skip to Main Content

কুন্তলকাহন I বল্ড বব: ফিল্টার থেকে বাস্তব!

চুল নাকি বেশ জ্বালাচ্ছে জেনারেশন জেডদের। সেই শোনা কথায় কান দিয়ে কারণ-বারণ-সমাধান আবৃতি আহমেদের লেখায়। সঙ্গে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

যে বয়সে সাধারণত চুল কমতে শুরু করে বলে ধারণা তৈরি হয়েছিল এত দিন, তার আগেই নাকি পাতলা হয়ে যাচ্ছে জেনারেশন জেডদের মাথার চুল—এমন আলোচনা এখন দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভারতীয় গবেষকদের একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণার সূত্র ধরে। এ বছরের আগস্টে এস এস জার্নাল অব ইন্টারকানেক্টেড এডুকেশন অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সে প্রকাশিত গবেষণায় জেন-জি এবং জেন-আলফাদের মধ্যে অল্প বয়সে চুল পড়ার বিভিন্ন কারণ ও ধরন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বংশগতি, হরমোনজনিত পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক চাপ এবং জীবনযাত্রার ধরন—এসবের সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। তবে তরুণদের ঠিক কোন বয়স থেকে চুল পড়ার সমস্যা শুরু হয়, এমন কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা গবেষণায় উল্লেখ নেই। একেকজনের ক্ষেত্রে একেক বয়সে শুরু হতে পারে সমস্যা। কারও ২০, কারও আবার ২৫-এর পর। পেছনে সরে যাচ্ছে হেয়ারলাইন, বড় দেখাচ্ছে কপাল—এমনটাও শোনা যাচ্ছে।
বয়সের সঙ্গে চুল কমে যাওয়ার আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে, নাকি পুরোটাই শারীরবৃত্তীয়? এই প্রশ্নের উত্তরে স্কিন ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী এবং কন্টিনেন্টাল হাসপাতালের ত্বক বিশেষজ্ঞ ডা. নূর-উস-সামা লোবা বলেন, বয়সের সঙ্গে চুল কমে যাওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। চুলের স্বাস্থ্য কেমন হবে, তা অনেকটাই জিনগত। নির্দিষ্টসংখ্যক হেয়ার ফলিকল নিয়ে জন্মায় মানুষ এবং বয়সের সঙ্গে ফলিকলগুলো নষ্ট হতে শুরু হওয়ায় চুলও কমতে থাকে। তবে অকালে চুল পড়ে যাওয়ার পেছনে জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশের মতো কিছু বাহ্যিক ও শারীরবৃত্তীয় কারণও আছে। তিনি আরও বলেন, অল্প বয়সে চুল কমে যাওয়ার পেছনে এক বা একাধিক কারণ থাকতে পারে। তবে এর লক্ষণ অনেক সময় ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। শুরুতে প্রায় প্রতিদিনই অল্প অল্প করে চুল ঝরে পড়াসহ সময়ের সঙ্গে তা বাড়তে পারে। কানের দুপাশে বা মাথার তালুতে চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, স্ক্যাল্প দৃশ্যমান হয়ে ওঠা, চুলের সামগ্রিক ঘনত্ব কমে যাওয়া—এসবও হতে পারে সতর্কসংকেত। পাশাপাশি চুল পাতলা, দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে। তাই চুল পড়ার ধরন এবং এসব পরিবর্তনের দিকে শুরু থেকে সচেতন নজর রাখা জরুরি।
কারণ খুঁজে বারণ
জেনারেশন জেডদের চুল নিয়ে অভিযোগ আমলে নিতে হবে গুরুত্বসহকারে। ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে চুল পড়ার কারণ। শরীরে বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি ছাড়াও পরিবেশগত দূষণ, জীবনযাত্রা এবং কিছু শারীরিক সমস্যায়ও চুলের স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রতিকারের আগে চুল পড়ার সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। সে অনুযায়ীই নির্ধারণ করতে হবে করণীয়।
হরমোনের প্রভাব
আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব ডারমাটোলজিতে হেয়ার লস নিয়ে প্রকাশিত এক জার্নালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিহাইড্রোটেস্টোস্টেরন বা ডিএইচটি অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের একটি রূপ, যা টেস্টোস্টেরন থেকে তৈরি হয়। বংশগতভাবে সংবেদনশীল কিছু হেয়ার ফলিকল ডিএইচটির প্রভাবে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাওয়াসহ চুলের বৃদ্ধি কমে আসে এবং নতুন চুল আগের তুলনায় পাতলা ও ছোট হতে পারে। এ ধরনের চুল পড়াকে সাধারণত অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে শুধু স্ক্রিন টাইম কমানো বা ঘুমের সময় বাড়ানোকে ডিএইচটি নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। থাইরয়েডের সমস্যা বা পিসিওএসের মতো হরমোনজনিত অবস্থার সঙ্গেও চুল পড়ার সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই এ ধরনের উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা জরুরি।
পুষ্টির ঘাটতি
