বিশেষ ফিচার I কফি কাফি
কফি নিয়ে আলাদা কালচার গড়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী। এসপ্রেসো থেকে ক্যাপাচিনো—ধরনেও রয়েছে বৈচিত্র্য। ৮৬টির বেশি কফি ড্রিংকসের প্রচলন পৃথিবীজুড়ে। দিনের শুরু থেকে শেষে, কাজে অকাজে, সেলফ কেয়ার বা অ্যাসথেটিকে কফি দারুণ বন্ধু
টি এস এলিয়টের একটা বিখ্যাত লাইন দিয়ে শুরু করা যাক, ‘হ্যাভ নোন দ্য ইভনিংস, মর্নিংস, আফটারনুনস। আই হ্যাভ মেসার্ড আউট মাই লাইফ উইদ কফি স্পুনস’। আবার হালের আইরিশ গায়ক এন্ড্রু হোজিয়েরের গান টু সুইট, একটু পেছনে ফিরলে মান্না দের কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই। কবিতা থেকে গান, কোটি মানুষের যাপনচিত্রের সমার্থক শব্দ বনে গেছে কফি। সুতরাং এই লেখা পড়ার সময় হাতে এক কাপ কফি নিয়ে বসতে পারেন। মন্দ লাগবে না।
আরবি কাহওয়াহ শব্দ থেকে উৎপত্তি; যার অর্থ, যে পানীয় ক্ষুধা নষ্ট করে। এরপর তুরস্কে গিয়ে কাহভে এবং ইউরোপে ঢুকে কাফে বা কফি ডাকনাম পায় এই পানীয়। বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা বাণিজ্যিক শিল্পের তকমা পেলেও উৎপত্তি নিয়ে আছে নানা উপকথা। কেউ বলেন, ইথিওপিয়ার এক নিঃসঙ্গ মেষপালক তার ছাগলপালের দারুণ দুরন্তপনা থেকে কফি বীজ আবিষ্কার করে। অনেকের দাবি, সুন্দর একটি পাখির লাল রঙা ফল খাওয়া দেখে ইয়েমেনের কোনো সুফি সাধক কফি বীজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। তবে উৎপত্তি যেখানেই হোক, ইতিহাসজুড়ে কফি পানের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ মজার! মক্কায় এই পানীয়কে বলা হতো মিরাকল ড্রাগ। কারণ, এই পানীয় সেবনে ক্লান্তি ও অবসন্নতাকে দমিয়ে সতেজ বোধ করতেন সেখানকার মানুষ।
এই পানীয়কে আটকানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল বহুবার! পঞ্চদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীতে মক্কার পণ্ডিতেরা মনে করতেন, কফির আড্ডায় জনগণের ভেতরে চাপা রোষ বেরিয়ে পড়তে পারে। সরকার পতনের আশঙ্কায় তারা এই পানীয়কে হারাম ঘোষণা করেন। ভিনদেশিরা একে বলত আরবের ওয়াইন। আবার কট্টর ক্যাথলিকরা বলত শয়তানের পানীয়। এত কিছুর পরেও কফির যাত্রা থামানো গেল না। ইয়েমেনে সুফি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো রাত জেগে ইবাদতের জন্য কফি পান করত। সেখান থেকে এই পানীয় মক্কা, মদিনা, কায়রো, দামেস্কসহ আরবের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে আসে। ভিড় বাড়ে কফি পানের জায়গায়। এরপর সময়ের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে এই ভিড়গুলো হয়ে যায় কফি হাউসের আড্ডা।
কফি হাউসের ইতিহাসটা সংক্ষেপে বলি। শুরুর দিকে ইস্তাম্বুলে কফি অভিজাতদের পানীয় হিসেবে থাকলেও অটোমানরা কফির জনপ্রিয়তা দেখে এর বাণিজ্যিকীকরণ শুরু করে। সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে আসার পরে কফি পান ঘিরে জমে আড্ডা, দাবা খেলাসহ বিভিন্ন কাণ্ড। অটোমান ইতিহাসবিদদের দাবি, প্রথম কফি হাউস চালু করেন দামেস্কের এক ব্যক্তি। ১৪৭৫ খ্রিস্টাব্দে অটোমান শাসনামলে সুলতান মেহমেদ দ্য কনকুয়েররের রাজত্বকালে ইস্তাম্বুলে চালু হওয়া এই হাউসের নাম ছিল কিভা হান। সরাসরি এই নামের অনুপ্রেরণা ঢাকাতেও আছে; কিভা হান নামে কফি হাউস। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত অটোমান ভ্রমণকাহিনি লেখক এভলিয়া চেলেবি বড় শহরগুলোর কফি হাউস সম্পর্কে প্রাণবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন। যেগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটিতে একসঙ্গে এক হাজার পর্যন্ত গ্রাহক বসতে পারতেন। মজার বিষয় হলো, সে সময়কার বিভিন্ন কফি হাউসে নজরদারি রাখা হতো। ধারণা ছিল, বিপ্লবের পেছনের শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে এই আড্ডাখানাগুলো।