তেলেসমাতি I সয়াবিনের সাতকাহন
হেঁশেলের ইতিহাসে কয়েক দশক ধরে জনপ্রিয় চরিত্র সয়াবিন তেল। সকালের ভাজি থেকে দাওয়াতের রোস্ট, রাস্তার ফুচকা থেকে পাঁচ তারা হোটেলের রান্নাঘর—উপস্থিতি সর্বত্র। অথচ এই পরিচিত তেল ঘিরে আছে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন, বিতর্ক, মতভেদ
সয়াবিনের চাষ শুরু হয় প্রায় ৫ হাজার বছর আগে, চীনে। পরবর্তী সময়ে কোরিয়া, জাপানসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং একসময় পাড়ি জমায় বহির্বিশ্বে। বাংলাদেশের হেঁশেলে বহু মানুষের প্রতিদিনের সঙ্গী এই তেল।
মিথের মোচন
শীর্ষ অভিযোগ হৃদ্রোগের কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে পরিমিত সয়াবিন তেল ব্যবহার করলে রক্তের এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমতে পারে। আবার ওমেগা-৬ নিয়েও আছে বিস্তর বিতর্ক। যদিও বৈজ্ঞানিক তথ্য এই দাবিকে সরলভাবে সমর্থন করে না। একসময় খাদ্যশিল্পে ব্যবহৃত আংশিক হাইড্রোজেনেটেড সয়াবিন তেল নিয়ে উদ্বেগ ছিল। তখনকার প্রক্রিয়ায় ট্রান্সফ্যাট তৈরি হতো, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে প্রমাণিত। বর্তমানে অধিকাংশ ভোজ্য সয়াবিন তেল এই প্রক্রিয়ার বাইরে তৈরি হয়। ফলে পুরোনো আশঙ্কার অনেকটাই এখন ইতিহাস।
রকমারি
রিফাইন্ড, কোল্ড-প্রেসড ও কোলেস্টেরল ফ্রি। রিফাইন্ড সয়াবিন তেল পরিশোধনের মাধ্যমে গন্ধ, রং ও অমিশ্রতা কমিয়ে তৈরি করা হয়। তাই স্বাদে তুলনামূলক নিরপেক্ষ এবং উচ্চ তাপমাত্রার রান্নায় বেশি ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে কোল্ড-প্রেসড তেল কম প্রক্রিয়াজাত। এতে সয়াবিনের স্বাভাবিক গন্ধ ও স্বাদের কিছুটা উপস্থিতি থেকে যায়। তবে সব সময় যে পুষ্টিগুণে নাটকীয়ভাবে এগিয়ে থাকবে, এমন ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সীমিত। আর কোলেস্টেরল ফ্রি শব্দটি বিপণনের কৌশল। কেননা সব উদ্ভিজ্জ তেলই স্বাভাবিকভাবে কোলেস্টেরলমুক্ত।
করণীয়
তুলনামূলকভাবে উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। তবে তারও সীমা আছে। ধোঁয়া উঠতে শুরু করা মানেই তেলের ভেতরে রাসায়নিক পরিবর্তনের সূচনা। আবার তেল কেনার সময় শুধু ব্র্যান্ড নয়, নজর দিতে হবে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ এবং প্যাকেজিংয়ের অবস্থার দিকে। বোতল খোলার পর সরাসরি আলো ও তাপ থেকে দূরে রাখুন। ব্যবহারের পর মুখ শক্ত করে বন্ধ করুন। আর ভাজার পর অবশিষ্ট তেল বারবার ব্যবহার করার অভ্যাস থাকলে সেটি বদলানোর সময় এসেছে।
সয়াবিন তেলকে অলৌকিক কোনো সুপারফুড ভাবার কারণ নেই, আবার দরকার নেই অকারণে ভয় পাওয়ারও। অন্যান্য ভোজ্যতেলের মতোই এর স্থান একটি সুষম খাদ্যাভ্যাসের ভেতর।
তথ্যসূত্র: হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন, ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ)
ফুড ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট
