skip to Main Content

শ্রীবৃদ্ধি I কাচকাব্য

গোধূলি গড়ানো সন্ধ্যায় ব্যক্তিগত ভোজসভা কিংবা আলিশান কোনো রয়্যাল ওয়েডিং—সঠিক ডিনারওয়্যার নির্বাচন টেবিলের গোটা পরিবেশ বদলে দিতে সক্ষম

উপাদান, আকৃতি এবং ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে গ্লাসওয়্যারে বেশ কিছু বিভাগরেখা টানা যায়। উপাদানের মধ্যে সোডা-লাইম গ্লাস, বোরোসিলিকেট গ্লাস ও লিড ক্রিস্টালের ব্যবহার বেশি। নামের মতোই এগুলোর স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও তাপসহনশীলতায় ভিন্নতা রয়েছে। বোরোসিলিকেট গ্লাস তাপমাত্রার পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে সহ্য করতে পারে। ক্রিস্টাল গ্লাস তার স্বচ্ছতা ও ঝলমলে আবেদনের জন্য টেবিলে যোগ করে আভিজাত্য। একই সঙ্গে গ্লাসের আকার-আকৃতিও নির্ভর করে আয়োজনের উদ্দেশ্যের ওপর। তুলনামূলক ছোট গ্লাসগুলো ওয়াইন টেস্টিং অথবা স্যাম্পলিংয়ের জন্য রাখা হয়। আবার পানীয়ের ধরন অনুযায়ী বদলে যায় গ্লাসের ঢং, রং ও আবেদন। ঝকঝকে মসৃণ কাচের প্লেট, সূক্ষ্ম বাঁকের রঙিন ওয়াইন গ্লাস কিংবা নকশাদার গবলেট—সবকিছুই যেন অনুষ্ঠানের আবহকে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম।
রেড ওয়াইনের গ্লাসগুলোর বোল তুলনামূলক কিছুটা বড় হয়, যাতে বাতাসের সংস্পর্শে পানীয়ের নিজস্ব ঘ্রাণ ও স্বাদ পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে। তেমনি ছোট বোলযুক্ত গ্লাসে হোয়াইট ওয়াইনের স্বাদ ও গন্ধ থাকে অটুট। ইভেন্ট অনুযায়ী স্টেমযুক্ত অথবা স্টেমবিহীন গ্লাসেরও ব্যবহার রয়েছে। গ্লাসের বোলে আঙুলের ছাপ পড়া ঠেকাতে ব্যবহৃত হয় স্টেম। অন্যদিকে, স্টেমবিহীন গ্লাসগুলো গতানুগতিক; সন্ধ্যাকালীন আয়োজনের উপযুক্ত। ওয়াটার গ্লাসেরও রয়েছে নানা ঢং। সাধারণত ১২-১৬ আউন্স ধারণক্ষমতার স্বচ্ছ এবং সহজ নকশার ওয়াটার গ্লাস সব আয়োজনে মানানসই। এ ক্ষেত্রে ওয়াটার গবলেট আভিজাত্যের রং অনেকটা উজ্জ্বল করে দিতে পারে। নীলাভ অথবা সবুজাভ ক্রিস্টাল গবলেটগুলো ওয়াটার গ্লাসের তুলনায় কিছুটা উঁচু হয় এবং ওয়াইন গ্লাসের পাশে দারুণ মানিয়ে যায়। আরও আছে লম্বা ও সরু শ্যাম্পেইন ফ্লুট। এর সরু আকৃতি পানীয়ের বুদ্‌বুদ দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে সহায়ক। পানীয়ের মৌলিক ঘ্রাণকে ওপরের দিকে কেন্দ্রীভূত করারও উপযোগী। অন্যদিকে ভিনটেজ স্টাইলের ককটেল ও ডেজার্ট পরিবেশনায় প্রশস্ত ও অগভীর বোলযুক্ত ক্যুপ গ্লাসের গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়ছে।
শুধু গ্লাস নয়, টেবিলওয়্যারের বিস্তৃত জগতে রয়েছে মগ, কাপ, সসার, জগ, বাটি ও ডেজার্ট কাপের মতো নানা অনুষঙ্গ। চায়ের কাপ ও সসারের সেট যেমন সকালের নাশতা কিংবা বিকেলের চায়ের টেবিলে আলাদা আবহ তৈরি করে, তেমনি ব্যক্তিগত কিংবা সেট আকারে বোল পরিবেশনেও জুতসই। বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে ১২ বা তার বেশি পিসের সেটও ব্যবহৃত হয়। ডেজার্ট কাপ ছোট পরিসরে মিষ্টান্ন পরিবেশনে যেমন কার্যকর, তেমনি জগ ও অন্যান্য সার্ভিং পাত্র পুরো টেবিল সেটআপকে আরও পরিপূর্ণ করে। ইভেন্ট অনুযায়ী মানানসই গ্লাস সেট নির্বাচনের পাশাপাশি কোথায় রাখা হবে, সেই স্থান বাছাইও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পানীয়টি কখন গ্রহণ করা হচ্ছে, সেটিই বলে দেয় ওয়াটার গ্লাস ও ওয়াইন গ্লাস কীভাবে সাজানো হবে। সাধারণত ডিনার নাইফের ঠিক ওপরে ওয়াটার গ্লাস রাখা হয়। এটিই পুরো গ্লাসওয়্যার সেটআপের মূল বা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত। ওয়াটার গ্লাসের ডান পাশে টেবিলের কিনারা ঘেঁষে সামান্য কোনাকুনি করে সাজানো থাকে ওয়াইন গ্লাসগুলো। রেড ও হোয়াইট ওয়াইনের মধ্যে যে পানীয় প্রথমে গ্রহণ করা হবে, সেটি অতিথির কাছে রাখার চল রয়েছে। তবে