কভারস্টোরি I শেষ পাতে মিষ্টি
রসে বশে থাকে বাঙালি। মিঠা স্বাদের প্রতি ভালোবাসার তীব্রতার পারদ অনেক ওপরে। নান্দনিক সন্দেশ কিংবা তুলতুলে রসগোল্লা—পাতে মিষ্টি না থাকলে ভোজনটাই যেন ভন্ডুল! যুগের হাওয়ায় স্বাদে-রূপে বদল এলেও শেষ পাতের এই মহারাজা আজও সিংহাসনে আসীন। মধুমুখের ইতিবৃত্ত নিয়ে নাঈমা তাসনিমের কথকতা
সন্তানের আগমন, পরীক্ষায় ভালো ফল, চাকরির সুসংবাদ কিংবা ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানো—মধ্যস্থতাকারী মিষ্টি। অতিথি আপ্যায়নে খাবারের হাজারো আয়োজন থাকলেও শেষ পাতে মিষ্টি না হলে আতিথেয়তায় অপূর্ণতা রয়ে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে তো অসম্মানের অপরাধ! মিষ্টি বাঙালির কাছে শুধু স্বাদের তৃপ্তি নয়, আনন্দের নিখাদ বহিঃপ্রকাশ। ঘরের দুয়ারে সুসংবাদ কড়া নাড়লেই উচ্চারিত হয়—মুখ মিষ্টি করাও! ঈদ, পূজা কিংবা বর্ষবরণ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক—সব পার্বণেই সম্পর্কের মাধুর্য প্রকাশের মাধ্যম। ভাষার দিক থেকেও কোমলতা ও সৌহার্দ্য জড়িয়ে। যেমন মিষ্টি কথা, মিষ্টি ব্যবহার। বিজ্ঞান বলে, মিষ্টি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক ডোপামিন ও সেরোটোনিন নিঃসরণ করে; যা মানুষকে অতি দ্রুত প্রফুল্ল করে তোলে। আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে দুধ ও ঘি দিয়ে তৈরি পদকে বিশুদ্ধাহার বলা হয়েছে। পুষ্টি আর পবিত্রতার মেলবন্ধনে মিষ্টি তাই বাঙালি সংস্কৃতির উত্তম ও শুভ অনুষঙ্গ।
ঐতিহ্যের উৎসমুখ
ঢাকার বুকে ১৮৬৪ সালে গড়ে ওঠা আলাউদ্দিন সুইটস ঢাকাইয়া মিষ্টান্ন সংস্কৃতির পথিকৃৎ। বাড়িতে আলাউদ্দিনের মিষ্টি আনাকে সম্মান ও সুরুচির পরিচয় ধরা হতো বিংশ শতাব্দীতে। ১৯ শতকের শেষ ভাগে আসে মরণ চাঁদ গ্র্যান্ড সন্স। তাদের গাঢ় বাদামি চমচম এবং মাটির হাঁড়ির খাঁটি লাল দই জুড়ে যায় ঢাকার ঐতিহ্যে। অন্যদিকে, পুরান ঢাকার রূপলাল দাস লেন থেকে উঠে আসা বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার তাদের ছানার মিষ্টির জন্য সমাদৃত। সুস্বাদু ক্ষীরভোগ ও রসমালাইয়ের সুবাদে সুপরিচিত মুসলিম সুইটস।
১৮২৪ সালে মুক্তাগাছার রাজবাড়ির পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয় গোপাল পালের মণ্ডার দোকান। প্রায় ২০০ বছর ধরে গোপন রেসিপিতে তৈরি এই মণ্ডার রাজকীয় ঐতিহ্য এখনো টিকিয়ে রেখেছে দোকানটি। ১৯৩০ সালে কুমিল্লা শহরের মনোহরপুরে গড়ে ওঠে মাতৃভান্ডার। ঘন খাঁটি ক্ষীরে ডোবানো রসগোল্লার সুবাদে আসল ও বিশ্ববিখ্যাত রসমালাইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীর চমচম, মিষ্টির জগতে যাকে বলা হয় রাজা। ধলেশ্বরীর শাখানদীর মিষ্টি জল, গাভির খাঁটি দুধ আর দশরথ গৌড়ের হাত ধরে প্রায় দুই শ বছর আগে জন্ম নেয় এই চমচম। কড়া আঁচে গাঢ় বাদামি শক্ত বহিরাবরণ, অথচ ভেতরে ছানার রসে টইটম্বুর। চমচম হলো বাঙালির মিষ্টির আভিজাত্য।
