skip to Main Content

কভারস্টোরি I মেইড ইন বাংলাদেশ

একসময় অনেকেই বিদেশি প্রসাধনীতে আস্থা রাখতেন। বদলেছে সেই দিন। দেশি পণ্যের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন এ সময়ের সচেতন গ্রাহকেরা। সৌন্দর্যজগতেও দেখা যাচ্ছে স্থানীয় ক্রেতা চাহিদার গুরুত্ব। উন্নত মানের উপাদান, প্রস্তুতি ও প্যাকেজিং—সবকিছুর ভার দক্ষতার সঙ্গে সামলে নিচ্ছে দেশি বিউটি ব্র্যান্ডগুলো। উজ্জ্বল দিনের সূর্য দেখা যাচ্ছে দিগন্তে। তারই বার্তা সারাহ্ দীনার লেখায়

বোরোলিনের ক্রিম, কিও কারপিন তেল, কেমি কিংবা ইম্পেরিয়াল লেদার সাবান, ইয়ার্ডলির পাউডার—মনে পড়ে এসব নাম? নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে একটা দীর্ঘ সময় বিউটি শপিং মানেই ছিল বিদেশি ব্র্যান্ড। স্কিন কেয়ার রুটিনে কোন ক্রিম, লোশন কিংবা সেরাম যোগ হবে, তার উত্তর খুঁজতে চোখ চলে যেত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দিকে। কিন্তু সময় বদলেছে। বাংলাদেশের বিউটি কনজ্যুমারের চাহিদা, পছন্দ আর প্রত্যাশাও পাল্টে গেছে সময়ের তালে। সৌন্দর্যসচেতন মানুষ শুধু চেনা ব্র্যান্ডের পণ্য দেখলেই তুলে নেন না, প্যাকেজিংয়ের নন্দনতত্ত্বও আকর্ষণ করে না সেভাবে। ড্রাইভিং সিটে এখন উপাদানের অবস্থান। কোন পণ্য কিসে তৈরি, তা দিয়েই হয় বিচার। তারপরে বাকি হিসাবনিকাশ। বাংলাদেশ সেই অগ্নিপরীক্ষায় বারবার উতরে গেছে বলা চলে। কালের পরিক্রমায় যেখানে এক ক্লিকেই কিনে নেওয়া যায় যা ইচ্ছা তা-ই; সেখানেও দেশি পণ্যে নিয়মিত ভরসা রাখছেন এই ভূখণ্ডের ভোক্তারা।
কলেবর কাহন
মার্কিন গবেষণা সংস্থা অ্যালাইড মার্কেট রিসার্চ পূর্বাভাস দিয়েছিল, বাংলাদেশের স্কিন কেয়ার মার্কেটের আকার ২০২৭ সালের মধ্যে ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। আরও জানা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময়কালে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ। সংখ্যাটি শুধু একটি বাজারের সম্প্রসারণের হিসাব নয়; বদলে যাওয়া বিউটি কালচারেরও ইঙ্গিত। ত্বকের যত্ন এখন আর বিশেষ কোনো উপলক্ষের বিষয় নয়; বরং দৈনন্দিন যত্নের অংশ। আবার বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) একটি গবেষণা বলছে, এ দেশে কসমেটিকস খাতের প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কালার কসমেটিকস ও সাধারণ ত্বকচর্চার সঙ্গে মেডিকেটেড ত্বকচর্চার পণ্য।
তখন থেকে এখন
বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোর কারণে সৌন্দর্যপণ্যের বাজারে এ দেশের অবস্থান বেশ দৃঢ়। কোহিনূর কেমিক্যাল কোম্পানী (বাংলাদেশ) পিএলসি, স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড, মৌসুমী ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অবস্থান এ তালিকার শুরুর দিকে। দেশের সবচেয়ে পুরোনো প্রসাধনী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কোহিনূর কেমিক্যাল এখনো দাপটের সঙ্গে টিকে আছে। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৬ সালে। বিদেশে কোনো ব্র্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বিক্রীত পণ্যকে বলা হয় হিরো প্রোডাক্ট। কোহিনূর কেমিক্যালের এমন একাধিক পণ্য রয়েছে—তিব্বত পমেড, তিব্বত স্নো, স্যান্ডালিনা স্যান্ডাল সোপ। সাত দশক ধরে টিকে থাকার অন্যতম কারণ, তারা সব সময় সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে মানসম্মত পণ্য বাজারজাত নিশ্চিত করেছে।