চুলের প্রধান উপাদান কেরাটিন, যা একধরনের প্রোটিন। তাই খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি না থাকলে চুলের বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘদিনের অপুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এবং আয়রন, জিংকসহ কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির সঙ্গে চুল পড়ার সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত পুষ্টিগুণহীন ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিংক এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন নিশ্চিত করা চুলের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টির ঘাটতি আছে কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শে যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই ভালো।
মানসিক চাপ
চুল পড়ার পেছনে মানসিক চাপও একটি সম্ভাব্য কারণ। পড়াশোনা, চাকরি এবং পারিবারিক জীবনের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া তরুণদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব চুলের স্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের পর অতিরিক্ত চুল ঝরার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তাই চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। নিয়মিত শ্বাসের ব্যায়াম, ইয়োগা, মেডিটেশন বা নিজের জন্য উপযোগী অন্য কোনো স্ট্রেস-ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে চুল পড়ার কারণ নির্দিষ্ট হলে সে অনুযায়ী চিকিৎসাও প্রয়োজন।
জীবনযাপন
অনিয়মিত ঘুম, অপর্যাপ্ত পুষ্টি, ডিহাইড্রেশন এবং দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি চুলের স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে না খেয়ে থাকা বা দ্রুত ওজন কমানোর মতো কঠোর খাদ্যাভ্যাসের কারণে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হলে অতিরিক্ত চুল ঝরার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তাই ওজন কমানোর প্রয়োজন থাকলে পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করে সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ জরুরি। পাশাপাশি পরিমিত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত পানি পান স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অতিরিক্ত স্টাইলিং
অতিরিক্ত তাপ ও রাসায়নিক পণ্যের ব্যবহার চুলের শ্যাফট দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ঘন ঘন চুল রং করা, অতিরিক্ত হিট-স্টাইলিং কিংবা দীর্ঘ সময় শক্ত করে চুল বেঁধে রাখার অভ্যাসও চুল ভেঙে যাওয়া বা কিছু ক্ষেত্রে চুল পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত টান পড়ে এমন হেয়ারস্টাইলের কারণে ট্র্যাকশন অ্যালোপেশিয়া হতে পারে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত হিট ও রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট এড়িয়ে চলা এবং চুলের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত পণ্য ও যত্নের পদ্ধতি বেছে নেওয়া ভালো।
চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কারণ যাচাই করে, সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে অনেকটাই কমে যেতে পারে চুল পড়ার সমস্যা।
ডা. নূর-উস-সামা লোবা বলেন, ‘না খেয়ে দ্রুততম সময়ে ওজন কমিয়ে ফেলার প্রবণতা দেখা যায় টিনএজ বা তরুণদের মধ্যে। ওজন কমে, কিন্তু শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব দেখা দেয়। এর সরাসরি প্রভাব দেখা দেয় চুলে। অনেকে আবার মাথায় জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে প্রতিদিন শ্যাম্পু করছেন। এতেও চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে চুল পড়া বেড়ে যায় এবং নতুন চুল গজানোর গতি ধীর হয়। জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস ও শ্যাম্পু রুটিনে পরিবর্তন করেও যদি চুল পড়া না কমে, তাহলে নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি কিছু অ্যাসথেটিক ট্রিটমেন্টও রয়েছে। স্ক্যাল্প ও হেয়ার ফলিকলের স্বাস্থ্যে সহায়তার জন্য কিছু ক্ষেত্রে এলইডি বা রেড-লাইট থেরাপি ব্যবহার করা হয়। চুল পড়ার নির্দিষ্ট কিছু ধরনে লো-লেভেল লেজার থেরাপিও সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এ ছাড়া চুল পড়ার কারণ ও ধরন অনুযায়ী আরও বিভিন্ন ট্রিটমেন্টের সুযোগ রয়েছে—জানান এই চিকিৎসক। ডা. নূর-উস-সামা লোবা বলেন, যেকোনো চিকিৎসা নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পদ্ধতি বেছে নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পরিবর্তন আনাও গুরুত্বপূর্ণ।

মডেল: লিয়ানা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top