নেত্রকোনার ময়রা গয়ানাথ ঘোষালের অদম্য স্বপ্ন ছিল এমন এক মিষ্টি বানানো, যা তাকে অমর করবে। সেই স্বপ্ন থেকে সৃষ্টি এক কেজি পর্যন্ত ওজনের বৃহৎ বালিশ মিষ্টি। চিনির রসে ডুবিয়ে ওপরে ক্ষীরের প্রলেপ দিয়ে পরিবেশন করা হয়। বস্তুত বাঙালি মিষ্টান্ন রসনায় তিনি যোগ করেছিলেন একটি নতুন পদ। জনশ্রুতি আছে, ১৭৬০-এর দশকে নাটোরের রাণী ভবানীর রাজবাড়িতে রান্নার ভুল থেকে জন্ম নেয় কাঁচাগোল্লা। তার রাজত্বকালে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং বিলাতের রাজপরিবারসহ বিভিন্ন রাজদরবারে উপঢৌকন হিসেবেও পাঠানো হতো। খাঁটি ও আদি কাঁচাগোল্লার জন্য ১৭২ বছরের বেশি পুরোনো নাটোরের লালবাজারের দ্বারিক ভান্ডারের নাম মানুষের মুখে মুখে। এ প্রজন্মের কর্ণধার অভিজিৎ কুণ্ডু পূর্বজনদের মতো এই মিষ্টির রহস্য ধরে রেখেছেন। তিনি জানান, অনেকে আছেন, যারা তাদের প্রিয়জনদের জন্য দেশের বাইরে এই কাঁচাগোল্লা নিয়ে যান। কাঁচাগোল্লার সংরক্ষণ পদ্ধতি জানালেন নিঃসংকোচে। কাঁচাগোল্লার নরম, কোমল স্বাদ ধরে রাখতে সংরক্ষণেও চাই একটু বাড়তি যত্ন। ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কাঁচাগোল্লা সাধারণত আজ, কাল ও পরশু; অর্থাৎ প্রায় তিন দিন ভালো থাকে। তবে সময়টা আরও বাড়াতে চাইলে ভরসা নরমাল ফ্রিজ। এভাবে সংরক্ষণ করলে পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত খাওয়া যায়। তবে ফ্রিজ থেকে বের করার পর কাঁচাগোল্লা নিয়ে রোদে বের হওয়া, বাস-ট্রেনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া কিংবা ঘোরাঘুরি করা ঠিক নয়। যতটুকু খাবেন, বের করার এক ঘণ্টার মধ্যে খেয়ে নেওয়াই ভালো। বাকি অংশ দ্রুত আবার ফ্রিজে তুলে রাখতে হবে। তাই দূরে কোথাও নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে নরমাল ফ্রিজের বদলে ডিপ ফ্রিজে জমিয়ে নেওয়া যেতে পারে। বিশ্বখ্যাত এই কাঁচাগোল্লাই পেয়েছে ইউনেসকোর জিআই স্বীকৃতি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শ্রী রামকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার স্ফটিকের মতো চিনির আস্তরণে তৈরি ছানামুখীর আদি কারিগরি রূপ রক্ষা করে চলেছে। এটিও অর্জন করেছে জিআই স্বীকৃতি। বরিশাল সদর উপজেলার গুটিয়া সন্দেশ ঘর, নরম ছানার খাঁটি সন্দেশের জন্য দক্ষিণবঙ্গে বিখ্যাত। নওগাঁর দেবালয়ের পূজার ভোগ থেকে উঠে আসা প্যারা সন্দেশ শতবর্ষী ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছে। প্রায় ১৫০ বছর আগে মেহেরপুরের শিবু ময়রা বানান রসহীন এক মিষ্টি, কিন্তু মুখে দিলে মিলিয়ে যায় মুহূর্তে। নাম দেন সাবিত্রী মিষ্টি, যা এখনো বিশেষভাবে সমাদৃত।
কালান্তর
