skip to Main Content

ফাইন ডাইন I স্বাদের সুর: সিয়ার

সামনে কাচের জানালায় শহরের আলো, টেবিলে ভূমধ্যসাগর থেকে পলিনেশিয়ান সুবাস। রেনেসাঁ ঢাকা গুলশান হোটেলের ১৮ তলায় অবস্থিত সিয়ার ঠিক এমনই এক অভিজ্ঞতার ঠিকানা। যেখানে খাবার শুধু খাওয়া হয় না, উপভোগ করা হয় পঞ্চেন্দ্রিয়ের মিশেলে

সিয়ারের মূল আকর্ষণ এর ফিউশনধর্মী আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রন্ধনকৌশল, উপকরণ ও স্বাদের মিশেলে নতুন খাবার তৈরির চেষ্টা এর মেনুতে। এই ফিউশন শুধু একাধিক দেশি খাবারকে পাশাপাশি রাখার গল্প নয়, বরং পরিচিত উপকরণকে তার চেনা ব্যবহার থেকে সরিয়ে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপনের চেষ্টা।
স্বাদের বহর
সিয়ারের রান্নার দর্শনের সঙ্গে যুক্ত সিনিয়র সু-শেফ তৌহিদুল ইসলাম। স্থানীয় উপকরণকে প্রচলিত ব্যবহারের বাইরে নিয়ে এসে আন্তর্জাতিক রান্নার কৌশলের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। প্রায় ৬ মাস ধরে কিউরেট করেছেন মেনু। প্রতিটি খাবারের স্বাদ ও গুণগত মান বারবার পরীক্ষা করেছেন। শুধু স্বাদ নয়; গন্ধ, বুনট, তাপমাত্রা ও উপস্থাপন—সবকিছু গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সু-শেফ বলেন, ‘আমরা অরগানিক রিসোর্স ব্যবহার করছি উপকরণ হিসেবে। সরাসরি অরগানিক ফার্ম থেকে আমাদের কাঁচামাল আসে।’
ভূমধ্যসাগরীয় স্বাদের পাশাপাশি সমুদ্রতীরবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাদের সমারোহ রয়েছে সিয়ারে; বিশেষ করে ক্যানভাসের জন্য কিউরেট করা ফোর-কোর্সের মেনু এর চমৎকার নিদর্শন। সতেজ তরমুজের কিউবের সঙ্গে চিজ ও রিফ্রেশিং উপাদানের নান্দনিক পিরামিড উপস্থাপন, যা স্বাদের সূচনা করে দারুণভাবে। দ্বিতীয় ধাপে মিষ্টিকুমড়ার মসৃণ গরম-গরম স্যুপ, সঙ্গে মুচমুচে টোস্টেড ব্রেড আর সিড পরিবেশন করা হয়। যেখানে ক্রাঞ্চি ও ক্রিমি বুনটের দারুণ সামঞ্জস্য মুগ্ধ করে। মেইন কোর্সে আন্তর্জাতিক গ্রিল মেথডে প্রস্তুত করা জুসি বিফ রিবস। সঙ্গে স্পেশাল সস ও ফ্রেশ গ্রিন সালাদ। মূলত বিফ-লাভারদের জন্য সিয়ারের বিশেষ সিগনেচার পদ এটি। স্বাদের যাত্রার শেষটি হয়েছিল ক্যারামেলাইজড নিউইয়র্ক চিজকেকের সঙ্গে টক-মিষ্টি রাসবেরি মুস এবং বিশেষ ক্রাম্বল ও সোরবের মেলবন্ধনে।
প্লেটের বাইরে