বাজার ঘুরে পাওয়া তথ্য মতে, বর্তমানে স্কয়ার টয়লেট্রিজের স্কিন কেয়ার ও হেয়ারকেয়ার পণ্যের চাহিদা রয়েছে। মেরিল রিভাইভ লাইনের বডি লোশন, শ্যাম্পু, সানব্লক পাউডার, মেরিল গ্লিসারিন, মেরিল পেট্রোলিয়াম জেলি ইত্যাদি আছে ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায়। বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের পণ্যের বৈচিত্র্য ও পণ্যের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ক্রেতা চাইলে স্কয়ার টয়লেট্রিজের ওয়েবসাইটে সব পণ্যের বর্ণনা জেনে নিতে পারেন। এগুলো তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদানের তালিকা, উপকারিতা ও ব্যবহারবিধি সাজানো রয়েছে সেখানে। নতুন প্রজন্মের সচেতন ভোক্তা আকর্ষণের জন্য এই ওয়েবসাইট ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা যেতে পারে। এই একই প্রতিষ্ঠানের মায়া ন্যাচারালস প্রোডাক্ট লাইন এরই মধ্যে দেশীয় বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। এতে আছে ভেষজ উপাদানে তৈরি ফেস অয়েল ও হেয়ার অয়েল। জানা যায়, মায়া ন্যাচারালসের পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত বেশ কিছু ভেষজ উপাদান নিজস্ব কারখানায় নিজেদের তত্ত্বাবধানে এক্সট্রাক্ট করা হয়। গুণগত মান নিশ্চিতের জন্য একেকটি পণ্য তৈরিতে স্কয়ার টয়লেট্রিজ দেশি-বিদেশি ফাইটোকেমিস্টদের দিয়ে প্রয়োজনীয় গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ব্যবস্থা করে থাকে।
প্রসাধন বাজারে দেশের আরেকটি ব্যবসাসফল প্রতিষ্ঠান হলো মৌসুমী ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। তাদের হিরো ব্র্যান্ড কিউট। শীতকালে এখনো অনেকের ত্বকযত্নে ভরসার অপর নাম কিউট কোল্ড ক্রিম। এটি ছাড়াও তাদের রয়েছে পমেড, পেট্রোলিয়াম জেলি, লিপ জেল ও গ্লিসারিন।
ক্রেতা চাহিদা
শহুরে জীবনে নাগরিকদের মধ্যে বিবিধ দূষণ, সূর্যের বেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব, অনিয়মিত জীবনযাপন ও স্ট্রেস নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। একই ক্রিম সবার জন্য—এমন ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসছেন ক্রেতারা। ব্রণ, অসম স্কিন টোন, শুষ্কতা কিংবা সংবেদনশীল ত্বকের জন্য আলাদা পণ্য খোঁজার প্রবণতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ক্রেতা চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডগুলো গড়ে তুলছে প্রোডাক্ট লাইন। এভাবেই স্থানীয় সৌন্দর্যপণ্যের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন জায়গা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে ২০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী নারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭৩ লাখ। এদের মধ্যে ৭০ শতাংশকে প্রসাধনসামগ্রীর ক্রেতা বিবেচনা করা হয়েছে বিটিটিসির গবেষণায়। সে ক্ষেত্রে এসব ক্রেতা বছরে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার কালার কসমেটিকস এবং ২১ হাজার কোটি টাকার ত্বকচর্চার পণ্য ব্যবহার করছেন।
স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে দেশের ছয় থেকে সাতটি স্থানীয় কোম্পানি এ খাতের ৮০ শতাংশ বাজার নিজেদের দখলে রেখেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে স্কয়ার টয়লেট্রিজ, কোহিনূর কেমিক্যাল। বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেলেও কেয়া কসমেটিকস, অ্যারোমেটিক কসমেটিকসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এ দেশের সৌন্দর্য খাতকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে। সম্প্রতি রিমার্ক এইচবি লিমিটেড ত্বকচর্চার পণ্যের সঙ্গে কালার কসমেটিকসেও বড় বিনিয়োগ করেছে। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় তাদের কারখানায় নিওর ব্র্যান্ড নামে তৈরি হয় সাধারণ কালার কসমেটিকস। আবার এক্সক্লুসিভ কালার কসমেটিকস উৎপাদন করছে হারল্যান। এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে সাবান-শ্যাম্পু থেকে শুরু করে মেকওভারের নানা পণ্যও এখন থেকে দেশেই তৈরি হবে।
