দেহযতন I সোমাটিক এক্সারসাইজ
দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, মানসিক চাপ কিংবা ভুল অঙ্গবিন্যাসের কারণে ঘাড়, কাঁধ, কোমর ও পিঠে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে শরীরচর্চার খোঁজে আবু সালেহ শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ
‘সোমাটিক’ শব্দটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘সোমা’ থেকে এসেছে, যার সরল বাংলা হতে পারে ‘জীবন্ত দেহ’। সোমাটিক এক্সারসাইজ এমন ধরনের মন ও শরীরকেন্দ্রিক অনুশীলন, যেখানে ধীর ও সচেতন নড়াচড়ার মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা হয়। কোথায় টান বা ভার লাগছে কিংবা কোন অংশে আরাম—এসব অনুভূতির দিকে মনোযোগ দেওয়া এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রয়োজনীয়তা পর্যবেক্ষণ
শহুরে জীবনে অনেকের দিনের বড় একটা সময় কাটে অফিসের চেয়ার, গাড়ি, রিকশা, বাস কিংবা সোফায়। কাজের সময় ল্যাপটপ ব্যবহার, অবসরে সেলফোনের স্ক্রিনে চোখ কিংবা বিনোদনের জন্য টেলিভিশন উপভোগ—এসব ক্ষেত্রে শরীর দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে থাকে। এর সঙ্গে কাজের চাপ, সময়ের তাড়া, যানজট এবং নানা ধরনের উদ্বেগ যুক্ত হলে তার প্রভাব পড়ে দেহের ওপরও। কেউ অজান্তে কাঁধ শক্ত করে রাখেন, কেউ ঘাড় সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে বসেন, কেউবা দিনের শেষে পিঠ বা কোমরে টান অনুভব করেন।
হোলিস্টিক ফিটনেস ও লাইফস্টাইল কোচ তানভীর হাসানের মতে, প্রচলিত ব্যায়াম যেখানে গতি বা শক্তি বৃদ্ধি কিংবা ক্যালরি বার্নের দিকে বেশি নজর দেয়, সেখানে সোমাটিক এক্সারসাইজে শরীর ও মস্তিষ্কের যোগাযোগ পায় অগ্রাধিকার। এর চর্চা করতে জিমে যেতে কিংবা বিশেষ কোনো সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয় না। দরকার শুধু কয়েক মিনিট সময় এবং নিজের শরীরের দিকে মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস।
চর্চাবিন্যাস
তাড়াহুড়ো কিংবা ভুল চর্চা নয়, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক পর্যায়ক্রম মেনে সোমাটিক এক্সারসাইজ করা জরুরি।
শরীর অনুভব
শান্ত জায়গায় বসুন বা শুয়ে পড়ুন। চাইলে চোখ বন্ধ রাখতে পারেন। কয়েক মুহূর্ত মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিজের পুরো শরীরে মনোযোগ দিন। কোথাও টান, ভারী ভাব কিংবা অস্বস্তি আছে কি না, খেয়াল রাখুন। আপাতত কিছু পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন না; শুধু অনুভবই যথেষ্ট।
ধীরে নড়াচড়া
যেখানে অস্বস্তি অনুভব করছেন, শরীরের সেই অংশ খুব ধীরে নাড়ান। কোনো অবস্থাতেই জোর করে টানবেন না কিংবা ব্যথার সীমায় যাবেন না। নড়াচড়ার সময় শরীরের প্রতিক্রিয়া খেয়াল রাখা চাই।
বাংলা ৪
হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে হামাগুড়ির অবস্থানে আসুন। এবার শুধু সামনে-পেছনে নয়; বরং শরীরকে ধীরে ধীরে গোলাকার বা সর্পিলভাবে নাড়াচাড়া করুন। কল্পনা করে নিন, আপনার শরীর বাংলা ‘৪’ সংখ্যায় রূপান্তরিত হয়েছে। শরীরের এই ভঙ্গি গ্রহণের পুরোটা সময় শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা জরুরি।
বগলে হাত
হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে থাকা অবস্থায় একটি হাত বিপরীত বগলের নিচ দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে দিন। শরীরকে সঙ্গে সঙ্গে মেঝের দিকে নামিয়ে আনুন। কয়েকবার ধীরে শ্বাস নিন এবং কোথায় টান বা শিথিলতা তৈরি হচ্ছে, তা অনুভব করুন।
সুফি গ্রাইন্ড
হাঁটু গেড়ে বা আরামে বসে বুক ও কোমরকে ধীরে ধীরে বৃত্তাকারে ঘোরান। এ সময়ে নড়াচড়া স্বাভাবিক ও আরামদায়ক রাখা দরকার।
ঈগল আর্মস
দুই হাত দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ধরার মতো ভঙ্গি করুন। এবার কনুই দিয়ে বাতাসে ইংরেজি ‘এ বি সি’ আঁকার মতো ধীরে ধীরে নাড়াচাড়া করুন। শরীরের অনুভূতির দিকে রাখুন পুরো মনোযোগ।
বাউন্স ও কম্পন
দাঁড়িয়ে সামান্য সামনে ঝুঁকে শরীরকে একদম মৃদুভাবে বাউন্স করুন। শিশুর দোল খাওয়ার মতো স্বাভাবিক ছন্দে শরীর নাড়ানো ভালো। এরপর হাঁটু সামান্য ভাঁজ করে পুরো শরীরে হালকা কম্পন তৈরি করতে পারেন। তবে জোর করে শরীর ঝাঁকানোর প্রয়োজন নেই।
স্পর্শ ও গুনগুন
এক হাত কপালে এবং অন্য হাত ঘাড়ে বা মাথার পেছনে রাখুন। কিছুক্ষণ নিজের হাতের স্পর্শ অনুভব করুন। এরপর ধীরে শ্বাস ছাড়ার সময় মৃদু হামিং বা গুনগুন করতে পারেন। একই সঙ্গে শরীরের ভেতরের অনুভূতির দিকে মনোযোগ রাখতে ভুলবেন না যেন।
পরিবেশে প্রত্যাবর্তন
সবশেষে স্থির হয়ে চারপাশে তাকান। ঘরের দরজা, জানালা, দেয়াল, আলো কিংবা আশপাশের বিভিন্ন জিনিসের দিকে ধীরে ধীরে মনোযোগ দিন। এর উদ্দেশ্য হলো মনকে অতীতের চিন্তা বা ভবিষ্যতের উদ্বেগ থেকে সরিয়ে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনা।
সোমাটিক এক্সারসাইজে দীর্ঘ সময় ব্যয় করার চেয়ে নিয়মিত চর্চা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিট দিয়ে শুরু করতে পারেন। তবে কোনো অনুশীলনেই শরীরের ওপর জোর খাটানো উচিত নয়। চর্চাকালে মাথা ঘোরালে কিংবা তীব্র অস্বস্তি বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ অনুভব করলে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্রাম নিন।
ছবি: ইন্টারনেট
