ফিচার I কাজল-কথন
প্রাচীনতম সাজসরঞ্জাম। বিশ্বজুড়ে কদর এখনো বহমান। বিস্তারিত আবৃতি আহমেদের বয়ানে
কবে, কীভাবে আর কারা আবিষ্কার করেছিল কাজল, এ নিয়ে সঠিকভাবে বলা মুশকিল। তবে চোখে কালো রং ব্যবহারের পুরোনো প্রমাণ মেলে প্রাচীন মিসরে। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে ব্যবহৃত কাজলের শিশি পাওয়া গেছে দেশটির রাজকীয় ও অভিজাত সমাধিগুলোয়। এ থেকে ধারণা করা হয়, সেখানকার নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ—সবাই চোখের চারপাশে কালো কোল ব্যবহার করতেন। শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, মরুভূমির শুষ্কতা থেকে চোখ সুরক্ষার জন্য। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া ও পারস্যেও এর প্রচলন ছিল। সংযুক্ত প্রাচীন ভারতবর্ষেও ছিল কাজল ব্যবহারের ইতিহাস। তৈরি হতো গ্যালেনা, অ্যান্টিমনি বা অন্যান্য খনিজ পদার্থ দিয়ে। কোল রাখার জন্য আলাদা পাত্র ও লম্বা অ্যাপ্লিকেটরও ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৫ অব্দে ব্যবহৃত এমন কোল স্টিক সংরক্ষিত আছে যুক্তরাষ্ট্রের মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামে। সৌন্দর্য ও সুরক্ষার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতাও জুড়েছিল কাজলে। তারপর কদর ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে।
দেশ-দেশান্তর পেরিয়ে নানা জাত ও হাতবদলে অবয়ব বদলেছে কাজলের। বদলেছে তৈরির প্রক্রিয়া। সঙ্গে ব্যবহারও। ব্যবহৃত হয়েছে জাতিগত পরিচয়ের অংশ হিসেবে। শুধু চোখে নয়, কাজল দিয়ে মুখে, গায়ে নকশা আঁকাতেন বিভিন্ন সভ্যতার অধিবাসীরা। কাজল দেওয়ার ধরন ও কৌশলে চেনা যেত তাদের গোত্রপরিচয়। এখনো যে নেই, তা নয়। তবে সময়ের সঙ্গে পথ চলেছে কাজল। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ভারতবর্ষ—সবেতেই এর ইতিহাস পুরোনো। দেশ-বিদেশের কবিতায় বারবার এসেছে কাজল কালো চোখের বিবরণ। কখনো তুলনা হয়েছে নদীর সঙ্গে, কখনোবা মেঘে ঢাকা আকাশের রূপকে। আবার এই কাজল দিয়ে শিশুর কপালে টিপ এঁকে নিশ্চিন্ত থাকেন মা। এভাবে মানুষের হাতে নানা রূপান্তর ঘটেছে কাজলের। তবে চোখেই ব্যবহার বেশি। একেক প্রান্তে একেকভাবে। যেখানে যেমন চেয়েছে লোকে। কাজল থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে আইলাইনার, তারপর আইশ্যাডো। তবে কাজলের কদর কমেনি এতটুকু।
চোখের সূর্যস্নান
উজ্জ্বল কমলা চোখ যেন সূর্যের আলো বিচ্ছুরণ করে। আশার আলোর মতো উদ্দীপনা জাগায় মনে। অত্যন্ত আধুনিক মনে হলেও রঙিন কাজলের ব্যবহার শুরু হয়েছিল গত শতকের বিশের দশকে। খানিকটা পরীক্ষামূলকভাবে। জনপ্রিয়তা পেয়েছিল দ্রুতই। কারণ, চোখের ব্যাপারে আর হয়তো শুধু কালোতে আটকে থাকতে চাননি ফ্যাশনিস্তারা। রঙিন চোখ দেখা যেত বিদেশি ফ্যাশন ম্যাগাজিনের পাতা থেকে ইউরোপ-আমেরিকার স্কুল ও কলেজপড়ুয়াদের মাঝে। আজকাল যাকে বলা হচ্ছে ভীষণ ওয়াইটুকে।
কুল কোলবেট
পুরোদস্তুর নাটকীয়তা যেন। ওপর-নিচে চোখ ভরতি করে টানা গ্রাফিক লাইন—নিয়ন ব্লু কাজলে। এই ধারার শুরু আশির দশকে। ঝকঝকে নিয়ন বা জুয়েল-টোনের কাজল আর লাইনার হয়ে উঠেছিল মূলধারার ট্রেন্ড। সে সময় থেকে এখন, নানা শেড ব্যবহৃত হলেও সবচেয়ে বেশি দেখা যায় নিয়ন ব্লু। একে বলা হয় কুল কোলবেট বা ইলেকট্রিক আই।
অনুপ্রেরণায় আরব
ঘন কালো কাজলে মোড়া। আঁকা হয়েছে টানটান করে। স্থির হাতে, ধীরেসুস্থে। চোখের নিচের ল্যাশলাইনে ব্যবহার করা হয়েছে সাদা কাজল। চোখগুলোকে খানিকটা বড় এবং খোলা দেখানোর জন্য। মরুর বুকে নিহিত আরব্য ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয় আঁখিযুগল। আরবের শুষ্ক আবহাওয়ায় কাজল মূলত চোখের ময়শ্চরাইজার।
অলংকরণ আড়ম্বর
কাজলকে যদি একটি আর্ট পেনসিল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে শুধু লাইনে আটকে না থাকলেও ক্ষতি নেই। মনের মাধুরী মিশিয়ে এঁকে নেওয়া যেতে পারে চোখ। করা সম্ভব অলংকরণ। সাজের ব্যাপারটাই তো এমন। যেমন খুশি তেমন। যাকে যেমন ভালো লাগে। যে যেমন চায়।
মডেল: মৃদুলা, উষ্ণতা, ফাইজা ও অহনা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
