃদ্ধি ধীর করা হয়। ফ্রিজ ডাইং পদ্ধতিতে ফলগুলোকে বরফ করে ভ্যাকুয়াম প্রক্রিয়ায় আর্দ্রতা পুরোপুরি শুকিয়ে নেওয়া ভালো। ফলের গায়ে তেলের পাতলা আস্তরণ দিয়ে এডিবল কোটিং করেও সংরক্ষণ করা সম্ভব। তবে রপ্তানিমুখী ও দীর্ঘ পরিবহনের জন্য ভ্যাকুয়াম প্যাকেজিং পদ্ধতি ব্যবহার করা শ্রেয়। এই প্রক্রিয়ায় ফলগুলো প্যাক করে অক্সিজেন কমিয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর ক্ষেত্রে আদিকাল থেকে নানা সভ্যতায় লবণ, চিনি, ভিনেগার বা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ব্যবহার লক্ষণীয়। মৌসুমের বাইরে গিয়ে ফলের স্বাদ পেতে গাঢ় চিনির সিরাপে ফুটিয়ে জারে সংরক্ষণ করতে পারেন। ডুমুর, আঙুর, অ্যাপ্রিকট জাতীয় ফল সরাসরি সূর্যের আলোয় প্রয়োজন অনুসারে ৩ থেকে ৭ দিন শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। জলপাই ও সাইট্রাস ফলগুলোকে ভিনেগার কিংবা লবণের মিশ্রণে ডুবিয়ে বায়ুরোধী জারে সজীব রাখতে পারেন।
হিন্দুকুশ পার্বত্যাঞ্চলের অধিবাসীরা এক অভিনব পদ্ধতিতে শতাব্দী ধরে আঙুরজাতীয় ফল সংরক্ষণ করে অভ্যস্ত, যার নাম কাঙ্গিনা। এ জন্য প্রথমে কাদামাটির দুটি থালা রোদে শুকিয়ে নেওয়া চাই। তারপর থালাগুলোতে তাজা ফল রেখে বাইরে থেকে কাদা লেপে সিল করে শীতল কোনো স্থানে রেখে দিতে হবে। সাধারণত ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা মাটির তৈরি ঘর কিংবা ঢিবির নিচে রাখেন। এভাবে রাসায়নিক কোনো দ্রব্যের ব্যবহার ছাড়াই দীর্ঘ ৬ মাস ফল তাজা রাখা সম্ভব।
দক্ষিণ এশীয় জলবায়ুতে দ্রুত পচনশীল ফলগুলো আমচুর, মোরব্বা কিংবা আচার বানিয়ে দীর্ঘদিন মজুত করা হয়। কাঁচা আম শুকিয়ে গুঁড়া করে তৈরি হয় আমচুর। চালকুমড়া, কাঁচা পেঁপে ইত্যাদি ফলগুলো সেদ্ধ করে চিনি লবণে শুকিয়ে বানাতে পারেন মোরব্বা। আর আচার বানানোর কৌশল তো এই উপমহাদেশের গৃহিণীদের নখদর্পণে।
পূর্ব এশীয়রা বহুকাল ধরে ফলের পুষ্টিগুণ বজায় রাখতে গাঁজন প্রক্রিয়া ব্যবহার করছেন। ফল ও চিনি সমপরিমাণে মিশিয়ে মাটির পাত্রে বা কাচের জারে বিশেষ পানীয় তৈরি করেন তারা। অনেক সময় প্রাকৃতিক মধু বা পাহাড়ি লেবুর রস মিশিয়েও এই অঞ্চলে সংরক্ষণ সমাধান প্রস্তুত হয়।
আবু সালেহ শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ছবি: ইন্টারনেট
