বিশেষ ফিচার I দেশীয় দর্পণে দেবী দুর্গা
পরমাপ্রকৃতি, বিশ্বের আদি কারণ ও শিবপত্নী। এভাবেই দেবী দুর্গার পরিচয় দিয়েছেন পৌরাণিক অভিধান সংকলক সুধীরচন্দ্র সরকার। বাংলার নীলাভ আকাশে পেঁজা তুলার মতো মেঘ আর তারই নিচে কাশফুল—এই গোটা আয়োজনটাই যেন দুর্গার আগমনী বার্তা
প্রকৃতি ও প্রত্যয়
দুর্গা শব্দকে ভাঙলে দুর্গ শব্দের সঙ্গে উপজাতক হিসেবে আ প্রত্যয় পাওয়া যায়। দুর্গ শব্দের অর্থ কারাগৃহ। আর আ শব্দের অর্থ হন্তা বা নাশক। এই কারাগারসদৃশ জরাজীর্ণ জগতের যিনি কর্তা, তিনিই হচ্ছেন দুর্গা। আবার পুরাণমতে, দেবী পার্বতী দেবতাদের অনুরোধে দুর্গম নামক এক অসুরকে বধ করেছিলেন বলে তার নাম দুর্গা। চণ্ডিকা, অম্বিকা, বৈষ্ণবী, মহিষাসুর-সংহারিণী, নারায়ণী, মহামায়া, কাত্যায়নী, জগদ্ধাত্রী, গন্ধেশ্বরী, বনদুর্গাসহ এমন আরও ১০৮টি নাম রয়েছে দুর্গার। শরৎ থেকে বসন্ত পর্যন্ত বাঙালির পূজার যে জাঁকজমকপূর্ণ সময়, তার শুভ সূচনা হয় দুর্গাকে দেবীরূপে পূজার মধ্য দিয়ে। এই শারদীয় উৎসবের আদি থেকে বর্তমান নিয়েই আজ আপনাদের সঙ্গে গল্প।
শাস্ত্রমতে
দুর্গার সবচেয়ে পরিচিত কাহিনি পাওয়া যায় দেবীমাহাত্ম্যে। পুরাণের বয়ানে, দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে আবির্ভূত হন দুর্গা। মহিষাসুরের দাপটে অতিষ্ঠ দেবতারা দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্র তুলে দেন। সিংহ হয় তার বাহন, আর যুদ্ধে মহিষাসুরকে বধ করেন তিনি। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে চেদী রাজবংশের রাজা সুরথ খ্রিস্টজন্মের ৩০০ বছর আগে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। তবে বাঙালিদের শারদীয় দুর্গার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আদিতে দেবী দুর্গার পূজা হতো বসন্তকালে, যা ‘বাসন্তীপূজা’ নামে পরিচিত। রাবণও বসন্তে পার্বতীর আরাধনা করেছিলেন। প্রথম শারদীয় দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায় কৃত্তিবাসের রামায়ণে, যা বাল্মীকির সংস্কৃত রামায়ণ রচনা থেকে অনূদিত। শাস্ত্র অনুযায়ী রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে শ্রীরামচন্দ্রের সব অস্ত্র বিফল হতে থাকে। তখন ব্রহ্মা রামচন্দ্রকে উপদেশ দিলেন শরৎকালে দেবী পার্বতীর পূজা করতে। দেবী আবার এই সময় মর্ত্যে তার বাপের বাড়ি বেড়াতে যান। রামচন্দ্র আশ্বিন মাসের শুক্লা ষষ্ঠীর দিন দেবীর আরাধনা শুরু করেছিলেন। সন্ধ্যায় বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস হলো। কিন্তু মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও সন্ধিপূজার পরেও দুর্গার আবির্ভাব না ঘটায় রাম ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে মহানবমী পূজার পরিকল্পনা করেন। ফুল নিবেদনের সময় দেখা গেল, একটা ফুল কম। তখন রামচন্দ্র নিজের চোখ দেবীর পায়ে নিবেদন করতে উদ্যত হলে তখনই দেবী দুর্গা আবির্ভূত হয়ে আশীর্বাদ করেন। তারপর রাম দশাননকে বধ করেন। বাঙালির শারদীয় দুর্গাপূজা মূলত শরতে রামচন্দ্রের এই অকালবোধন পাঠ।
