ডিজাইনার ডায়েরি I ফায়জা আহমেদ
শুরু থেকে চেয়েছি শিল্পী হতে। পড়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। তবে যাত্রাপথে নানা এলোমেলো পথে ছুটেছি। অনেক ধরনের কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন একটি ফ্যাশন ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ের ওপর একই সঙ্গে দুটি ডিপ্লোমা করেছি। মাস্টার্স করেছি ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে। আবার অর্থনীতি নিয়েও পড়েছি কিছুদিন। খুব যে পড়ুয়া স্বভাবের ছিলাম, তা নয়; চেয়েছিলাম সবকিছু জেনে-বুঝে কোনো একদিকে এগোতে। কারণ, সৃজনশীল অঙ্গনে পড়াশোনা করলে ক্যারিয়ার বেছে নেওয়া সাধারণত বেশ জটিল হয়ে পড়ে। এরপর প্রায় ১৪ বছর কাজ করেছি স্পেস ডিজাইনার হিসেবে। ইন্টেরিয়র ও এক্সটেরিয়র ডিজাইন করতে গিয়ে মনে হতো, এখানে আসলে গ্রাহক যা চায়, সেভাবেই কাজ করতে হয়। নিজস্ব সৃজনশীলতা ও শিল্পীসত্তার জায়গা নেই বললেই চলে। এতে অর্থনৈতিক মুক্তি মিললেও মনের খোরাক পূরণ হচ্ছিল না।
২০১২ সালের পর থেকে কাপড় নিয়ে টুকটুক ডিজাইনের কথা ভাবছিলাম। তখন বাজারে কী নেই, সেটা বোঝার চেষ্টা করেছি। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করার তাগিদ থেকে। শুরুতে তাঁতে বোনা কাপড় সংগ্রহ করেছি। দেশীয় কাপড় ও সংস্কৃতি নিয়ে ভাবতে গিয়ে শাড়ির প্রতি তরুণদের অনাগ্রহের কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখি, পরিধানের জটিলতা নয়, বরং রয়েছে আধুনিক নকশার সংকট। তরুণদের পছন্দের গান, মিউজিক ব্যান্ড, সিনেমা, ইত্যাদি নিয়ে টি-শার্টের নকশা দেখা গেলেও তেমন কোনো নকশাই ছিল না শাড়িতে। এই ভাবনা থেকে ব্রিটিশ মিউজিক ব্যান্ড ‘বিটলস’-এর লেট ইট বি গানের ওপর একটি শাড়ি তৈরি করি। নকশাটি এতটাই সাড়া পেয়েছিল যে এক দিনের নোটিশে স্পেস ডিজাইনিং ছেড়ে দিয়েছিলাম।
ফ্যাশন লেবেল মানাস-এর শুরু ২০১৩ সালে। নামটি সংস্কৃত থেকে নেওয়া। অর্থ মস্তিষ্কের শক্তি। মনের মতো কাজ করার ইচ্ছা থেকেই এই নামকরণ। প্রতিটি নকশার পেছনে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করেছি, করে যাচ্ছি। মানুষের বই পড়া, সিনেমা দেখা ছাড়াও জীবনযাপনের নানা প্যাটার্ন নিয়ে ভেবেছি। পুরোনো দিনের সিনেমার নস্টালজিয়া, মুক্তিযুদ্ধের জন্য রবি শংকরের কনসার্ট, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে বেশ কিছু ডিজাইন করি।
কয়েক বছর পর মনে হয়েছে, শুধু গুগল থেকে নিয়ে ছাপিয়ে আসলে কাজ চলতে পারে না। চিত্রশিল্প নিয়ে কাজ করার সময় জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানের মতো গুণী চিত্রশিল্পীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুমতির পর তাদের আঁকা ছবিগুলো থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে শাড়ির নকশা করেছি। প্রায় এক যুগ হলো, এভাবেই পথ চলেছে মানাস।
ডিজাইন কনসেপ্টে অনেক সময় পশ্চিমা ট্রেন্ডের ফিউশন করলেও সব সময় চেয়েছি দেশীয় পণ্যে আটকে থাকতে। বোতাম থেকে লেইস—সবকিছুতেই। বাংলাদেশের তাঁতিদের বোনা সুতা আর কাপড়ে। বয়স ও অভিজ্ঞতার কারণে কি না জানি না, তবে এখন ডিজাইনার হিসেবে শুধু দেশ নিয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে।
আবৃতি আহমেদ
ছবি: অগ্নিলা আহমেদ অরণী
