skip to Main Content

পুরাবৃত্ত I রানী ভবানীর রাজবাড়ি

১৭১৬ সালে বগুড়ার এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া ভবানী কখনো ভাবেননি, একদিন তার নাম জড়িয়ে যাবে বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী জমিদার হিসেবে; নাটোর পরিচিত হবে ভবানীর নামে

বিয়ের পর ভবানী আসেন নাটোর রাজপরিবারে। ১৭৪৮ সালে স্বামী রামকান্তের মৃত্যুর পর বদলে যায় তার গল্প। শোকের মাঝেই তাকে নিতে হয় বিশাল এক জমিদারির ভার। প্রজাবৎসলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও দানশীলতার জন্যই তিনি পরিচিত হন অর্ধবঙ্গেশ্বরী নামে। পুরুষশাসিত অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলায় একজন নারী হয়ে পরিচালনা করেছিলেন বিস্তীর্ণ এক রাজ্য। লড়াই করেছেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে। রানী নিজেই নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধ করেন এবং নাটোরবাসীর সহায়তায় সেই বাহিনীকে পরাজিত করেন।
নাটোর রাজবংশের গোড়াপত্তন অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে রাজা রামজীবন চৌধুরীর হাত ধরে। রাজ্যের যাত্রা সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হতে হতে পরিণত হয় বাংলার অন্যতম বৃহৎ জমিদারিতে। রাজবাড়ির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল বিশাল এক জলাভূমি। মাটি ভরাট করে, দিঘি ও পরিখা খনন করে গড়ে ওঠে রাজকীয় আবাস। সেই জলাভূমির পুরোনো নাম ছিল ভাতঝাড়ার বিল। নতুন বসতির নাম হয় নাট্যপুর, যা পরে মানুষের মুখে মুখে হয়ে ওঠে নাটোর। তবে নাটোর রাজবাড়ির গল্পে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়টি আসে রানী ভবানীর হাত ধরে।
রাজা রামকান্তের মৃত্যুর পর মাত্র ৩২ বছর বয়সে বিশাল জমিদারির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন ভবানী। প্রায় চার দশক দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করলেন। পাশে ছিলেন বিশ্বস্ত দেওয়ান দয়ারাম। রাজবাড়ির চত্বর সেই ইতিহাসের সাক্ষী।
বাড়ির মূল অংশ ছিল বড় তরফ। এখানেই রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। ইংরেজি ইউ আকৃতির প্রাসাদে কোরিন্থিয়ান স্তম্ভ, খিলান, উঁচু ছাদ আর ইতালি থেকে আনা সাদাকালো মার্বেল—সব মিলিয়ে স্থাপত্যে মিশেছিল দেশীয় ঐতিহ্য ও ইউরোপীয় প্রভাব। এর বিপরীতে ছোট তরফ। রাজবংশের উত্তরাধিকার বিভক্ত হলে বড় তরফ ও ছোট তরফ আলাদা ধারায় পরিচিত হয়। বড় তরফ যায় বিশ্বনাথ রায়ের হাতে, আর ছোট তরফের দায়িত্ব পান শিবনাথ রায়। ফলে রাজবাড়ির স্থাপত্য শুধু রাজকীয় জীবনযাপনের গল্প নয়, এটি রাজপরিবারের উত্তরাধিকার ও পরিবর্তনেরও সাক্ষী।
রাজবাড়ির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কাচারিবাড়ি। এখানেই জমিদারির প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হতো। প্রজাদের খাজনা, জমিদারির হিসাব কিংবা নানা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর জন্য এই কাচারিই ছিল শাসনব্যবস্থার বাস্তব কেন্দ্র। আর রাজপ্রাসাদের পাশে মন্দিরগুলোও বয়ে বেড়ায় রানী ভবানীর ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতার গল্প। তারকেশ্বর শিবমন্দির, শ্যামসুন্দর মন্দির ও আনন্দময়ী কালীবাড়ি—এসব দেবালয়ের দেয়ালে পোড়ামাটির অলংকরণে ফুটে উঠেছিল পৌরাণিক কাহিনি থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার মানুষের জীবন। একসময় রাজবাড়ির চারপাশে ছিল পরিখা, ভেতরে ছিল দিঘি ও পুকুর—জলটুঙ্গি, তারকেশ্বর, গোপীনাথ, আনন্দ ও মহাল। এসব নাম যেন হারিয়ে যাওয়া এক রাজকীয় ভূদৃশ্যের স্মৃতি বহন করে।
১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে রানীমহলের বড় অংশ ধসে মাটির নিচে চলে যায়। আজ সেখানে রয়ে গেছে শুধু ভগ্নাবশেষ আর স্মৃতিচিহ্ন। রানীমহল হারিয়ে গেলেও রানী ভবানীর গল্প ইতিহাসে সমুজ্জ্বল।

 লেখা ও ছবি: আবু সালেহ শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top