মর্ত্যলোকে দেবী
এবার রামরাজত্ব থেকে মনুষ্য রাজ্যে ফিরে আসি। বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজা কোথায় হয়—এই প্রশ্নের সরল কোনো উত্তর নেই। তবে প্রচলিত কাহিনিতে রাজা কংস নারায়ণের নাম বারবার আসে। কংস নারায়ণ রায় কীর্তিবাসের কাছ থেকে রামের শারদীয় পূজার বর্ণনা শুনে আশ্বিন মাসে অকালবোধনের মাধ্যমে দুর্গাপূজা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর পর থেকে রাজশাহীর তাহেরপুরে শারদীয় দুর্গাপূজা চালু করেন তিনি। এরপর আসে জমিদারবাড়ির যুগ। ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা, সম্পদ ও প্রভাব দেখানোর উপলক্ষ হয়ে ওঠে দুর্গাপূজা। ঠাকুরদালানে প্রতিমা, অতিথি আপ্যায়ন, ভোজ, গান এবং যাত্রার মতো উৎসবের পরিসর বাড়তে থাকে। ঔপনিবেশিক বাংলায় নব্য ধনিক শ্রেণির উত্থান এবং ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে স্থানীয় অভিজাতদের সম্পর্ক এই উৎসবকে ভীষণ প্রভাবিত করেছিল। আবার এ-ও শোনা যায়, পলাশীর যুদ্ধের পর নবকৃষ্ণ দেব তার শোভাবাজারের রাজবাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন, যেখানে রবার্ট ক্লাইভকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
আঠারো শতকের দিকে দুর্গাপূজা ঠাকুরদালানের সীমানা পেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। প্রচলিত আছে, গুপ্তিপাড়ায় বারোজনের উদ্যোগে সমবেতভাবে পূজা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বারোয়ারি পূজার সূচনা হয়। এরপর পূজা ধীরে ধীরে সর্বজনীন হয়ে ওঠে। বিশ শতকে এসে পাড়া, মহল্লা ও সম্প্রদায়ের সম্মিলিত আয়োজনগুলো দুর্গাপূজার প্রধান কালচারে এসে দাঁড়ায়।
প্যান্ডেল থেকে প্যান্ডেলে
এবার একটু নিজেদের সময়ের কথা বলি। সময়ের পাখায় চড়ে দেবীর রূপের সঙ্গে বদলে গেছে আবহমান এই উৎসব উদ্যাপনের ঢং। কুমারটুলীর শিল্পীরা মাটি, খড়, বাঁশ আর রং দিয়ে দেবী প্রতিমা গড়ে এসেছেন এতকাল। সঙ্গে এখন জুড়ে গেছে নানা ধরনের চালচিত্র, কাঠামো ও শিল্পরীতি। থিমপূজা এসে গোটা উৎসবকে একটা শিল্পভাবনায় পরিণত করেছে। কখনো একটি প্যান্ডেল হয়ে উঠছে স্থাপত্যের পুনর্নির্মাণ, কখনো সমকালীন রাজনীতি বা পরিবেশের বক্তব্য, কখনো নিছক বিস্ময় তৈরির শিল্পকর্ম। ফলে এখনকার পূজামণ্ডপগুলো যেন একটা আর্ট এক্সিবিশনের জায়গা।
বাঙালির মনস্তত্ত্বে উমা