বাংলাদেশের কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার বাজার দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডনির্ভর হওয়ায় মানের প্রশ্নে অনেক ক্রেতা এখনো পরিচিত বহুজাতিক কোম্পানিকে এগিয়ে রাখেন। অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা তুলনামূলক কম দামের পণ্য নিয়ে মূলত মিডল টু লো প্রাইস সেগমেন্টে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বাজারে ইউনিলিভার, লিলি কসমেটিকস, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, কোহিনূর কেমিক্যাল, লিজান কসমেটিকস, মমতাজ হারবালের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি এই প্রতিযোগিতার পরিসরটিও স্পষ্ট করে। তবে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’কে এখন শুধু কম দামের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
দেশে প্রসাধনীর ভবিষ্যৎ বাজারও বেশ বড়। দেশীয় উৎপাদনকারীদের নতুন প্রজন্মের একটি অংশ এ ক্ষেত্রে অন্য প্রশ্ন সামনে আনছে; সেটি হলো এ দেশের আবহাওয়া, জীবনযাপন এবং ভোক্তার ত্বকের বাস্তব প্রয়োজন মাথায় রেখে পণ্য তৈরি করা যায় কি না। এ ছাড়া গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, ঘাম, অতিরিক্ত সিবাম, রোদে দীর্ঘ সময় থাকা—এসব স্থানীয় বাস্তবতা আন্তর্জাতিক বাজারের তৈরি ফর্মুলার সঙ্গে সব সময় একভাবে মেলে না। ফলে লোকাল ইনসাইট ব্যবহার করে প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
ডিজিটাল ডিটেইল
পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট ডিজিটাল দুনিয়ায়। বিউটি ডিসকভারিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একটি নতুন ক্লিনজার বা সানস্ক্রিন সম্পর্কে জানতে এখন বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, টিকটকে বিউটি রিভিউ আর ক্রিয়েটর রিকমেন্ডেশনও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ই-কমার্স বাড়িয়েছে পণ্যের সহজলভ্যতা। ঢাকার বাইরে বসেও ক্রেতা এখন দেশি ও আন্তর্জাতিক—দুই ধরনের ব্র্যান্ডই তুলনা করতে পারছেন কয়েকটি ক্লিকে। তবে এই দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে এসেছে নতুন চ্যালেঞ্জ। অনলাইন বাজারে নকল পণ্যের উপস্থিতি শুধু ভোক্তার নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি জেনুইন বিউটি ব্র্যান্ডের জন্যও বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি। পণ্যের মান, সাপ্লাই চেইন ও বিশ্বাসযোগ্য সরবরাহ তাই আগামী দিনের মেইড ইন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। কারণ, এখনকার সৌন্দর্যসচেতনেরা শুধু সুন্দর ত্বক চান না; জানতে চান, সৌন্দর্যের সেই পণ্য কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং কেন সেটি তাদের জন্য উপযুক্ত।
একসময় বিউটি বিজনেসের কেন্দ্র ছিল মূলত ফিজিক্যাল স্যালন এবং সাধারণ প্রসাধনীর দোকান। এরপরে বিশাল শোরুম নিয়ে ব্যবসার কালও দীর্ঘ। এখন যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লাইভ সেলিং, ই-কমার্স, বিউটি কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও হোম বেসড সার্ভিস। অর্থাৎ বিউটি ইন্ডাস্ট্রির এন্ট্রি পয়েন্টও এখন অনেক বেশি সহজলভ্য। একজন নতুন উদ্যোক্তা শোরুম ছাড়াই ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করতে পারেন; আবার একটি লোকাল বিউটি ব্র্যান্ড শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেও সারা দেশে পৌঁছে যেতে সক্ষম।
বিউটি ইকোসিস্টেম
বাংলাদেশের প্রসাধন বাজারের গল্প শুধু শেলফে সাজানো ক্রিম, লোশন বা সেরামের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার স্যালন, স্পা, মেকওভার স্টুডিও আর বিউটি প্রফেশনাল। তাদের ঘিরে তৈরি হওয়া একটি বড় অর্থনীতি রাখছে সক্রিয় ভূমিকা। দেশের ছোট ও মাঝারি শিল্পের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবেও বিউটি ইন্ডাস্ট্রির গুরুত্ব তাই ক্রমে বাড়ছে। ২০২০ সালের ৭ জুন এক প্রজ্ঞাপনে সৌন্দর্যসেবা খাতকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
