skip to Main Content

এডিটর’স কলাম I জীবন জীবনের জন্য- কানিজ আলমাস খান

কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো মানুষের কাছে একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেওয়া

আমার পেশাগত জীবনে এমন অনেক দায়িত্ব এসেছে, যেগুলোতে সময়, মনোযোগ এবং অঙ্গীকারের সর্বোচ্চ দাবি ছিল। ব্যবসা, উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং জনসচেতনতার নানা উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই নতুন কোনো দায়িত্ব গ্রহণের আগে ভাবতে হয়েছে, সত্যিই কি এর জন্য সময় দিতে পারব? তবু কিছু আহ্বান থাকে, যেগুলো শুধু একটি দায়িত্ব নয়; হয়ে ওঠে একটি মানবিক মূল্যবোধও।

দুই
জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতা গড়ে তোলার কাজে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবটি ঠিক তেমনই ছিল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন পিএলসির (জিএসকে) উদ্যোগে পরিচালিত জরায়ুমুখ ক্যানসার-বিষয়ক সচেতনতামূলক অভিযানের মুখপাত্র হওয়ার প্রস্তাব যখন পাই, তখন আমার সামনে এরই মধ্যে অসংখ্য পেশাগত ও সামাজিক দায়িত্ব ছিল। অনেকে জানতে চেয়েছিলেন, এত ব্যস্ততার মধ্যেও কেন এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হলাম। আমার উত্তর ছিল খুবই সহজ। কারণ, এটি শুধু প্রচারাভিযান ছিল না; ছিল জীবন বাঁচানোর একটি প্রয়াস।

তিন
যখন জানতে পারলাম, বাংলাদেশে জরায়ুমুখ ক্যানসার নারীদের অন্যতম প্রধান অসুখ এবং প্রতিবছর হাজার হাজার নারী এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, তখন বিষয়টি আর দূর থেকে দেখার সুযোগ ছিল না। আরও নাড়া দিয়েছিল এই সত্য যে, সময়মতো সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগের বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ৩০ বছর বয়সের পর নারীদের নিয়মিত জরায়ুমুখ ক্যানসার স্ক্রিনিং করা গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষায় জরায়ুমুখ ক্যানসারের আগের অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করা যায়। ফলে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ থাকে। বাংলাদেশে ভিআইএ, প্যাপস্মিয়ার, এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে স্ক্রিনিং করা হয়। জরায়ুমুখ ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভি। প্রতিরোধে রয়েছে এইচপিভি টিকাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরীদের টিকাদানকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে ৪৫ বছর পর্যন্ত দেয়ার সময়কাল রয়েছে।

চার
এই যাত্রায় যখন চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি, গবেষণার তথ্য জেনেছি এবং আক্রান্ত পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা শুনেছি, তখন একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল—এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় বাধা সব সময় চিকিৎসার অভাব নয়, অনেক সময় নীরবতা। লজ্জা, ভুল ধারণা এবং সচেতনতার ঘাটতি অসংখ্য নারীকে সময়মতো পদক্ষেপ নিতে বাধা দেয়। সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করি, একজন মানুষ হিসেবে আমার কণ্ঠ যদি একজন নারীকে সচেতন হতে সাহায্য করে, একজন মাকে পরীক্ষা করাতে উদ্বুদ্ধ করে, কিংবা একটি পরিবারকে সঠিক তথ্যের কাছে পৌঁছে দেয়, তবে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করাই উচিত। কখনো কখনো একটি বার্তা এমন মানুষের কাছেও পৌঁছে যায়, যাদের কাছে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্য অন্য কোনো মাধ্যমে পৌঁছায় না।

পাঁচ
এই পথচলায় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, যারা বছরের পর বছর নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের নিষ্ঠা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং আশাবাদী করেছে যে, সম্মিলিত প্রয়াস থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। আমার বিশ্বাস, সচেতনতা শুধু তথ্য দেয় না, জীবনও বাঁচায়। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে নারীস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কারণ, নীরবতা ভাঙার মধ্যেই অনেক সময় একটি জীবন রক্ষার শুরু হতে পারে। আমি সেই বিশ্বাস থেকে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। আমি মনে করি, কিছু দায়িত্ব পেশাগত নয়, মানবিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top