skip to Main Content

হেরিটেজ I শাহতুষ

সুতা নয়, পশমে তৈরি। একটুখানি টুকরাও বহুমূল্য। একের পর এক বন্য হরিণ হত্যার দাগ পুরোটা জুড়ে। ছিল রাজকীয় বিলাসিতার স্বরূপ। এরপরে আসে আইনি খড়গ। তবু শোনা যায়, কালোবাজারে রমরমা এখনো

এক বিশেষ প্রজাতির হরিণের দেখা মেলে তিব্বত ও কাশ্মীরের পাদদেশ আর আশপাশের দুর্গম উচ্চভূমিতে। ডাকা হয় চিরু নামে। প্রাণীটির পুরো শরীর ঘন আর সূক্ষ্ম পশমে ঢাকা; যা সুরক্ষা দেয় সেখানকার তীব্র ঠান্ডা থেকে। সতেরো শতকে ব্যাপারটি নজরে এসেছিল মানুষের। প্রথমে হরিণ নিধন, তারপর পশম সংগ্রহ আর সেই পশমের উল সুতা থেকে তৈরি হতো উষ্ণ কাপড়। এতটাই হালকা যে ছোট্ট একটি আংটির ভেতর দিয়ে গলিয়ে নেওয়া যেত। খুব উন্নত মানের উল হওয়ায় কাপড়টির নাম দেওয়া হয় শাহতুষ। কারণ, ফারসি এই শব্দের অর্থ ‘উলের রাজা’।
মোগল আমলে রাজকীয় আধিপত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল শাহতুষ। ছিল সম্রাট ও অভিজাতদের ব্যবহার্য। পরে এর কদর ছড়িয়েছে ইউরোপেও। সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়েছিল বিরল ও ব্যয়বহুল ফ্যাশন অনুষঙ্গে। সেই চাহিদায় যুগের পর যুগ ধরে শাহতুষ বুনেছেন কাশ্মীরের কারিগরেরা।
তবে এর সত্যটা শুধু কাপড়েই আটকে ছিল না; ছিল উৎসের মধ্যেও। চিরু হরিণের পশম ভেড়া বা ছাগলের মতো জীবিত প্রাণী থেকে কেটে বা আঁচড়ে সংগ্রহ করা যায় না। পশমের জন্য চিরুকে হত্যা করে চামড়া ছাড়িয়ে নিতে হতো! একটি পূর্ণাঙ্গ শাহতুষ শাল তৈরিতে প্রাণ যেত তিন থেকে চারটি চিরুর। ফলে মানুষের বিলাসিতার সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হয় একটি বন্য প্রাণীর রক্তাক্ত পরিণতি।
বিশ শতকে আন্তর্জাতিক বাজারে শাহতুষের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। উচ্চমূল্যের এই পণ্যের জন্য ব্যাপক চোরাশিকার শুরু হয় এবং চিরুর সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। একসময় যে প্রাণী তিব্বতি মালভূমিতে বিপুল সংখ্যায় বিচরণ করত, শিকার ও অবৈধ বাণিজ্যের চাপে সেটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে।
এই নির্মম বাস্তবতা সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নড়েচড়ে বসে। চিরু সংরক্ষণে পরিবেশকর্মীদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আত্মত্যাগও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চীনের সংরক্ষণকর্মী জিসাং সোনাম দারগিয়ের মতো ব্যক্তিরা চোরাশিকারিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছেন। তিব্বতি এই হরিণকে সাইটসের (কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন ইনডেঞ্জার্ড স্পিসিজ অব ওয়াইল্ড ফনা অ্যান্ড ফ্লোরা) পরিশিষ্ট ১-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে এর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষিদ্ধ হয় কঠোরভাবে। ভারতেও চিরু সর্বোচ্চ মাত্রার বন্য প্রাণী সুরক্ষার আওতায় রয়েছে এবং শাহতুষের উৎপাদন ও বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন প্রণয়নের পরে দীর্ঘদিন ধরে শাহতুষ বুননের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকার বিষয়টিও সামনে আসে। বাণিজ্য বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরদের পুনর্বাসনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (ডব্লিউটিআই) ও ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার (আইএফএডব্লিউ)।
শাহতুষের ইতিহাস শুধু একটি শালের গল্প নয়; এটি মানুষের মানসিক বিবর্তনেরও সাক্ষ্য দেয়। একসময় বিরল প্রাণী হত্যা করে তার শরীরের অংশ সংগ্রহ করাকেই মনে করা হতো আভিজাত্য ও বিলাসিতার পরিচয়। কারও ঘরে সাজানো থাকত হরিণের শিং, কারও পোশাকে বন্য প্রাণীর চামড়া, আবার কারও অলংকারে ব্যবহৃত হতো হাতির দাঁত কিংবা বিরল পাখির পালক। প্রাণীর অস্তিত্বের বিনিময়ে গড়ে উঠেছিল মানুষের তথাকথিত রুচি ও ঐশ্বর্যের এক নির্মম সংস্কৃতি। সেই একই সমাজ আজ বুঝতে শিখেছে, প্রকৃতি ধ্বংসের বিনিময়ে পাওয়া সুন্দরতা আসলে সৌন্দর্য নয়। পাশাপাশি, প্রকৃতিকে জয় করাটাই প্রকৃত সভ্যতা নয়; বরং তা হলো সেটাই, যেখানে মানুষ নিজের লোভকে জয় করতে শেখে। একসময় যে শালের কোমলতার জন্য চিরুর রক্ত ঝরত, আজ সেই শালই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবিকতার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক কোনো পশমে নয়, মানুষের বিবেকেই বোনা হয়।

 আবু সালেহ শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ছবি: সংগ্রহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top