২০২০ সালের সর্বশেষ জরিপভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, এই ভূখণ্ডে নিবন্ধিত স্যালন ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ১০ লাখের বেশি নারী। অন্যদিকে মার্কেট ইনসাইডার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রসাধনীর বাজারের বার্ষিক মূল্য প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। রাজধানীতে বড় ও পরিচিত ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠানের ঘনত্ব বেশি হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ছোট ও মাঝারি বিউটি বিজনেসই তৈরি করছে এই বিশাল ইকোসিস্টেমের ভিত্তি। খটমট এই সংখ্যাগুলোকে শুধু ব্যবসায়িক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। কেননা এই শিল্প বাংলাদেশের নারীদের জন্য কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার একটি বড় ক্ষেত্রও তৈরি করেছে। একজন বিউটি প্রফেশনালের কাছ থেকে স্যালন ওইনার, ট্রেইনার, প্রোডাক্ট ডিস্ট্রিবিউটর ও বিউটি এন্ট্রাপ্রেনারের ইকোসিস্টেম তৈরি হয়। তাই বিউটি এখন শুধু গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রি নয়; এটি জীবনযাপন ও উদ্যোগের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
এই ইকোসিস্টেমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত লোকাল বিউটি প্রোডাক্টস। স্যালন আর বিউটি প্রফেশনাল প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের ত্বক, চুল ও গ্রুমিংয়ের প্রয়োজন মিটিয়ে চলেছে। প্রসাধনের কেমন টেক্সচার বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আরামদায়ক, কোনটিতে ক্রেতা বেশি আস্থা রাখছেন—এসব বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় সংশ্লিষ্টদের কাছে; যা লোকাল প্রোডাক্টের ডেভেলপমেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চ্যালেঞ্জ ব্যালেন্স
সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। মান নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের নিরাপত্তা, প্যাকেজিং, নিজস্বতা ও সরবরাহ—সব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও পেশাদার হতে হবে বলে অভিমত ব্যবহারকারীদের। কারণ, প্রসাধন এমন একটি ক্যাটাগরি, যেখানে ক্রেতার বিশ্বস্ততা গুরুত্বপূর্ণ। একজনের খারাপ অভিজ্ঞতা শুধু একটি পণ্যের নয়, পুরো লোকাল বিউটি ক্যাটাগরির প্রতি আস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই মেইড ইন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে বেশি পণ্য তৈরি নয়, বরং মনোযোগ দিতে হবে এমন পণ্য তৈরি করার দিকে; যা এ দেশের মানুষ, আবহাওয়া ও সৌন্দর্য সংস্কৃতিকে বুঝে তৈরি করা হয়েছে এবং যেখানে মানের সঙ্গে কোনো আপস চলে না। কারণ, দেশের বিউটি বাজারের বর্তমান কলেবর তার কনজ্যুমার বেইস, ওয়ার্কফোর্স ও এন্ট্রাপ্রেনার ইকোসিস্টেম তৈরি করে নিয়েছে। তাই প্রশ্নটি আর ‘বাংলাদেশে বিউটি প্রোডাক্ট তৈরি হতে পারে কি না’ তা নয়; বরং ‘বাংলাদেশে তৈরি প্রসাধন এবার নিজেদের জন্য একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারবে কি’।
তত্ত্বতালাশ
বাংলাদেশের বিউটি কনজ্যুমার বদলেছে। শুধু পণ্যের নাম আর ব্র্যান্ড ইমেজ ক্রেতাকে আকর্ষণ করতে পারে না। এদিকে চলতি বছরের বিউটি কনভারসেশনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ইনগ্রেডিয়েন্ট অ্যাওয়ারনেসে। ক্রেতা প্রতিটি উপাদান সম্পর্কে সচেতনভাবে জানতে চান। প্রযুক্তি সবার জন্য তথ্য খুঁজে পাওয়াকে সহজ করেছে বলে এ ধরনের যাচাইও অসম্ভব নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিউটি ক্রিয়েটরসও এখানে ভূমিকা রাখছে। কোনো ক্রিমকে অন্যের কাছে ভালো বলার আগে তাতে সেরামাইড বা পেপটাইড আছে কি না, নিয়াসিনামাইড ত্বকের যত্নে কেমন ভূমিকা রাখবে ইত্যাদি বিষয়ে ব্যবহারকারী চিন্তা করেন। এসব বিবেচনা ছাড়া শুধুই ‘ভালো লেগেছে’ দেখে ভালো হিসেবে গণ্য করার চল সেভাবে নেই বললেই চলে।
