skip to Main Content

কনটেন্ট I উৎসব

এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ঋতুপর্ণ ঘোষ কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেই আলাপ তোলা রইল। আজকের বিষয়বস্তু তার ‘উৎসব’ সিনেমা। এটি আগে দেখা থাকলে চারপাশের এমন পূজা-পূজা গন্ধে ঝট করে রিওয়াচ দিতে পারেন। আর যারা দেখেননি, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক অদ্ভুত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

ঋতুপর্ণ ঘোষের উৎসব সিনেমা শুরু হয় প্রায় দুই মিনিটের একটা মনোলগ দিয়ে। তার প্রথম কয়েক লাইন দিয়ে শুরু করা যাক এই লেখা—
আমার মামার বাড়ির এই পুজোটা দেড় শ বছরের পুরোনো। শুনেছি, আমার মায়ের ঠাকুরদার আমলে এই পুজোয় নাকি দারুণ জাঁকজমক হতো। এক হাজার টাকার বাজি পুড়ত, দু হাজার লোক খেত, জার্মানি থেকে প্রতিমার গয়না আসত। এই বাড়ির প্রতিমা চিরকালই এক রকম—ট্র্যাডিশনাল স্টাইলের, এক চালার। সুকুমার সেনের বইতে মোস্ট প্রবাবলি আছে, এক চালার ঠাকুর মানেই যৌথ পরিবারের প্রতীক।
এবারের পূজায় মামার বাড়িতে এসেছে জয়। ফিল্ম নিয়ে পড়তে চাওয়া জয়ের ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে দর্শকও ঢুকে পড়ে তার মামাবাড়ির পূজায়। এই বাড়ির উঠোনে আলপনা পড়ছে, ঠাকুরদালানে প্রতিমা হচ্ছে, রান্নাঘরে চলছে ভোগের তোড়জোড়, বাইরে ঢাকের শব্দ। বহুদিন পর পরিবারের সবাই এক ছাদের নিচে। তবে অন্য সব পূজার সিনেমা থেকে উৎসব সিনেমা আলাদা অন্য জায়গায়। গুরুত্বপূর্ণ ফিল্মমেকারদের সিনেমাগুলো প্রায়শই অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যম পেরিয়ে সরাসরি সাহিত্য বনে যায়। ২০০০ সালে এই সিনেমার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন।
এই ছবিতে দুর্গাপূজা উপলক্ষ হলেও মূল চরিত্র নয়; বরং পূজা ঘিরে ভেঙে যেতে বসা একটি পরিবারের গল্প বলার জন্যই উৎসবকে বেছে নিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। পুরোনো বনেদি বাড়িতে কয়েক দিনের জন্য জড়ো হয় পরিবারের সদস্যরা। বাইরে পূজার প্রস্তুতি যত জমে ওঠে, ভেতরে তত খুলতে থাকে সম্পর্কের পুরাতন আলমারি। কেউ এই বাড়ি বিক্রি করে দিতে চায়, কেউ নিজের দাম্পত্যে সুখী নয়। কারও জীবনে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। আর কারও বহু বছরের পুরোনো প্রেম, যা পরিবার মেনে নেয়নি, আবার ফিরে এসেছে ঠিক সেই বাড়ির দরজায়। বিধবা মা ভগবতীকে ঘিরে দুই ছেলে, দুই মেয়ে, তাদের স্বামী-স্ত্রী এবং পরবর্তী প্রজন্ম—সবাই যেন একই পরিবারের অংশ। তবে সিনেমার প্রথম থেকে শিশির নামের এক চরিত্র নিয়ে স্লো টেনশন তৈরি হয়। এই নামের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বাড়ির মেয়ে পারুল। বহু বছর আগে, পারুলদের বাড়িতে, ওর দাদা-বোনদের সঙ্গে থাকত এক পিসতুতো দাদা, শিশির। সবাই ডাকত ভাইয়া। পারুল আর শিশির সম্পর্কে আত্মীয়। সেই সম্পর্ককে পেরিয়ে ওদের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল এক প্রেমের টানাপোড়েন। বিষয়টা জানাজানি হলে পরে পারুলের দাদারা শিশিরকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।
