ফিচার I শোক সান্নিধ্যে
অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি। যাকে কেউ নিমন্ত্রণ জানায় না, তবু আসে। তৈরি হয় সামাজিকতার উপলক্ষ। যেখানে অলিখিত নিয়ম মানে উপস্থিত সামাজিক মানুষেরা। যদিও তারতম্য ঘটে দুনিয়াজুড়ে। বিস্তারিত আবু সালেহ শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর লেখায়
মডেস্টি, কনজারভেটিভ সিলুয়েটে ডার্ক অথবা মিউটেড কালার—এটাই ফিউনারেল অ্যাটায়ারের বেসিক হিসেবে চর্চিত। একেক দেশে একেক নিয়ম। চিরায়ত না হলেও বলা চলে শিকড় থেকে আগত। এখানে ট্রেন্ড নেই, নেই কোনো অতিরঞ্জনের আলাপন। তবু সামাজিক নিয়ম।
অঞ্চল, সংস্কৃতি ও ধর্মভেদে ভিন্ন হয় শোক পালনের পোশাক। কোথাও শোকের প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কালো, কোথাও আবার সাদা প্রকাশ করে পবিত্রতা ও শান্তি। মৃত্যু সর্বজনীন হলেও তাকে ঘিরে পোশাকের ভাষা ভিন্ন। সেই আড়ালে আছে ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির গল্প। শোকের ভাষা এক হলেও স্মৃতি, সংস্কৃতি, ধর্ম ও নান্দনিকতার মিশ্রণে ভিন্ন হয় সকল আচার। বাদ যায় না শোকাহত মানুষের পোশাক। একেক দেশের একেক রকমের এই চর্চার কয়েকটি থাকছে এখানে।
পশ্চিম
পশ্চিমা বিশ্বে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কথা ভাবলে প্রথমেই মনে আসে কালো রং। পোশাক হওয়া চাই সংযত ও দাপ্তরিক। পুরুষের কালো স্যুট, নারীর কালো পোশাক। কিন্তু কালোর এই আধিপত্য সব সময় ছিল; এমন সাক্ষ্য দেয় না ইতিহাস। পশ্চিমা সমাজে আজকের মতো একক ও সর্বজনীন ফিউনারেল ড্রেস কোড আদিকাল থেকে প্রচলিত ছিল না। প্রাচীন রোমে শোক প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো টোগা পালা। প্রাকৃতিক কালো উল দিয়ে তৈরি করা হতো এই ড্রেপিং প্যাটার্নের পোশাক।
আধুনিক পশ্চিমা সমাজে কালোকে শোকের প্রধান রং হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে আরও বহু শতাব্দী লেগেছে। বিশেষ করে ১৮ ও ১৯ শতকে ইউরোপে শোক দিবসের পোশাক ক্রমেই নিয়মবদ্ধ হয়ে ওঠে। ভিক্টোরিয়ান যুগে এসে এই প্রথা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। রানি ভিক্টোরিয়া ১৮৬১ সালে স্বামী প্রিন্স অ্যালবার্টের মৃত্যুর পর দীর্ঘ ৪০ বছর কালো পোশাক পরিধান করেন। তার দীর্ঘস্থায়ী শোক ও পোশাকের প্রভাব কালোকে পশ্চিমা সমাজে শোকের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত করতে বড় ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, ভিক্টোরিয়ান বিধবাদের জন্য ছিল আলাদা শোকবিধি। প্রথম পর্যায়ে প্রচলিত ছিল সম্পূর্ণ কালো পোশাক, ভারী ক্রেপ এবং দীর্ঘ উইপিং ভেইল। সময়ের সঙ্গে শোকের আনুষ্ঠানিকতা কিছুটা শিথিল হলে পোশাকে জায়গা পেত কালো সিল্ক, লেইস এবং পরে ধূসর, লাইলাক কিংবা ল্যাভেন্ডারের মতো অপেক্ষাকৃত হালকা রং। এমনকি মৃত প্রিয়জনের চুল দিয়ে তৈরি লকেট কিংবা কালো জেট পাথরের গয়নাও হয়ে উঠেছিল শোক পালনের অংশ।
দক্ষিণ এশিয়া
এই অঞ্চলে মানুষের জীবনের সঙ্গে ধর্ম গভীরভাবে জড়িয়ে। হিন্দু ঐতিহ্যে সাদা শোক, পবিত্রতা ও সাংসারিক আসক্তি থেকে সরে থাকার সঙ্গে যুক্ত। ইসলাম ধর্মেও শোকের সময় সাদাতেই পবিত্রতা খুঁজে নেওয়া হয়। খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা যায়।
ঘানা
ঘানার আকান জনগোষ্ঠীর কাছে গাঢ় লাল তীব্র শোক ও বেদনার প্রতীক। কিন্তু দীর্ঘ জীবন শেষে কারও মৃত্যু হলে তা উদ্যাপন করা হয় সাদা পোশাক দিয়ে।
নিউ অরলিন্স
চমকপ্রদ ফিউনারেল ফ্যাশনের দেখা মেলে নিউ অরলিন্সের জ্যাজ ফিউনারেলে। শোকযাত্রার শুরুতে থাকে গাম্ভীর্যপূর্ণ কালো পোশাক, ধীর লয়ের সংগীত আর বিষণ্ন আবহ। কিন্তু পুরো কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বদলে যায় দৃশ্য। শুরু হয় দ্বিতীয় অধ্যায়। রঙিন ছাতা, রুমাল ও পালকের মতো অনুষঙ্গের সাজে জ্যাজ মিউজিকের তালে তালে নাচতে নাচতে এগিয়ে যান শোকযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা। এখানে বিদায় মানে শুধু শোক নয়; জীবনের উদ্যাপনও।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানব জীবনে মিশে থাকা শোকের পোশাকও। এখন অনেক পরিবার প্রচলিত নির্ধারিত পোশাকের বদলে প্রয়াত মানুষের প্রিয় রং, প্রিয় পোশাক কিংবা তার ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় এমন পোশাক বেছে নেয়। অর্থাৎ, শোকের পোশাকে সামাজিক বাধ্যবাধকতার চেয়ে ধীরে ধীরে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রয়াত ব্যক্তির স্মৃতি।
ছবি: ইন্টারনেট
