ফিচার I ফিউচার ইজ এডিবল
কিনতে গেছেন বিউটি প্রোডাক্ট, হাঁটছেন আইলে। কী কিনবেন ভাবছেন। একের পর এক প্রসাধন দেখতে দেখতে মনে হতেই পারে, পৌঁছে গেছেন কোনো সুপারশপের ফ্রুট কিংবা ভেজিটেবলের সেকশনে। এক পাশে মাচা টি দিয়ে তৈরি ফেসওয়াশ, অন্য পাশে পাকা পেঁপের এনজাইম পিল, আবার ড্রপারের ভেতর টলটল করছে তরমুজের নির্যাস
মজার বিষয় হলো, ইতিহাস কিন্তু এই জায়গায় এসে বেশ অদ্ভুত এক চক্কর খেয়েছে। রোমান সাম্রাজ্যের নারীরা গাল রাঙাতে লাল ওয়াইন এবং মুখে ডুমুর মেখে বসে থাকতেন। মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা প্রতিদিন প্রায় ৭০০ গাধার খাঁটি দুধে স্নান করতেন শুধু ত্বকের মসৃণতার জন্য। আজকের গ্লোবাল স্কিন কেয়ার ইন্ডাস্ট্রি ঠিক সেই ট্র্যাডিশনকে আধুনিকভাবে বাজারজাত করছে।
কিন্তু মানুষের হঠাৎ রান্নাঘরের খাবার মুখে মাখার এত শখ জাগল কেন? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছু কারণ সামনে আসে। প্রথমটি হলো মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা। ঠিক যেমন ওটস আর মধু পেটে গেলে শরীর সুস্থ থাকে, আবার সেই মধু মুখে মাখলে ত্বক থাকবে যত্নে, মানুষের মস্তিষ্ক এসব সমীকরণ চট করে মিলিয়ে নেয়। একে বিউটি মার্কেটিংয়ের ভাষায় বলে ক্লিন বিউটি। ল্যাবের সিনথেটিক যৌগের চেয়ে তরতাজা কমলা বা জাপানের ঐতিহ্যবাহী চালধোয়া পানির উপকারিতা মানুষকে মানসিক শান্তি দেয়। অর্গানিক প্রোডাক্টসের প্রতি নির্ভরযোগ্য করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, এর পেছনে আছে পিওর সেন্সরি ট্র্যাপ বা পঞ্চেন্দ্রিয়ের ফাঁদ। বিউটি ব্র্যান্ডগুলো বুঝে গেছে, মানুষ চোখে দেখে আর গন্ধেও প্রোডাক্টের প্রেমে পড়ে। একটু ভাবলেই তার প্রমাণ মেলে। ভ্যানিলা আর ডার্ক চকলেটের ঘ্রাণযুক্ত বডি বাটার গায়ে মাখলে মস্তিষ্কের ভেতর ঠিক ডেজার্ট খাওয়ার মতো ডোপামিন নিঃসরণ হতে পারে। পেটে ক্যালরি জমার ভয় নেই, অথচ স্বাদটা যেন ইন্দ্রিয়জুড়ে ছড়িয়ে যায়।
সোশ্যাল মিডিয়াও এই ট্রেন্ডকে খুব দ্রুত লুফে নিয়েছে। যেমন গ্লেজড ডোনাট স্কিন ট্রেন্ড। এখানে মুখমণ্ডলের জেল্লা দেখে মনে হয়, ওভেন থেকে সদ্য নামানো ক্রিসপি ক্রিম ডোনাটের ওপর তরল চিনির চকচকে প্রলেপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লিপ গ্লস, কফি বডি স্ক্রাব কিংবা ড্রাগন ফ্রুটের টোনার। ক্যামেরার লেন্সের সামনে এই রসাল টেক্সচারগুলো এতটাই আকর্ষণীয় দেখায় যে তরুণ প্রজন্ম নিমেষে এসব পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
তবে এই পুরো ট্রেন্ডকে শুধু বিজ্ঞাপনী ফাঁদ বা মার্কেটিং ভাবলে ভুল হবে। কারণ, খাবারের মোড়কে মোড়া এই রূপচর্চার পেছনে কাজ করছে গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিক যুক্তি।
ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি কিংবা নানা জাতের সাইট্রাস ফলে থাকা প্রাকৃতিক ভিটামিন সি ত্বকের জন্য শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ঢাল তৈরি করে; যা বাইরের দূষণ রুখে বার্ধক্য ঠেকায়। আবার মাচা গ্রিন টি-তে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যাটেচিন আর কাঁচা হলুদের চিরচেনা কারকিউমিন সংবেদনশীল ত্বকের লালচে ভাব দূর করতে এবং যেকোনো ধরনের জ্বালাপোড়া কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। অন্যদিকে কম্বুচা কিংবা গাঁজানো চাল ধোয়া পানির মতো ফারমেন্টেড উপাদান ত্বকের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য রক্ষা করে, যা বাইরের ধুলাবালুর হাত থেকে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষার স্তর মজবুত রাখে। সুতরাং বলা যায়, রূপচর্চায় খাবারের ছোঁয়া শুধু চোখের আরাম নয়, ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্যও কার্যকর।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে। পেটের ভেতরের পরিবেশ ঠিক না থাকলে হাজার টাকার ক্রিম মেখেও ত্বকে স্থায়ী জেল্লা আনা সম্ভব নয়, এমন ধারণা অনেকের। সমাধান হিসেবে জন্ম নিয়েছে নিউট্রিকসমেটিকস। এখানে স্কিন কেয়ার শুধু বাহ্যিক ব্যবহারের বস্তু নয়, বরং খাওয়ার জিনিস। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে বাজারে এসেছে হায়ালুরনিক অ্যাসিড মেশানো ড্রিংকস, অ্যান্টি-এজিংয়ের জন্য চকলেট বা স্ট্রবেরি ফ্লেভারের কোলাজেন জেলি স্টিকস, এমনকি ভেতর থেকে ক্ষতিকর সূর্যরশ্মি প্রতিরোধের উপযোগী গামি। বলা যায়, খাবারের পুষ্টি আর রূপচর্চা—দুটি এখন মিলেমিশে একাকার।
ড্রেসিং টেবিল আর ডাইনিং টেবিলের এই সীমারেখা মুছে যাওয়া আসলে আমাদের প্রকৃতির সারল্যে ফেরার গল্প। যেখানে কৃত্রিম চাকচিক্য নয়, সহজ ও পরিচিত উপাদানই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় ভরসা। তাই রূপচর্চার ভবিষ্যৎ এখন কোনো রসায়ন নয়; বরং প্রাকৃতিক, জীবন্ত ও পুষ্টিকর।
আবু সালেহ শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ছবি: সংগ্রহ