খাওয়ার মাঝে পানীয় গ্রহণের ক্রম অনুযায়ী গ্লাসগুলো বাঁ থেকে ডানে সাজালে টেবিলসজ্জার এই প্রক্রিয়া অনেকটা সহজ হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিকভাবে রিডেল, ওয়াটারফোর্ড, লুমিনার্ক অথবা বরমিয়র্লি রোক্কোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাহারি নকশার ওয়াইন গ্লাস, ওয়াটার গবলেট, শ্যাম্পেইন ফ্লুট ও ক্রিস্টাল গ্লাসওয়্যার তৈরির মাধ্যমে ফাইন ডাইনিং সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে। আমাদের দেশও এই ইন্ডাস্ট্রিতে পিছিয়ে নেই। ওলিলা গ্লাস, নাসির গ্লাস ও ইতালিয়ানোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়ভাবে টেবিল গ্লাসওয়্যার উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের গ্লাসওয়্যার আমদানি করছে ইন্টারন্যাশনাল হোমওয়্যারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
দেশীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে নাসির গ্লাসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈচিত্র্যও উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার (করপোরেট অ্যান্ড এক্সপোর্ট) ফখরুজ্জামান জানান, তাদের উৎপাদন অবকাঠামোয় রয়েছে দুটি ফার্নেস এবং ভিন্ন ভিন্ন গ্লাসওয়্যার ও টেবিলওয়্যার তৈরির সক্ষমতা। টাম্বলার, গবলেট, মগ, কাপ, সসার, ডেজার্ট কাপ, জগ ও বোলের পাশাপাশি বোতল এবং বিভিন্ন ধরনের জারও রয়েছে তাদের পণ্যসম্ভারে। বিশেষ করে পিকল জার, সস জার এবং জ্যাম-জেলির জারের মতো খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত কাচের পাত্র এই বৈচিত্র্যের অংশ।
গ্লাসের ব্যবহার শুধু স্বচ্ছ পাত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; রঙিন বা কালারড গ্লাসও এখন টেবিল সাজানোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নীল, সবুজ কিংবা অন্যান্য রঙের কাচের পাত্র সাধারণ ডাইনিং সেটআপেও আলাদা ভিজ্যুয়াল আবেদন তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদনে ব্যবহৃত আধুনিক মেশিনারির মধ্যেও বৈচিত্র্য রয়েছে। নোট অনুযায়ী জার্মান ও চীনা মেশিন—দুই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
করপোরেট আয়োজন, হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা বিশেষ ইভেন্টের জন্য গ্লাসওয়্যারে কাস্টমাইজেশনের সুযোগও এখন গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট নকশা, আকার কিংবা ব্যবহারের উদ্দেশ্য অনুযায়ী কাস্টম-মেইড গ্লাসওয়্যার তৈরি করা যায়। এমনকি গ্লাসে লোগো প্রিন্টিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে একটি সাধারণ কাচপণ্য হয়ে উঠতে পারে কোনো ব্র্যান্ডের পরিচয়ের অংশ। খাদ্য ও পানীয় সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কাচের পাত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পণ্যের সঙ্গে এর সরাসরি সংস্পর্শের বিষয়টি। নির্দিষ্ট ধরনের গ্লাস ফিনিশ বা প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবহার করে পাত্রের পৃষ্ঠকে আরও উপযোগী করে তোলা যায়। বিশেষ করে খাদ্য, সস, আচার, জ্যাম ও জেলির মতো পণ্যের জন্য উপযুক্ত জার নির্বাচন তাই শুধু নান্দনিকতার বিষয় নয়; ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও গুরুত্ব বহন করে।
বাংলাদেশে আধুনিক ডাইনিং, হোটেল শিল্প, রেস্তোরাঁ ও গৃহস্থালি ব্যবহারে রুচিশীল ডিনার গ্লাসওয়্যারের ব্যবহার আর চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ব্যক্তিগত ডিনারের টেবিল থেকে শুরু করে বড় আয়োজন, করপোরেট ইভেন্ট কিংবা রয়্যাল ওয়েডিং—কাচের পাত্রের সঠিক নির্বাচন পুরো পরিবেশে আনে পরিমিত আভিজাত্য, আর টেবিলকে করে তুলতে পারে স্মরণীয়।

 শ্রেয় চৌধুরী
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top