আজকের এই রসাল রসগোল্লা, চমচম কিংবা ছানার সন্দেশ মধ্যযুগীয় বাংলায় মোটেও বিদ্যমান ছিল না। বাঙালির মিষ্টির ইতিহাস দীর্ঘ সামাজিক বিবর্তনের ফসল। ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালির ইতিহাস এবং ভাষাবিদ সুকুমার সেনের গবেষণায় দেখা যায়, প্রাচীন বাংলায় সন্দেশ বলতে ছানার কোনো পদ বোঝাত না। তখনকার সন্দেশ তৈরি হতো ডালের গুঁড়া, নারকেল, চিঁড়া ও গুড়ের সংমিশ্রণে। মিষ্টান্নের মূল উপাদান আখের গুড়, খেজুরের গুড়, তিল, মুড়ি, খই ও দুধ। রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ এবং ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মঙ্গলকাব্যে পিঠা, পুলি, কদমা, তিলখাজা, নাড়ু, মোয়া ও ফেনি বাতাসার বিবরণ মেলে।
বাংলায় মিষ্টিশিল্পের বাঁকবদল ঘটে মূলত সপ্তদশ শতাব্দীতে, পর্তুগিজদের হাত ধরে। পশ্চিমবঙ্গের ব্যান্ডেল ও হুগলি অঞ্চলে বসতি গড়া পর্তুগিজদের থেকে আসে সূত্র। স্থানীয় ময়রা বা হালুয়াইরা অম্লজাতীয় যৌগ যোগে দুধ ফেটিয়ে ছানা, পনির তৈরির কারিগরি শেখে। তবে ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে ছানা অচ্ছুত ছিল। ঋগ্বেদীয় ও মনুসংহিতার বৈদিক রীতি অনুযায়ী, কাঁচা দুধের স্বাভাবিক রূপান্তর; যেমন দই, মাখন, ঘি পূজনীয় হলেও কৃত্রিমভাবে দুধ ভেঙে তৈরি খাবার ছিল নিষিদ্ধ।
ব্রাত্য সেই ছানাকে মিষ্টির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার গৌরব বাংলা সংস্কৃতির। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে হুগলি ও কলকাতার ময়রাদের মাঝে হারাধন ময়রার হাত ধরে খাঁটি ছানাকে চিনির সিরায় পাকিয়ে তৈরি করা শুরু হয় ফিকে সন্দেশ ও গোপাল গোল্লা। পরবর্তী সময়ে ১৮৬৮ সালে নবীনচন্দ্র দাস এই রসগোল্লাকে স্পঞ্জি রূপ দেন। শীতের সুবাসিত নলেন গুড় ছানার সঙ্গে যুক্ত হয়ে একসময় বাংলা মিষ্টান্নকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। বাঙালির মিষ্টান্নপ্রেম শহরের বড় শোরুমে বা রাজকীয় ভোজেই শুধু সীমাবদ্ধ নয়, জড়িয়ে আছে বাংলার মাটি-পানি-হাওয়ায় এবং আমাদের শৈশবের অলিগলিতে। বাংলাদেশের মানচিত্রে চোখ বোলালে দেখা যাবে, প্রতিটি জেলার ভূগোল যেন একেকটি নিজস্ব মিষ্টির গল্প বুনেছে।
মিষ্টান্ন মঞ্জরি
ময়রার দোকানের বাইরেও বাঙালির মিষ্টির আরেক বিশাল জগৎ ছড়িয়ে ছিল ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাকে। কাঠের বাক্সে বা স্টিলের বড় টিনে টোকা মেরে ফেরিওয়ালার ডাক, শক্ত কটকটিতে কামড় দেওয়ার মজাই ছিল আলাদা। আরেকটু পেছালে গরমকালে বাঁশের চঙে বা পিতলের পাত্রে বরফ চাপা দিয়ে আসত কড়া দুধের সরের মালাই। আর ছিল মাঠ বা স্কুলের সামনে কাচ ঘেরা বাঁশের লাঠিতে প্যাঁচানো সেই গোলাপি হাওয়াই মিঠাই। জিব ছোঁয়ালেই মিলিয়ে যেত বায়বীয় চিনির মিষ্টি স্বাদ। সময় বদলেছে, সেই হাওয়াই মিঠাই আজ শপিং মলে ক্যান্ডি ফ্লস নামে নতুন রূপ নিয়েছে। বৈশাখী মেলা কিংবা পূজামণ্ডপ মানে ছিল রঙিন কদমা, সাদা ধবধবে বাতাসা, গুড়ের নকশাদার নাড়ু এবং খাস্তা তিলখাজা। বিকেলের হাটে বা বাসস্ট্যান্ডের মুখে বিরাট কড়াইতে টগবগ করে ফুটতে থাকা তেলে জিলাপির প্যাঁচ দেওয়া, তারপর টুপ করে গুড় বা চিনির সিরায় ফেলে গরমাগরম তুলে দেওয়া। আর শীতে নতুন খেজুর গুড়ে বাঁধা মচমচে মুড়ি বা খইয়ের মোয়া—এই ছিল দোকানের বাইরের গল্প।