ইনগ্রেডিয়েন্ট কনসাস কালচারের মধ্যেই বায়োটেকনোলজিভিত্তিক স্কিন কেয়ারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এক্সোসোম ট্রিটমেন্ট, পিডিআরএন, পেপটাইডস এবং এনএডি++ এর মতো আধুনিক উপাদান বিউটি কনভারসেশনে জায়গা করে নিচ্ছে। এর সঙ্গে সায়েন্স ব্যাকড স্কিন কেয়ারের প্রতিও আগ্রহ বেড়েছে। তবে এই ট্রেন্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হাইপ নয়, বরং কনজ্যুমারের চাহিদার পরিবর্তন এখানে দৃশ্যমান। এখানেও সফল বাংলাদেশ। তারা ক্রেতাদেরকে উপাদানের বিষয়ে যথাযথ তথ্য জানাতে সক্ষম হয়েছে।
আবহাওয়া আবদার
বাংলাদেশের আবহাওয়া স্কিন কেয়ারের ক্ষেত্রে আলাদা বাস্তবতা তৈরি করে। তাপমাত্রার এই উত্তাপ, আর্দ্রতা এবং তার প্রভাবে একাধিকবার ত্বক পরিষ্কারের প্রয়োজনে ত্বকের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তার জন্য স্কিন ব্যারিয়ার এখন স্কিন কেয়ার রুটিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এমন আবহাওয়ায় উপকারী কিছুই খুঁজছেন ক্রেতা। দিন দিন সেরামাইড, নিয়াসিনামাইড ও মাইক্রোবিয়াম কনশাস ফরমুলেশনের মতো উপাদান নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। আগের মতো এই যত্নের লক্ষ্য শুধু ত্বক ফর্সা করার চেষ্টা নয়; স্বাস্থ্যকর, সুস্থ ত্বকের চাহিদাও বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্কিন মিনিমালিজমের জনপ্রিয়তাও হয়ে উঠেছে অর্থবহ। দীর্ঘ সময় ধরে স্কিন কেয়ার রুটিনের বদলে অনেক ক্রেতা এমন প্রোডাক্টও খোঁজেন, যা একসঙ্গে ত্বকের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে। বাংলাদেশের বেশ কিছু পণ্য এ ধরনের চাহিদা পূরণে সক্ষম হচ্ছে। এ দেশের বর্তমান সময়ের কর্মক্ষম জনগণের বিশাল অংশ সময় পার করে ব্যস্ততার সঙ্গে। আরবান লাইফস্টাইলের সঙ্গে এই লেস ইজ মোর অ্যাপ্রোচ বেশ স্বাভাবিকভাবে মিলে যায়। সানস্ক্রিনের প্রতি একসময় বেশ উন্নাসিকতা ছিল এ দেশের সৌন্দর্যসচেতনদের। এখন সেখানে পরিবর্তন এসেছে দারুণভাবে। দেশীয় ব্র্যান্ড সানস্ক্রিন প্রস্তুত করার কারণে এটি এসেছে হাতের নাগালে। মূল্য সাশ্রয়ী হয়েছে। আবার এখানকার আবহাওয়া বুঝে তৈরি করার বিষয়ে নিয়মিত গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের সৌন্দর্যপণ্য প্রস্তুতকারকেরা। এ দেশের রোদ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় লাইটওয়েট, নন-গ্রেসি ও কমফোর্টেবল ফর্মুলার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। আর সেখানেই সফল দেশে তৈরি এই পণ্যগুলো। দাম কম রাখার পাশাপাশি উন্নত মানের উপাদানে ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হওয়ার সঙ্গে মেইড ইন বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম। এখানে বিশ্বের অন্য কোনো দেশের মতো হওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়নি। হালের জনপ্রিয় কোরিয়ান বিউটির লেয়ারিং ফিলোসফি, ওয়েস্টার্ন স্কিনিফিকেশন কিংবা বায়োটেক স্কিন কেয়ারের মতো ইন্টারন্যাশনাল ট্রেন্ডসের সফলতার দারুণ এই সময়েও নিজেদের দেশের ক্রেতা চাহিদাকে রেখেছে ভাবনায়। কেননা, ক্রেতারা এখন শুধু ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা দেখেই সন্তুষ্ট হন না; পণ্যের মাঝে খুঁজে বেড়ান ‘মেইড ফর বাংলাদেশ’, ‘মেইড উইদ সায়েন্স’ ও ‘মেইড উইদ ট্রাস্ট’।

মডেল: অভিনেত্রী নাযাহ্‌ নাওয়ার
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব ও জুয়েলারি: ক্যানভাস বাই তন্বী কবির
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top