skip to Main Content

ত্বকতত্ত্ব I চাঁদমুখ কলঙ্ক

চাঁদের সঙ্গে রূপের তুলনায় আর বোধ হয় খুশি হওয়ার উপায় নেই! কারণ, মুখে ফোলাভাব দেখা দিলে আজকাল সেই অবস্থাকে বলা হচ্ছে মুন ফেস। এর পেছনে দায়ী করা হচ্ছে শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোনকে

ত্বকের আলাপে আবারও সেই হরমোন। এবার দোষ কর্টিসলের, যেটিকে সাধারণত স্ট্রেস হরমোন বলা হয়। কারণ, কেউ যখন মানসিক চাপে থাকেন, তখন তার শরীরের অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির বাইরের স্তর থেকে এটি নিঃসরিত হয়। তাই এই প্রাণরসকে নেতিবাচকভাবে দেখেন অনেকে। অথচ মানসিক চাপ সৃষ্টিতে কর্টিসলের কোনো দায় নেই। এটি বরং এমন চাপ সামলে নিতে সাহায্য করে। শুধু তা-ই নয়, শরীর সচল রাখতে কর্টিসলের ভূমিকা অনেক। এর মাত্রা কমে গেলে দেহযন্ত্র অচল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিকে বলা হয় কর্টিসল ক্রাইসিস। অন্যদিকে, মানসিক চাপের সঙ্গে সমানুপাতিক হারে বাড়তে পারে কর্টিসলের মাত্রা। হরমোনটির ভারসাম্য নষ্ট হলে নানা লক্ষণ দেখা দেয় শরীরে। তবে সবার আগে চোখে পড়ে ত্বকের পরিবর্তন। ফুলে যেতে পারে মুখ। দেখায় চাঁদের মতো গোলাকার। এ কারণে নেট দুনিয়ায় এটিকে বলা হচ্ছে মুন ফেস। বাংলায় চাঁদমুখ।
বিষয়টি নিয়ে আজকাল চর্চার শেষ নেই। শুধু মুখে ফোলাভাবই নয়, মলিনতা ও ব্রণের মতো সমস্যাগুলোর জন্যও অনেকে কর্টিসলকে দায়ী করছেন। যদিও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো ডায়াগনসিস নেই, জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সহকারী অধ্যাপক শারমিন জাহান। তিনি বলেন, মুখ হঠাৎ ফুলে গেলে বা গালে ও ঘাড়ে কিছুটা মেদ জমে গোলাকার দেখালেই অনেকে মনে করেন, এর পেছনে কর্টিসল দায়ী। কিন্তু সব সময় এমনটি না-ও হতে পারে। কর্টিসলকে মানসিক চাপ সামলানোর সঙ্গে সম্পর্কিত করা হলেও এটি রক্তের গ্লুকোজ, মেটাবলিজম, রক্তচাপ ও রোগ প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।
কুশিং সিনড্রোম
মানসিক চাপের সময় কর্টিসল বেড়ে যাওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। সমস্যা তখনই হয়, যখন দীর্ঘ সময় ধরে সেটি বাড়তে থাকে। এতে শরীরের সব অপ্রত্যাশিত অংশে চর্বি জমতে পারে। মুখ ফুলে যেতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় কুশিং সিনড্রোম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্কিনফ্লুয়েন্সাররা ডাকছেন মুন ফেস নামে।
তবে শুধু মুখ দেখে কর্টিসল বেশি বলে দেওয়া যায় না। প্রশ্ন আসতে পারে, কর্টিসল যদি মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে এমন চাপ কি ত্বকের জন্য ক্ষতিকর নয়? দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে এবং প্রদাহ তৈরির মাধ্যমে ত্বককে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ব্রণ বা একজিমা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলোর পেছনে থাকে অপর্যাপ্ত ঘুম, লবণাক্ত খাবার, অ্যালার্জি কিংবা সাময়িক কোনো ওষুধের প্রভাব। তাই ফোলাভাব দেখা দিলেই সেটি কর্টিসল ফেস নয়।
ডিটক্স ডায়েট
কর্টিসল নিয়ন্ত্রণের জন্য কর্টিসল ডায়েট করার কথা ভাবছেন অনেকে। কর্টিসল প্রতিকার করে এমন সাপ্লিমেন্ট পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। কেউবা তৈরি করছেন কর্টিসল ককটেল জাতীয় বিশেষ পানীয়। কফি বাদ দিচ্ছেন। চেষ্টা করছেন ওজন কমানোর। বিভিন্ন ফেশিয়াল ব্যায়াম ছাড়াও গুয়াশার সাহায্যে চেপে চেপে মুখের ফোলাভাব কমানোর চেষ্টা রয়েছে কারও কারও। সেগুলো প্রচার করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অথচ এসবের আগে আগে কর্টিসলের কারণে মুখ ফুলে গেছে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া দরকার, জানান ডা. শারমিন জাহান। তার মতে, একজন সুস্থ মানুষের কর্টিসল কমানোর জন্য কোনো রুটিন ডিটক্সের প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া অপ্রয়োজনীয়ভাবে কর্টিসল কমানোর চেষ্টা ক্ষতিকরও হতে পারে।
চিকিৎসা পরামর্শ
কর্টিসলের কারণে কুশিং সিনড্রোম হলে শুধু মুখের পরিবর্তনই নয়, দেখা দেয় আরও বেশ কয়েকটি লক্ষণ।
 অস্বাভাবিক এবং দ্রুত ওজন বৃদ্ধি
 ঘাড়ে ও গলায় চর্বি জমা
 ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া
 ত্বকে কালশিটে দাগ পড়া
 ব্রণ হওয়া
 মুখে অতিরিক্ত লোম গজানো
 পেশি দুর্বলতা অনুভূত হওয়া
 লালচে-বেগুনি স্ট্রেচ মার্ক পড়া
 উচ্চ রক্তচাপে ভোগা
 মাসিক অনিয়মিত হওয়া
 মন খারাপ, খিটখিটে ভাব কিংবা মনোযোগ দিতে অসুবিধা
 ঘুমে ব্যাঘাত ঘটা।
ডা. শারমিন জাহান বলেন, এই লক্ষণগুলো থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষার মাধ্যমে কর্টিসলের ভারসাম্য নিয়ে নিশ্চিত হয়ে তবেই চিকিৎসা নিতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্বক নিয়ে এতশত চর্চার ভিড়ে অনেকে ভুলে যান, সবকিছু সবার জন্য নয়। সামান্য লক্ষণ মিলে গেলেই নিজে নিজে সমাধান করতে চাওয়ার চেষ্টা অনেক সময় ভালো ফল বয়ে আনে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্টিসলের ব্যাপারটিও তা-ই। মুখে ফোলাভাব দেখা দিলে প্রথমে জীবনযাপনের দিকে খেয়াল করা চাই। ঠিকমতো ঘুম, প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত ব্যায়াম নিশ্চিত করলে এ সমস্যা অনেকটাই প্রশমিত হয়। সঙ্গে বেসিক স্কিন কেয়ার করলেই, ব্যস।

 বিউটি ডেস্ক
মডেল: বুশরা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top