পিঠাপুলি
শহরের মিষ্টান্ন ভান্ডার যতটা রসগোল্লা-সন্দেশে ভরপুর ছিল, গ্রামবাংলার মিষ্টির জগৎ ততটাই আবর্তিত হতো পিঠাকে ঘিরে। নতুন ধানের চাল, খেজুরের গুড়, নারকেল আর দুধে মজার সব পিঠা। হাতের কাছের উপকরণেই মা-চাচি-খালারা তৈরি করতেন ভাপা পিঠা, পাটিসাপটা, দুধপুলি, চন্দ্রপুলি, পাকান পিঠা কিংবা তেলের পিঠা। অঞ্চলভেদে রূপ ও স্বাদে ভিন্নতা থাকলেও এগুলোর মূল পরিচয় ছিল মিষ্টান্নরূপে। শীতের ভোর, নবান্ন, পৌষসংক্রান্তি কিংবা অতিথি আপ্যায়ন—সব আয়োজনেই পিঠা ছিল মিষ্টিমুখের প্রধান অনুষঙ্গ। গ্রামাঞ্চলে দোকানের মিষ্টি ছিল বিলাসিতা, তাই ঘরে তৈরি পিঠা ছিল আনন্দ ভাগাভাগি ও আতিথেয়তার সবচেয়ে পরিচিত ভাষা। বাঙালির মিষ্টিপ্রীতির শিকড় তাই গ্রামবাংলার ধোঁয়া ওঠা পিঠার পাত্রেও সমানভাবে প্রোথিত।
সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যে
বিয়ে, হলুদ, পূজা কিংবা ঈদ—শুভ আয়োজনের সঙ্গে মিষ্টির থালা অবিচ্ছেদ্য। নতুন সম্পর্কের শুরুতে মিষ্টি, সুসংবাদে মিষ্টি, অতিথি আপ্যায়নে মিষ্টি। আনন্দকে ভাগ করে নেওয়ার এই রীতিই মিষ্টিকে বাঙালির সামাজিক জীবনে বিশেষ জায়গা দিয়েছে। একসময় বিয়েবাড়ির মিষ্টির আয়োজনও ছিল আলাদা জাঁকজমকের বিষয়। পুরান ঢাকার ইতিহাসে দেখা যায়, বিয়ের মিষ্টির জন্য বাংলাবাজার ও ফরাশগঞ্জ ছিল বিশেষভাবে জনপ্রিয়। বিয়ে উপলক্ষে চন্দ্রপুরী ও বাদাম দিয়ে নানা ধরনের মিষ্টি তৈরি হতো। বড় কাঠের খঞ্জা বা ডালা, নকশির মটকি ও হাঁড়িতে করে মিষ্টি পাঠানো হতো। অনেক পরিবার আবার নিজেদের পছন্দমতো বিশেষ মিষ্টি তৈরির জন্য বাড়িতে ময়রা ডাকত। ঢাকাইয়াদের প্রিয় ছিল আমিত্তি। উনিশ শতকে সন্দেশের পাশাপাশি জিলাপি, পানতোয়া, লেডিকেনি, নানা ধরনের ছানার মিষ্টি এবং পরে রসগোল্লার মতো মিষ্টি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিয়ের সঙ্গে মিষ্টির এই সম্পর্ক যে কত পুরোনো, তার ইঙ্গিত সাহিত্যেও পাওয়া যায়। দ্বারকানাথ বিদ্যারত্নের কবিতা কুসুমাঞ্জলিতে বিয়েকে ঘিরে একটি পঙ্ক্তি আছে—
‘মিষ্টান্নমিতরে জনাঃ’; অর্থাৎ বর-কনের গুণ, রূপ, ধন বা বংশ নিয়ে নিজ নিজ প্রত্যাশা থাকলেও সাধারণ মানুষের আনন্দের জায়গা মিষ্টান্ন।