সিয়ারের গল্প শুধু খাবারে সীমাবদ্ধ নয়, রেস্তোরাঁটির অবস্থানও এর অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৮ তলা থেকে ঢাকা শহর দেখা যায় অন্য দৃষ্টিতে; বিশেষ করে সন্ধ্যার পর চারপাশের আলো যখন ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে, তখন খাবার টেবিলের সঙ্গে যুক্ত হয় শহরটি দেখার আনন্দ। অন্দরসজ্জাতেও রয়েছে আধুনিক ও পরিশীলিত আবহ। কাঠ, মার্বেল, কাচ ও নরম আলোর সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক পরিবেশ, যেখানে খাবারে মনোযোগ রাখা এবং দীর্ঘ সময় বসে গল্প করারও সুযোগ থাকে। স্বয়ংক্রিয় পিয়ানোর সুর এই পরিবেশে যোগ করে নান্দনিক মাত্রা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সিয়ারের অভিজ্ঞতায় সংগীতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লাইভ জ্যাজ পরিবেশনের মাধ্যমে খাবারের সঙ্গে সংগীতকে যুক্ত করার উদ্যোগ রেস্তোরাঁটির অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ভালো খাবার, ভালো সঙ্গ আর ভালো সংগীত—এই তিনের সমন্বয়ে একটি সন্ধ্যাকে পূর্ণ করে তোলাই যেন উদ্দেশ্য।
রেস্তোরাঁটির জেনারেল ম্যানেজার মো. আল আমিন জানান, সিয়ার কোনো নির্দিষ্ট অতিথিদের জন্য নয়, সব বয়সীরা উপভোগ করতে পারবেন। খাবার শেষে আতিথেয়তার তৃপ্তি নিয়ে ফিরবেন অতিথিরা—এটা সিয়ারের প্রত্যয়।
স্বাদের সঙ্গে সুর
সিয়ারের বিশেষত্ব কোনো একটি পদে আটকে নেই। এর আসল আকর্ষণ হলো একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরির চেষ্টা। খাবারের স্বাদ, পদের উপস্থাপন, অন্দরসজ্জা, সংগীত এবং শহরের দৃশ্য—সবকিছু মিলিয়ে এখানে তৈরি হয় বিশেষ আবহ। এখানে রাত শুরু হতে পারে শহরের আলো দেখতে দেখতে, তারপর টেবিলে আসতে পারে এমন কোনো পদ, যেখানে সরিষার তেলের পরিচিত গন্ধের সঙ্গে মিশে যায় সম্পূর্ণ নতুন স্বাদ। পরিচিত চিংড়ি হয়ে উঠতে পারে নতুন অভিজ্ঞতা, আর বহু পুরোনো ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক ফিরে আসতে পারে নতুন সাজে। ফাইন ডাইনিংয়ের সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই—খাবার শুধু ক্ষুধা মেটাবে, এমন নয়; কৌতূহলও তৈরি করবে। প্রতিটি পদ যেন পরের কামড়ের জন্য অপেক্ষা তৈরি করে। সিয়ার সেই কৌতূহল সামনে নিয়ে আসে। শহরের ব্যস্ততার মাঝখানে তাই সিয়ার হয়ে উঠতে পারে একটু ধীর হওয়ার জায়গা। জানালার ওপারে ঢাকার আলো, সামনে সাজানো খাবার, চারপাশে সংগীত আর সঙ্গে প্রিয় মানুষ—সব মিলিয়ে একটি সাধারণ নৈশভোজও এখানে হয়ে উঠতে পারে স্মরণীয় কোনো সন্ধ্যা।
সিয়ারের টেবিলে শেষ পর্যন্ত শুধু খাবার থাকে না; থাকে স্বাদের সঙ্গে খেলার আনন্দ, পরিচিত উপকরণকে নতুনভাবে আবিষ্কারের বিস্ময় এবং শহরকে একটু অন্যভাবে দেখার সুযোগ। আর এই সমন্বয়ই সিয়ারকে শুধু একটি রেস্তোরাঁ নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ তৃপ্তির ঠিকানা করে তোলে।

 ফুড ডেস্ক
ছবি: ক্যানভাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top