skip to Main Content

হেরিটেজ I বন্ধন রঞ্জন

কয়েক হাজার গিঁট। প্রতিটি থেকে ফুটে ওঠে নান্দনিক নকশা। অজন্তা গুহার প্রাচীরচিত্র থেকে আধুনিক ফ্যাশন র‌্যাম্প। কালের বিবর্তনে আজও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম টাই-রেজিস্ট ডাইং পদ্ধতি এটি। কাপড়ের নির্দিষ্ট অংশগুলো সুতা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রঙে ডুবিয়ে তৈরি করা হয় নকশা। এটি বাঁধুনি বা বান্ধেজ নামেও পরিচিত।
উপমহাদেশের টেক্সটাইল ইতিহাসে এর ঐতিহ্য প্রায় পাঁচ হাজার বছরের। সিন্ধু সভ্যতার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার খননকার্যে প্রাপ্ত রঞ্জিত তুলার তন্তু তারই প্রমাণ দেয়। ষষ্ঠ শতাব্দীর অজন্তা গুহাচিত্রে নারীদের পরনে বৃত্তাকার বিন্দুর চুনরি-সদৃশ পোশাক দৃশ্যমান। অন্যদিকে সপ্তম শতাব্দীতে বাণভট্ট রচিত হর্ষচরিতে রাজকন্যার বিবাহ-উত্তরীয় বাঁধার বিশদ বিবরণ মেলে। এর বিশেষ সমাদর ছিল মোগল যুগে সম্রাটদের কোমরবন্ধনীতে। এটি ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে রপ্তানি হতো। এখনকার আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে পরিচিত শব্দ ব্যান্ডানা; যার জন্ম বিশেষ টাই-ডাই বান্ধনা রুমাল থেকে।
তৈরির প্রক্রিয়া বেশ জটিল ও ধৈর্যসাধ্য। এখানে প্রথমে নির্বাচন করতে হয় পাতলা, নমনীয় ও রং শোষণক্ষম কাপড়। সুতি, মলমল, রেশম, জর্জেট বা শিফনজাতীয়। এরপর কাপড়ে নির্দিষ্ট নকশার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হয়। কারিগরেরা কাপড়ের ক্ষুদ্র অংশ নখ বা বিশেষ ধাতব আংটির সাহায্যে তুলে সুতা দিয়ে শক্ত করে গিঁট বাঁধেন। এটাই সবচেয়ে শ্রমসাধ্য ধাপ। একটি শাড়িতে গিঁট থাকতে পারে কয়েক হাজার। ঘন নকশায় সংখ্যা পৌঁছায় প্রায় ১৫ হাজারে।
এরপর শুরু হয় রঞ্জন। প্রথমে সাধারণত হালকা রঙে কাপড় ডোবানো হয়। শুকানোর পর প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু বাঁধন খোলা বা নতুন অংশ বাঁধা হয়। তারপর কাপড় আবার গাঢ় রঙে ডোবানো হয়। এভাবে একাধিক ধাপে রং দেওয়ার ফলে একই কাপড়ে তৈরি হয় নানা রঙের স্তর। পূর্বে ইন্ডিগো, হলুদ, মাদার রুট বা মেহেদির মতো প্রাকৃতিক রঞ্জকও ব্যবহৃত হতো। সবশেষে শুকিয়ে গেলে একে একে খুলে দেওয়া হয় গিঁটগুলো; তখনই প্রকাশ পায় আসল সৌন্দর্য। হাজারো রঙিন বিন্দু ও নকশা।
বাংলাদেশে আশির দশকে বুটিক সংস্কৃতির উত্থানের সঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই অলংকরণের ধারা। গায়েহলুদের শাড়ি থেকে সালোয়ার-কামিজ, ওড়না, ফতুয়া এমনকি ঘরসজ্জার সামগ্রীতেও এর ব্যবহার দেখা যায়।
ঐতিহ্যবাহী এই কারুকাজ আজ যান্ত্রিক প্রিন্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়। মেশিনে তৈরি নকশা যেখানে দ্রুত ও সস্তায় বাজারে আসে, সেখানে হাতে বাঁধা কাপড়ে থেকে যায় সূক্ষ্ম উঁচু-নিচু টেক্সচার। কারিগরের হাতের এই স্বাক্ষর যন্ত্রে তৈরি করা অসম্ভব। তাই আসলের সঙ্গে নকলের প্রতিযোগিতা হয়নি; হবেও না।

 আবু সালেহ শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ
মডেল: রহমান সিনথিয়া
ওয়্যারড্রোব: ক্যানভাস
ছবি: কৌশিক ইকবাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top