তবে বিয়ের মিষ্টি শুধু ঐতিহ্য নয়, ছিল সামাজিক মর্যাদারও প্রকাশ। কার বাড়িতে কত রকম মিষ্টি হলো, কোন মিষ্টি কোথা থেকে আনা হলো, কোন ময়রার হাতে তৈরি—এসবও হয়ে উঠত আলোচনার বিষয়। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির শৈশবের স্মৃতিও। পাড়ার মিষ্টির দোকানের কাচের শোকেসে সাজানো মিষ্টি, বাবার হাত ধরে দোকানে যাওয়া, গরম জিলাপি হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরা—এসব স্মৃতি খাদ্যাভ্যাসের অংশ হয়ে থাকে। নেমন্তন্নের শেষে বড় কাচের বাটিতে রসগোল্লা বা দই এলে পেট ভরা অতিথির চোখেও নতুন ক্ষুধা জেগে উঠত।
সাহিত্যেও মিষ্টি অনন্য। সৈয়দ মুজতবা আলীর রম্যরচনা রসগোল্লায় এক টিন রসগোল্লাকে ঘিরে তৈরি হওয়া মজার পরিস্থিতি বাঙালির মিষ্টিপ্রীতিকে তুলে ধরে। আবার সৈয়দ শামসুল হকের মিষ্টি মরণ কবিতাতেও মিষ্টির প্রতি এই সহজাত আসক্তির রসময় প্রকাশ ঘটে:
‘চমকায় চমচম! সন্দেশ শংকায়!
ওই বুঝি ওঠে রোল মরণের ডংকায়!
গণেশটা গপ্ করে চমচম গিলে খায়।
সন্দেশে সোলেমান কুচ্ করে দংশায়…’
সীমান্তে স্বাতন্ত্র্য
দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশেই মিষ্টির কদর রয়েছে। তবে স্থানীয় উপকরণ, কৃষি, জলবায়ু ও খাদ্যসংস্কৃতির প্রভাবে একেক দেশের মিষ্টিতে তৈরি হয়েছে একেক বৈশিষ্ট্য। ভারতে খোয়া ক্ষীর, ঘি, বেসন, ময়দা ও বাদামের ব্যবহার বেশি—লাড্ডু, প্যারা, বরফি বা কাজু কাটলিতে যার ছাপ স্পষ্ট। পাকিস্তানের মিষ্টিতে দুধ, ঘি, ময়দা ও চিনির প্রাধান্য; সোহান হালুয়া, গুলাব জামুন ও জিলাপি তার উদাহরণ। শ্রীলঙ্কার মিষ্টিতে নারকেল, কিথুল গুড় ও চালের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য; ফলে স্বাদে আসে দেশজ মাটির গন্ধ। নেপালের মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবারে চালের গুঁড়া, দুধ ও স্থানীয় শস্যের ব্যবহার দেখা যায়। সেলরুটি ও মিষ্টি ডামপ্লিং তার পরিচিত উদাহরণ।
বাংলাদেশের মিষ্টির স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়েছে মূলত দুধ, ছানা, খেজুরের গুড়, আখের চিনি, চালের গুঁড়া ও নারকেলের বহুমাত্রিক ব্যবহারে; বিশেষ করে অঞ্চলভেদে উপকরণ ও তৈরির পদ্ধতি বদলে যায়। বগুড়ার দই, পোড়াবাড়ীর চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, নাটোরের কাঁচাগোল্লা কিংবা মুক্তাগাছার মণ্ডা—প্রতিটির স্বাদ ও কারিগরি আলাদা। আবার গ্রামবাংলার পিঠা, পায়েস, তিলের নাড়ু, মোয়া ও নারকেলের মিষ্টান্নে ধরা পড়ে বাংলার কৃষিনির্ভর জীবন এবং ঋতুভিত্তিক খাদ্যসংস্কৃতি। অর্থাৎ বাংলাদেশের মিষ্টি শুধু দুধ-ছানার দোকানি মিষ্টিতে সীমাবদ্ধ নয়; পিঠা, গুড় ও স্থানীয় শস্যের ঐতিহ্যও এর স্বাতন্ত্র্যের বড় অংশ। বাংলাদেশি মিষ্টির নিজস্ব সুনাম দেশের সীমানাও পেরিয়েছে। এই আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যই বাংলাদেশের মিষ্টিকে শুধু খাদ্য নয়, ভৌগোলিক পরিচয়ের অংশে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের কয়েকটি মিষ্টান্ন ইতিমধ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতির আওতায় এসেছে; যেগুলোর মধ্যে বগুড়ার দই, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীর চমচম ও নাটোরের কাঁচাগোল্লা উল্লেখযোগ্য। এর অর্থ, মিষ্টির পরিচয় এখন শুধু প্রস্তুতকারকের নামের সঙ্গে নয়, তার উৎপত্তিস্থল ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত।
