নখদর্পণ I লালের লুকোচুরি
বহু আগে থেকে পরিচয়। একদমই নতুন নয়। তবু প্রবল আকর্ষণ। এখনো প্রাসঙ্গিক। আভিজাত্য, লাস্য—সব আছে সেখানে
টুকটুকে লাল নখের মাহাত্ম্য প্রথমে ধরা পড়েছিল চীনাদের কাছে। খ্রিস্টপূর্ব ৩ হাজার অব্দে। সে সময় আজকের দিনের মতো নেইলপলিশ ছিল না। উদ্ভিজ্জ রঙের সঙ্গে গাম অ্যারাবিক, জিলাটিন, বিওয়াক্স এবং ডিমের সাদা অংশ মিশিয়ে নখ সাজানোর লাল রং তৈরি করতেন তারা। ব্যবহার বরাদ্দ ছিল শুধু রাজপরিবারের সদস্যদের জন্য। নারী-পুরুষ উভয়ই। যত উচ্চবংশীয়, নখের রং হতো ততই লাল। প্রকাশ পেত আভিজাত্য আর সামাজিক ক্ষমতা। আর সাধারণের নখে দেখা যেত হালকা রঙের ব্যবহার। প্রাচীন মিসরের রানি ক্লিওপেট্রাও আছে লাল নখের গল্পে। নখে নিয়মিত মেহেদিপাতা ব্যবহার করতেন তিনি। গাঢ় লাল হয়ে যেত তার নখ। তাকে নিয়ে নানা গবেষণায় এ-ও দাবি করা হয়, লাল ছিল তার সবচেয়ে পছন্দের রং। দেখতেন শক্তি আর সামর্থ্যের প্রতীক হিসেবে।
লালে লাস্য
২০ শতকের আগপর্যন্ত প্রাকৃতিক রঞ্জক আর মেহেদি রঙেই সাজানো হতো নখ; যাতে লালের ব্যবহারই ছিল বেশি। ১৯২০-এর দশকে গাড়ির জন্য তৈরি চকচকে ও টেকসই রঙের প্রযুক্তি থেকে অনুপ্ররণা নিয়ে টেকসই নেইল পেইন্ট আবিষ্কার করেন ফ্রেঞ্চ মেকআপ আর্টিস্ট মিশেল মেনার্ড। ধীরে ধীরে নিখুঁত করে তোলেন পণ্যটির ফর্মুলা। ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বিউটি ব্র্যান্ড রেভলন। তত দিনে অনেকটাই সাধারণের হাতের নাগালে এসে যায় নেইলপলিশ। এর আগেই আধুনিক লিকুইড নেইলপলিশ বাজারে আনে কিউটেক্স নামের একটি কোম্পানি। সে সময় লাল আর লালের নানা শেড পাওয়া যেত। হলিউডের গ্ল্যামারেও দেখা যেত অভিনেত্রীদের চকচকে লাল নখ। গাঢ় লাল নেইলপলিশ ব্যবহার করতেন ক্লারা বো এবং জিন হারলোর মতো তারকারা।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও মেলে লাল নখের সন্ধান। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরে, নেইলপলিশ আবিষ্কারের অনেক আগে থেকে টুকটুকে লাল আলতা ব্যবহার করতেন তারা। আজও বাঙালি সংস্কৃতির অংশ এই সৌন্দর্যপণ্য।
তবে সাধারণ সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে খুব বেশি দিন থাকতে হয়নি নখের লালকে। ১৯৪০-এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নারীর ক্ষমতায়ন ও একাত্মতার প্রতীক হয়ে ওঠে লাল রং। লাল লিপস্টিক ব্যবহার শুরু করেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীরা, সঙ্গে লাল নেইলপলিশও; যা হয়ে ওঠে নারীর নিজস্ব সত্তা ও দৃঢ়তা প্রকাশের একটি সূক্ষ্ম অথচ শক্তিশালী মাধ্যম। সে সময় মেরিলিন মনরো এবং রিটা হেওর্থের মতো বিখ্যাত হলিউড তারকাদের নখের লাল রং হয়ে উঠেছিল আভিজাত্য ও আকর্ষণের অন্যতম প্রতীক। সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে লাল নখের ধারা। হয়েছে লালেরই নানা শেডের ব্যবহার। কখনো ব্লাড রেড, কখনোবা চেরি রেড। ক্রিমসন, স্কারলেট, মেরুন, বারগ্যান্ডি, কোরাল, রুবি—আরও কত কী!
লালে লালিত্য
লাল নখ নিয়ে নানা মতবাদের খোঁজ মেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। ২০২৩ সালে টিকটকে ভাইরাল এক রেড নেইল থিওরি অনুযায়ী, সম্ভাব্য প্রেমিককে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করতে পারে নারীদের নখের লাল রং। বিশেষজ্ঞ রিলেশনশিপ থেরাপিস্টদের অনেকে এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। তবে অকাট্য প্রমাণ চাইলে রয়েছে পাবমেড জার্নালে ২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা। যেখানে লালের সঙ্গে আকর্ষণের সংযোগ নিয়ে মেটা-অ্যানালাইসিস করেছেন তিনজন মার্কিন গবেষক। এতে ৬ হাজার ৬৮২ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরুষেরা যখন নারীদের আকর্ষণীয়তা মূল্যায়ন করেন, তখন লাল রঙের উপস্থিতির সঙ্গে আকর্ষণীয়তার একটি ছোট অথচ পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ পাওয়া যায়। এর ১০ বছর আগে একই জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, কোনো নারীর ছবিতে লাল রং থাকলে পুরুষেরা নারীদের বেশি আকর্ষণীয় মনে করেন। সাধারণ প্রেম ও যৌনতার সঙ্গেও সম্পর্কিত করা হয় লালকে। সেটা নারীদের ঠোঁটে বা নখে থাকলে যেন আরও বেশি।
প্রযুক্তির যুগে এসেও আগের মতো আছে লাল নখের আবেদন। অটুট এবং আকর্ষণীয়। নেইলপলিশের সঙ্গে জুড়েছে অ্যাক্রিলিক নেইল পেইন্ট, জেল এক্সটেনশন, ফল্স নেইল, পাউডার, রেজিনের মতো নানা আধুনিক সরঞ্জাম। মোমভিত্তিক আর গাড়ির রঙের ব্যবহার অনেক পেছনে চলে গেছে, কিন্তু আজও রয়ে গেছে মেহেদি রাঙানো নখ, যুক্ত হয়েছে নেইলপলিশ, প্রেস অন, নেইল আর্ট। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে আজও কনের লাল টুকটুকে হাত নির্দেশ করে শুভ সূচনার। লাল তাই শুধু রং নয়; আবেগও বটে।
আবৃতি আহমেদ
ছবি: সংগ্রহ