দুর্গাপূজার ইতিহাস পাঠ তো হলো, কিন্তু এই উৎসবের পেছনের মনস্তত্ত্বটা নিয়েও আলাপ জরুরি। কারণ, ঠিক এই জায়গাতে পৌরাণিক ভারিক্কি দর্শন মলিন হয়ে যায় বাংলার মমত্ববোধের কাছে। দুর্গতিনাশিনী দুর্গা তার বাপের বাড়িতে এসে মমতাময়ী উমা বনে যান। যেন বাংলারই কোনো মেয়ে বিকেলবেলা উঠোনে পা ছড়িয়ে বসেছে। গবেষক রেচ্যাল ফেল ম্যাকডরমেট উমাকে মা ও মেয়ে এই দুই আবেগের সমার্থক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাই দুর্গার আগমনী গান আসলে একটি পরিবারের অপেক্ষা। বিভিন্ন গবেষণাভিত্তিক আলোচনায় আগমনী গানের সঙ্গে ঘরছাড়া কন্যা, বৈবাহিক বিচ্ছেদ, নিজের ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং পরিচয়ের পুনর্গঠনের সম্পর্কও দেখানো হয়েছে। উনিশ শতকের কলকাতার পূজা নিয়ে তিথি ভট্টাচার্য তার জার্নাল অব এশিয়ান স্টাডিজে দেখিয়েছেন, আধুনিক শহুরে সমাজে ধর্ম, সম্প্রদায় ও পরিচয়ের সম্পর্ক কীভাবে বদলেছে। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপূজা ইউনেসকোর রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব দ্য ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটিতে স্থান পায়।
সমাপ্তি সুর
বাংলার শিল্প-সাহিত্যজুড়ে এই উৎসবের রেফারেন্স আছে ভূরি ভূরি। ঋত্বিক ঘটক তার মেঘে ঢাকা তারায় আগমনী সুরে মিশিয়েছেন দেশভাগ, ঘরছাড়া মানুষ এবং হারানো আশ্রয়ের বেদনা। উমার বাপের বাড়ি থেকে স্বামীর ঘরে চলে যাওয়ার চিত্রকল্পকে ঘটক ব্যবহার করেন উদ্বাস্তু জীবনের বিচ্ছিন্নতার রূপক হিসেবে। ১৮৮২ সালের আনন্দমঠ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দুর্গার শক্তি, সৌন্দর্য ও রক্ষাকারী সত্তার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ মিশিয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের দেবী (১৯৬০)-এর কথাও আসে আলোচনায়। দেবীমূর্তির আরোপিত পরিচয় কীভাবে একজন সাধারণ নারীর জীবনকে বদলে দিতে পারে, সেই অন্ধবিশ্বাস এবং সামাজিক ক্ষমতার প্রশ্ন তোলে এই সিনেমা।
দিন শেষে দুর্গাপূজা যেকোনো বাঙালির জন্য একটা হোমকামিং ফেস্টিভ্যাল, নারীর জন্য তার আপন শিকড়ের টান। তাই এই উৎসব কখনো শেষ হয় না। কারণ, কোনো বাঙালি নারীর জন্য তার বাবার বাড়ির দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
তথ্যসূত্র:
দুর্গা: অরিজিন অ্যান্ড হিস্ট্রি—জার্নাল অব দ্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি
দুর্গাপূজা ইন কলকাতা—ইউনেসকো ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ
ট্র্যাকিং দ্য গডেস—রিলিজিয়ন, কমিউনিটি অ্যান্ড আইডেনটিটি ইন দ্য দুর্গাপূজা সেরিমনিস অব নাইনটিন্থ সেঞ্চুরি কলকাতা, দ্য জার্নাল অব এশিয়ান স্টাডিজ
দেবী মহামায়া; অক্সফোর্ড বিবলিওগ্রাফিস ইন হিন্দুইজম
হিস্ট্রি অব ফার্স্ট দুর্গাপূজা, আনন্দবাজার
বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস—ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি রিসার্চ ফাউন্ডেশন
যেমন আছে শারদীয় দুর্গোৎসবের উৎপত্তিস্থল—দৈনিক সমকাল
শ্রেয় চৌধুরী
ছবি: ইন্টারনেট