ফিউশন ও ফারাক
কালের পরিক্রমায় মিষ্টির বাজার ও পরিবেশনায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। একসময় যেখানে পাড়ার মিষ্টির দোকানই ছিল উৎসব ও আপ্যায়নের প্রধান ভরসা, সেখানে আজ যুক্ত হয়েছে আধুনিক ক্যাফে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শোরুম এবং অনলাইন ডেলিভারি সেবা। ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির পাশাপাশি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে নান্দনিক প্যাকেজিং, উপহার বাক্স এবং করপোরেট উপহারের সংস্কৃতি। ঢাকার প্রিমিয়াম সুইটস, মীনা সুইটস, বস সুইটস, মিষ্টিমুখ, বনফুল অ্যান্ড কোং, ভাই ভাই সুইটস, রস, খাজানা মিঠাই, মিঠাই, মুসলিম সুইটস, মরণচাঁদ মিষ্টান্ন ভান্ডার কিংবা মদিনা মিষ্টান্ন ভান্ডারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিকে আধুনিক উপস্থাপনায় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
মিষ্টি খাওয়ার উপলক্ষও বদলেছে। বিকেলের আড্ডা, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করা কিংবা ছুটির দিনের অবসরেও ডেজার্ট হয়ে উঠছে আলাদা আকর্ষণ। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে মজার দিক হলো দেশীয় মিষ্টির সঙ্গে পাশ্চাত্য ডেজার্টের মেলবন্ধন। সিক্রেট রেসিপি, কুপার’স, সুমি’স হটকেক, সুইস বেকারি, দ্য রেড চেম্বার এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত ডেজার্ট হাউসের জনপ্রিয়তা তার প্রমাণ। বাঙালির পরিচিত রসগোল্লা, রসমালাই, সন্দেশ, ক্ষীর, মিষ্টি দই কিংবা নলেন গুড় এখন নতুন রূপে হাজির হচ্ছে কেক, টার্ট, চিজ কেক, মুস ও পেস্ট্রির সঙ্গে। রসমালাই চিজ কেক, সন্দেশ টার্ট, মিষ্টি দই মুস, নলেন গুড়ের চিজ কেক, গুড়ের ব্রাউনি কিংবা রসগোল্লাভিত্তিক কেকের মতো ফিউশন মিষ্টান্নে একই সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে পরিচিত স্বাদ ও নতুন অভিজ্ঞতা। দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করেও তৈরি হচ্ছে আধুনিক ডেজার্ট। নারকেল, খেজুরের গুড়, পাটালি, ক্ষীর, পেস্তা, এলাচি কিংবা গোলাপজলের মতো উপাদান ঢুকে পড়ছে পাশ্চাত্য ধাঁচের মিষ্টান্নে।