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপীয়রা ইথিওপিয়া থেকে কফিগাছ পাচার করে ক্যারিবিয়ান সাগরে তাদের উপনিবেশগুলোতে সফলভাবে রোপণ করে। শতাব্দীর শেষ নাগাদ, এমনকি অটোমান সাম্রাজ্যের বাজারগুলোতেও ইয়েমেনি কফি বীজের জায়গা দখল করতে শুরু করে আমেরিকা থেকে আসা কফি বিন। আঠারো শতকের আলোকায়ন যুগে প্যারিসের ক্যাফেগুলো ছিল মুক্তচিন্তা ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ফরাসি বিপ্লবের আগে-পরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা ও মতবিনিময় হয়েছে এসব ক্যাফেতে। পরে উনিশ ও বিশ শতকে ক্যাফে সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হয়। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জ্যঁ-পল সার্ত্র, সিমোন দ্য বোভোয়ার, পাবলো পিকাসোসহ অসংখ্য সৃষ্টিশীল মানুষ তাদের সময় কাটিয়েছেন প্যারিসের বিখ্যাত ক্যাফেগুলোতে। এখানকার কফি সংস্কৃতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ক্যাফে টেরেস। রাস্তার ধারে ছোট টেবিল-চেয়ার পেতে বসে ধীরে ধীরে কফি পান করা, মানুষ দেখা এবং আড্ডা দেওয়া শহরের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার কফি সংস্কৃতির সবচেয়ে আইকনিক কালচার রেফারেন্স এসেছে যে ‘কফি হাউস’ গান থেকে, সেটির প্রাথমিক ইন্সপিরেশনটাও ছিল প্যারিসের কফি কালচার।
তবে বর্তমান সময়ে কফি নিয়ে মাতামাতি বেড়েছে বহুগুণ। ২০১৫ সালে এক টেনিস ম্যাচে প্রথম সেট হেরে পিছিয়ে ছিলেন টেনিস সুপারস্টার সেরেনা উইলিয়ামস। দ্বিতীয় সেটের আগে আম্পায়ারের কাছ থেকে এক কাপ কফি খাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন তিনি। তার কাছে কফির জোর এতটাই!
আবার, জীবনে কফির গুরুত্ব কতটা, তা বোঝাতে আমেরিকান গায়ক, অভিনেতা ও কমেডিয়ান হেনরি রোলিন্স এক শোতে বলেছিলেন, কাপ কফির সঙ্গে সবচেয়ে ভালো যায় আরেক কাপ কফি!
কফির সবচেয়ে আবেদনময় উপস্থাপনা দেখা যায় সম্ভবত সিনেমায়। ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস সিনেমার শুরুতে নিউইয়র্কের রাস্তায় ট্যাক্সি থেকে নেমে টিফানিস অ্যান্ড কোং-এর জানালায় দাঁড়ান অড্রে হেপবার্ন। হাতে ছিল কফি আর পেস্ট্রি। এই দৃশ্য পরবর্তী সময়ে রীতিমতো পপ কালচার বনে গিয়েছিল। পাল্প ফিকশন সিনেমায় জিমির বাড়িতে এসে ভিনসেন্ট আর জুলসের সেই কফি নিয়ে হেঁয়ালি কথোপকথনের দৃশ্য মনে আছে নিশ্চয়। এমিলি থেকে বিফোর সানরাইজ অথবা টুইন পিকস সিনেমায় কফি নিজেই যেন চরিত্র অভিনেতা। কফি উন্মাদনায় নাম লিখিয়েছেন লেখকেরাও। তাদের মধ্যে ফরাসি লেখক অনরে দ্য ব্যালজাকের কথা আলাদা করে বলা যায়। তার কফি পানের অভ্যাস ছিল প্রায় কিংবদন্তিতুল্য। দিনের শুরুতে অন্য কিছু খাওয়ার আগেই তিনি মিহি গুঁড়া করা রোস্টেড কফি বিনস খেতেন, সামান্য পানিতে মিশিয়ে। এদিকে চার্লস বুকাওস্কির কফি কালচার ছিল ভীষণ আটপৌরে। তার কবিতায় কফি আসে পাঁচ সেন্টের ডাইনারের কাউন্টারে, দুপুরের লোকাল ক্যাফেতে অথবা সকালবেলার সিগারেটের সঙ্গে।
কিন্তু এমন কী আছে এই কফিতে? উত্তরটা এক শব্দের—ক্যাফেইন। ক্যাফেইন মস্তিষ্কে ঘুমভাব তৈরির পেছনে দায়ী রাসায়নিক অ্যাডেনোসিনের কার্যক্রম আটকে দেয়। ফলে সাময়িকভাবে আমাদের মনোযোগ বাড়তে পারে। কফির ঘ্রাণটাও ভীষণ আকর্ষণীয়। সদ্য ভাজা কফি বিনের ঘ্রাণ মানুষের মস্তিষ্কে উষ্ণতা, স্বস্তি, ঘনিষ্ঠতা ও পরিচিতির অনুভূতি জাগায়। সুগন্ধি নির্মাতারা কফিকে ব্যবহার করেন আরামদায়ক ও মোহনীয় আবেদন জাগাতে। তাপের প্রভাবে বীজের কার্বোহাইড্রেট, অ্যামিনো অ্যাসিড, লিপিডসহ অন্যান্য উপাদান থেকে শত শত কম্পাউন্ড তৈরি হয়ে আমাদের দেয় কফির সিগনেচার অ্যারোমা।
কফির কাপে শুধু ক্যাফেইন নয়, মিশে আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি আর সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া এক দীর্ঘ গল্প। সময় বদলেছে, কফিতে যোগ হয়েছে রকমারি স্বাদ আর বদলেছে উপস্থাপন। কিন্তু এক কাপ কফি ঘিরে মানুষে মানুষে যে গল্পের শুরু, তার আবেদনে আসেনি একবিন্দু ঘাটতি।
শ্রেয় চৌধুরী
ছবি: ইন্টারনেট
