কুন্তলকাহন I চুলচেরা বিশ্লেষণ
চুল আঁচড়ানোর সময় গুনতে হবে ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত। ভিক্টোরিয়া যুগের এই পন্থা এখনো চর্চায়
কৌশলটির নাম হানড্রেড স্ট্রোক অন হেয়ার। সহজ বাংলায়, আঁচড়ানোর সময় চুলে চিরুনি বোলাতে হবে শতবার। এর সূত্রপাত ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার আমলে, উনিশ শতকে। তখন পরিষ্কার পানির স্বল্পতার কারণে বেশির ভাগ মানুষ চুল কম ধুতেন। হাতের কাছে মিলত না শ্যাম্পু, সাবান বা চুল ধোয়ার পণ্য। মাসে এক থেকে দুবার এই সুযোগ হতো অনেকের। দিনের পর দিন ধুলো, ময়লা আর তেল জমে যেত চুলে আর স্ক্যাল্পে। এই অবস্থায় একমাত্র উপায় ছিল আঁচড়ানো। আঁচড়ে আঁচড়ে ময়লা বেরিয়ে আসত চুল থেকে। জট বাঁধত কম। কিছুটা হলেও স্বাভাবিক দেখাত। চুল চর্চার এই কৌশল পরে ছড়িয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এখন আবারও শোনা যাচ্ছে এর নামডাক। কেউ বলছেন, এটি সত্যিই কার্যকর। এমনও দাবি করা হচ্ছে, নিয়মিত এই কৌশলে আঁচড়ালে চুল দ্রুত লম্বা হয়। অবশ্য আরেক দলের ভাষ্য, এ আদতে মিথ ছাড়া আর কিছুই নয়!
স্কিন ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী এবং কন্টিনেন্টাল হাসপাতালের ত্বক বিশেষজ্ঞ ডা. নূর-উম-সামা লোবা বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে চুল আঁচড়ানোর এমন কোনো নিয়মের উল্লেখ নেই। চুলে এতবার চিরুনির আঁচড় উপকারী কি না, তা নিয়েও কিছু বলা হয়নি। নেই কোনো গবেষণা বা এর উপকারিতার প্রমাণ। অর্থাৎ, বিজ্ঞানের নিরিখে এটি ভিত্তিহীন দাবি। তা ছাড়া চুল বেশি আঁচড়ালে ভালো, কম আঁচড়ালে খারাপ—এ নিয়েও কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা বা নিয়মও নেই।
খুব শক্ত চিরুনি দিয়ে ক্রমাগত চুল আঁচড়ালে মাথার ত্বক ও চুলের ক্ষতি হতে পারে, বলেন ডা. নূর-উম-সামা লোবা। তার মতে, চুলের গোড়াগুলো এতে আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং নরম হয়ে যায়। সঙ্গে মাথার ত্বক শুষ্ক হয়ে খুশকির সমস্যাও হতে পারে। এতে উল্টো চুল পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই এতবার চুলে চিরুনির আঁচড় না দেওয়াই ভালো।
এদিকে একই কৌশলকে জাপানিরা বদলে নিয়েছেন সুবিধাজনক উপায়ে। তাদের মতে, জোরে জোরে আর শক্ত চিরুনি ব্যবহারে নয়, চুল আঁচড়াতে হবে নরম কাঠের চিরুনি দিয়ে, আলতো করে। তখন ১০০ বার আঁচড়ালেও ক্ষতি নেই।
ডা. নূর-উম-সামা লোবার পরামর্শ হলো, চুল আঁচড়ানো চাই প্রয়োজন বুঝে। সংখ্যা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১০০ কিংবা ৫০ বার; কোনোটিই নয়। নিজের কাছে যতটুকু মনে হবে, ততটুকু সই। এই নিয়ে বাড়াবাড়িরও কিছু নেই। কত সময় নিয়ে এবং কতবার আঁচড়াতে হবে, এটি নির্ভর করে চুলের ধরন ও প্রয়োজনের ওপর। তবু জেনে রাখতে পারেন কিছু সহজ নিয়ম।
চুলের আগা মানে নিচ থেকে শুরু করে প্রথমে জট ছাড়িয়ে, তারপর ওপরের দিকে যেতে হবে।
আলতোভাবে ধীরে ধীরে আঁচড়ানো চাই।
সঠিক ব্রাশ বেছে নিন। ভেজা ও জটযুক্ত চুলের জন্য মোটা দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করা উত্তম।
সম্পূর্ণ ভেজা চুল না আঁচড়ানোই ভালো। প্রথমে চুল কিছুটা শুকিয়ে নিয়ে ভাগ ভাগ করে আঁচড়ে নিতে পারেন। চুল ঘন হলে কয়েকটি অংশে ভাগ করে নিয়ে তারপর আঁচড়ালে উপকার মিলবে।
অতিরিক্ত নয়, বরং যতক্ষণ দরকার, ততক্ষণ আঁচড়ানোই যথেষ্ট।
মাথার ত্বকে খুব জোরে চিরুনির ঘষা দেওয়া থেকে বিরত থাকা মঙ্গল।
চিরুনি ও ব্রাশ নিয়মিত পরিষ্কার করা চাই।
বেশি নয়, দিনে অন্তত দুবার চুল আঁচড়ানোই যথেষ্ট।
ডা. নূর-উম-সামা লোবা বলেন, চিরুনি দিয়ে আঁচড়ানোর প্রধান কারণ হচ্ছে, চুল পরিপাটি করে রাখা। চিরুনির আঁচড়ে মাথার ত্বকে রক্তসঞ্চালন বাড়ে। চুলের পুষ্টি নির্ভর করে মূলত খাদ্যাভ্যাসের ওপর। বাইরে থেকে যত যত্নই নেওয়া হোক, খাদ্যাভ্যাস সঠিক না হলে কোনোটাতেই লাভ হয় না। চুল সুন্দর রাখতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল ও খনিজের চাহিদা পূরণ করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
আবৃতি আহমেদ
মডেল: ক্যারিন
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