এর সঙ্গে বদলেছে পরিবেশন ও উপস্থাপনার ধরনও। মিষ্টি এখন শুধু স্বাদের বিষয় নয়, দেখারও বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি ও ভিডিও এই প্রবণতাকে আরও জনপ্রিয় করেছে। ফলে মিষ্টির দোকান আর শুধু মিষ্টি কেনার জায়গা নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠেছে বসে খাওয়া, ছবি তোলা, আড্ডা দেওয়া এবং নতুন স্বাদ আবিষ্কারের স্থান। ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তাই হারিয়ে যাওয়ার বদলে বদলে যাচ্ছে তার পরিবেশন ও ব্যবহারের ধরন। কখনো হাই টির প্ল্যাটারে, কখনো উৎসবের ডেজার্ট টেবিলে, আবার কখনো আধুনিক ফিউশন মিষ্টান্নের রূপে।
তবে বদল এসেছে স্বাদে ও চিনির পরিমাণে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ বিপণন মৌসুমে প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে। ২৭ লাখ ৬৭ হাজার টন থেকে নেমেছে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টনে। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যেও জনপ্রতি সরাসরি চিনি গ্রহণ প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছিল। বাংলাদেশের মিষ্টির বাজারে কম চিনি, নো অ্যাডেড সুগার এবং বিকল্প মিষ্টিকারক ব্যবহার করে তৈরি পণ্যের সংখ্যা বাড়ছে। স্টেভিয়া, সুক্রালোজ, জিরোক্যাল ও অন্যান্য বিকল্প মিষ্টিকারকের পাশাপাশি জিরো ক্যাল ও চিনি গো-এর মতো পণ্যের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি ইগলু বাজারে এনেছে জিরো সুগার ভ্যানিলা আইসক্রিম। স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তা, ডায়াবেটিস রোগী এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে আগ্রহীদের মধ্যে এসব পণ্যের চাহিদা বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের মিষ্টান্ন বাজারে শুধু স্বাদ নয়, পুষ্টিগুণ, ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ এবং উপাদানের স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে রসগোল্লা, সন্দেশ বা আইসক্রিম—সব ক্ষেত্রে কম চিনি, বিকল্প মিষ্টিকারক এবং স্বাস্থ্যসচেতন সংস্করণের উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে।
সময়ের প্রয়োজনে কিংবা স্বাস্থ্যসচেতনতার খাতিরে হয়তো ডেজার্টের রূপ, গঠন বা চিনির পরিমাণে বদল এসেছে। আজ রসগোল্লার জায়গায় হয়তো পাতের শেষে শোভা পাচ্ছে নলেন গুড়ের মুস কিংবা সিরাভেজা জিলাপির বদলে স্থান নিচ্ছে কম চিনির ফিউশন ডেজার্ট। কিন্তু সময়ের এই রূপান্তরের মধ্যেও যে বিষয়টি একদম অপরিবর্তিত থেকে গেছে, তা হলো বাঙালির ভূরিভোজে মিষ্টির সেই রাজকীয় ও সুনির্দিষ্ট অবস্থান। বিশ্বের অনেক খাদ্যসংস্কৃতিতেই ডেজার্টকে শুধু একটি ঐচ্ছিক বা বাড়তি পদ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বাঙালি রসনায় শেষ পাত মানেই মিষ্টির একচ্ছত্র আধিপত্য; যা না থাকলে যেকোনো আয়োজন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মডেল: আলিজাহ ইসলাম, সানজিদা ঊর্মি ও সানায়া সারিয়া শাহনাজ
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: ঋতু কুমার বাংলাদেশ
জুয়েলারি: রঙবতী
ছবি: জিয়া উদ্দীন