সিনেমায় দেখা যায়, এত বছর পর সেই শিশির পারুলদের বাড়িটি কিনতে চিঠি পাঠায়। পারুলের দাদাদেরও টাকার প্রয়োজন পড়ছে। সুতরাং তারাও চায় বাড়ি বিক্রি হোক। শিশির আসে ওদের বাড়িতে কথা বলতে।
এই জায়গাটায় পারুল ও শিশির—এই দুটি চরিত্র নিয়ে দারুণ একটা এক্সপেরিমেন্ট করেছেন পরিচালক। প্রথা ও সংস্কারে জর্জরিত চিরাচরিত বাঙালি মনকে প্রথাবিরোধী তীক্ষ্ণ ছুরি দিয়ে কাটাকুটি করার এই চর্চা ঋতুপর্ণ ঘোষের সব কাজেই লক্ষণীয়। পারুলের দাদার মেয়ে শম্পা ও পারুলের ছেলে জয়। সিনেমা আরও এগোলে বোঝা যায়, ওদের দুজনের মধ্যেও একটা সমাজ-বহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে উঠছে। যে সম্পর্কের কোনো নাম নেই সামাজিক অভিধানে। পারুল ও শিশিরের সম্পর্কের অসম্পূর্ণতাকে পরিচালক জয় ও শম্পার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা দিতে চেয়েছেন। এই দুটি চরিত্রের বিভিন্ন সংলাপ থেকে মনে হয়, তারা নিজেদের ভেতরকার এই যোগাযোগকে অস্বীকার না করে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। জয় আর শম্পার কথোপকথনের শেষে জয়ের সংলাপ এমন—
জয়: যা-ই বলিস, ভাইয়া আর সাইয়াটা বেশ ভালো রাইম করে, তাই না?
আরও দুটি চরিত্র আছে, যাদের নিয়ে আলোচনা না করে আড্ডা শেষ করা উচিত হবে না। বাড়ির ছোট মেয়ে কেয়া। ভালোবেসে অরুণকে বিয়ে করলেও তাদের বিবাহিত সম্পর্ক এখন ভাঙনের কিনারায়। সিনেমার শুরুতে অরুণ জিজ্ঞেস করে, ‘পূরবী বাজছে না?’ তারপর অরুণের স্মৃতিতে ফিরে জানা যায়, সেই দিনও তো বাজছিল এই পূরবী। গোটা সিনেমায় দুজনার কথোপকথনে বারবার উথলে উঠে এসেছে জমে থাকা অভিমান, অপ্রাপ্তি, অপমান আর একধরনের অনুচ্চারিত ভালোবাসা। একসময় কেয়া জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালে বাইরে সানাইয়ের সুর শোনা যায়। এই অংশে ঋতুপর্ণ আবার তার সংলাপ-লেখনী দিয়ে দর্শকদের কুপোকাত করলেন, যখন কেয়া বলে, ‘পূরবী না, মারওয়া!’। মারওয়া সূর্যাস্তের রাগ। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচ্ছেদ, ক্ষয় হয়ে আসা আলো, বিষাদ। কেয়া ও অরুণের সম্পর্কও তখন ঠিক তেমনই। দিনের শেষ প্রহরে এসে দাঁড়িয়েছে।
গোটা সিনেমায় ঋতুপর্ণ ঘোষ কেয়া ও পারুল—এই দুই বোনকে যেন দুর্গার মেটাফোরে সাজিয়েছেন। তার সঙ্গে যোগ করেছেন ঋতুপর্ণের সিগনেচার সংলাপ লেখনী আর নারীর মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষমতা।

 শ্রেয় চৌধুরী
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top