skip to Main Content

ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন I মূর্তির মূর্ছনা

পাথরে স্থির দেবী, নৃত্যরত অপ্সরা কিংবা পৌরাণিক চরিত্র; যাদের শরীরের বাঁক, পোশাকের ভাঁজ আর অলংকার একসময় শুধু মন্দিরের দেয়ালেই দেখা যেত, তারাই যেন হেঁটে আসছে ফ্যাশনের রানওয়েতে। প্রাচীন ভাস্কর্যের সেই চিরন্তন সৌন্দর্য এবার কাপড়, ড্রেপিং, এমব্রয়ডারি ও স্কাল্পটেড সিলুয়েটে পাচ্ছে নতুন রূপ। আবৃতি আহমেদের লেখায় বিস্তারিত

অবাক করেছে এ বছরের প্যারিস ওত কতুর উইক। দেব-দেবীর অলীক সত্তার উপস্থাপন ঘটেছে রানওয়েতে। শুধু ভারতীয় ডিজাইনাররাই নন, একই অনুপ্রেরণার দেখা মিলছে পশ্চিমাদের নকশায়ও। নতুন নয়, এই মুগ্ধতা অনেক পুরোনো। শুরু হয়েছিল পশ্চিমের ভারতবর্ষ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে।
জাহাজে চড়ে বাণিজ্যযাত্রায় বেরিয়েছিলেন ভেনিসীয় বণিক মার্কো পোলো। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষে তার জাহাজ পৌঁছায় দক্ষিণ ভারতের করমণ্ডল উপকূলে। অর্থাৎ এ সময়ের তামিলনাড়ুতে। মধ্যযুগে তৈরি সেখানকার রাজসিক মন্দিরগুলোর স্থাপত্যশৈলী দেখে মুগ্ধ হন তিনি। লোকালয়ে বসবাসরতদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণ সম্পর্কে তেমন কিছু না জানলেও নিজের মতো করে নথিভুক্ত করেন মন্দিরগুলোর স্থাপত্যশৈলীর রূপ-নিদর্শন। ভিন ভাষায় প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভারতীয় খোদাইশিল্পের সৌন্দর্য এবং এর সঙ্গে স্থাপত্যের সংযোগ, যা নজরে আসে পশ্চিমা বিশ্বের। এই তথ্য পাওয়া যায় দ্য ট্রাভেস অব মার্কো পোলো গ্রন্থসমগ্রের তৃতীয় খণ্ডে। তারপর পশ্চিম থেকে আসা নাবিক, বণিক, পর্যটকদের অনেকে লিখেছেন ভারতবর্ষের দেব-দেবী অনুপ্রাণিত স্থাপত্যকলা নিয়ে। উঠে এসেছে কর্ণাটকের হৈসলেশ্বর ও চেন্নাকেশব মন্দির, মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো মন্দির, ওডিশার কোনার্ক সূর্যমন্দিরের কথা। খুঁজলে পাওয়া যায় বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার কান্তজিউ মন্দিরের কথাও। দেব-দেবীর অবয়ব, হাতি-ঘোড়া, মানুষের জীবনাচরণ—সবই খোদাই করা হয়েছে মন্দিরের দেয়ালজুড়ে।
মন্দিরের দেয়ালে অবয়বখচিত নকশার বর্ণনা পাওয়া যায় স্কটিশ ভূগোলবিদ ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিলটনের লেখায়। ১৮৩৩ সালে দিনাজপুরে এসেছিলেন তিনি। সংযুক্ত ভারতবর্ষের বিভিন্ন মন্দিরের একই ধাঁচের নকশার কথা লিখে গেছেন স্থাপত্য-ইতিহাসবিদ জেমস ফার্গুসন। তিনিও এসেছিলেন স্কটল্যান্ড থেকে। ১৮৩০-এর দশকে। মন্দিরের স্থাপত্যে মানবদেহের অলীক উপস্থাপনার মুগ্ধতার কথা তিনি লিখে গেছেন ‘হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান অ্যান্ড ইস্টার্ন আর্কিটেকচার’ বইয়ে। লিখেছেন পাথরে খোদাই করা স্থির অপ্সরাদের অবয়ব আর অলংকরণের কথা। স্তরে স্তরে হার, কোমরবন্ধ, নূপুর, মুকুট—আরও কত কী! সবই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে হাতের খোদাইয়ে। কোনো আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই, শুধু দক্ষতা আর কৌশলে। সেই দেব-দেবীর অবয়বই আজকাল দেখা মিলছে হাই ফ্যাশনে।
রানওয়ে রেস
রাহুল মিশ্র
ঐশ্বরিকতা, পৌরাণিকতা ও অলৌকিক বিষয়বস্তু বরাবরই ফ্যাশনের অনুপ্রেরণা। তবে এ বছর বিষয়টি যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্যারিস ওত কতুর উইকে। সেখানে ভারতীয় ফ্যাশন ডিজাইনার রাহুল মিশ্র উপস্থাপন করেন দেবী নামের এক কালেকশন। ‘প্রাচীন ভারতীয় মন্দিরের ভাস্কর্য, অজন্তা গুহা ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় শিল্পের ভিজ্যুয়াল ভাষা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি পাথরে খোদাই করা দেবী, অপ্সরা ও স্বর্গীয় চরিত্রগুলোকে নতুনভাবে অনুবাদ করেছেন কতুরে।
মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা অবয়ব যেন রানওয়েতে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। জারদৌসি, ডাবকা, ক্রিস্টাল ও বাগল বিডের সূক্ষ্ম হ্যান্ড এমব্রয়ডারির স্তর তৈরি করেছে পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্যের মতো ত্রিমাত্রিক টেক্সচার। পোশাকগুলো তাই নিছক অলংকৃত নয়, বরং ভাস্কর্যসুলভ। মডেলদের দেখে মনে হচ্ছিল, যেন মন্দিরের পাথুরে অবয়বই হেঁটে এসেছে সমকালীন ফ্যাশনের মঞ্চে। প্যালেটে ছিল স্টোন গ্রে, কালো, আইভরি, বেইজ, অ্যান্টিক গোল্ড ও ধাতব টোন; যা আরও জোরালো করেছে প্রাচীন ভাস্কর্যের আবহ।
রাহুলের ভাবনার কেন্দ্রে ছিল একটি কল্পনা—মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা সেই দেবী ও স্বর্গীয় অবয়বগুলো যদি পাথর ছেড়ে বর্তমান সময়ে এসে দাঁড়াত, দেখতে কেমন হতো? দেবী সেই প্রশ্নের এক অসাধারণ উত্তর।
গৌরব গুপ্ত
একই মঞ্চে অর্ধনারীশ্বর—শিব ও পার্বতীর সম্মিলিত শক্তির ঐশ্বরিক রূপের ফ্যাশনেবল উপস্থাপনা করেছেন ভারতীয় ফ্যাশন ডিজাইনার গৌরব গুপ্ত। প্যারিস ওত কতুর রানওয়েতে উপস্থাপন করেছেন ‘দ্য ডিভাইন অ্যান্ড্রোজিন’। অনুপ্রেরণা নিয়েছেন প্রাচীন ঐশ্বরিক ভাস্কর্য থেকে। তবে দৈব রূপকে সরাসরি পুনর্নির্মাণ না করে একই দেহে পুরুষত্ব ও নারীত্বের সহাবস্থানের ধারণাকে ভাস্কর্যধর্মী ও লৈঙ্গিক নিরপেক্ষ পোশাকে রূপান্তর করেছেন তিনি। তৈরি করেছেন গঠনগত ও পরিধানযোগ্য নকশা। প্রাধান্য পেয়েছে সাদা, কালো ও সোনালি রং।
শুধু ভারতীয় ডিজাইনাররাই নয়, এ ধরনের কাজ করেছেন পশ্চিমা ডিজাইনাররাও। ভারতীয় ছাড়া গ্রিক ও মিসরীয় দৈব সত্তাও অনুপ্রেরণা হয়েছে ফ্যাশনের। দেখা গেছে ক্রিশ্চিয়ান ডিওর ও কোকো শ্যানেলের মতো ইউরোপীয় লাক্সারি ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর কালেকশনে। ফ্যাশনকে এত গভীর অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে বিশেষ কয়েকটি মূর্তমান আবহ।
সোফিয়া ক্রোচিয়ানি
জ্ঞান ও যুদ্ধের গ্রিক দেবী অ্যাথেনার রূপ-সৌন্দর্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন দেশ-বিদেশের বহু ডিজাইনার। এ বছর এলিস কতুরের স্প্রিং-সামার কালেকশনে ইতালীয় ডিজাইনার সোফিয়া ক্রোচিয়ানি প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্যের রূপ ও ড্রেপিংকে নতুনভাবে অনুবাদ করেছেন। মায়রন’স এথেনা, ভেনাস দি মিলো এবং উইংগড ভিক্টরি অব সামাথরেইসের ভাস্কর্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি সিল্ক, স্যাটিন ও টিউলের মতো ফ্লোয়ি ফ্যাব্রিকে তৈরি করেছেন ভাস্কর্যসুলভ পোশাক।
তরুণ তাহিলিয়ানি
সনাতন ধর্মের মহাদেব শিবের একটি বিশেষ রূপ নটরাজ। যে রূপে তিনি প্রকাশিত হন ‘লর্ড অব ডান্স’ বা নৃত্যের রাজা হিসেবে। নটরাজের মূর্তি থেকে অনুপ্রাণিত হচ্ছে ফ্যাশন। এই ধারায় মূল বিষয় হচ্ছে মুভমেন্ট বা গতিবিধি। পোশাকের স্টাইলের নৃত্যরত অবস্থার অবয়ব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা। এক কাঁধ খোলা রেখে প্যাঁচানো ড্রেপিং, ঘেরওয়ালা স্কার্ট, অসম হাতা, স্পাইরাল এমব্রয়ডারি, ঘন কুঁচি ছাড়াও দেখা মেলে আগুন বা অগ্নিশিখা থেকে অনুপ্রাণিত ধাতব কারুকাজ। বেশি ব্যবহৃত হয় পোড়া কমলা, আগুনে পুড়ে যাওয়া সোনা, ডিপ ব্রোঞ্জের মতো রংগুলো। তরুণ তাহিলিয়ানি তার ২০০১ সালের স্প্রিং-সামার কালেকশনে এমন কাজ দেখিয়েছেন।
শিয়াপারেল্লি
এই গ্রিক-অনুপ্রেরণার ধারাটি সাম্প্রতিক কতুরেও দেখা গেছে শিয়াপারেল্লির কাজে। ফর ২০২৬-এর কতুর কালেকশনে ভাস্কর্যের মতো গঠন, মার্বেল টর্সোর আদলে স্কাল্পটেড বডিস এবং ক্ল্যাসিক্যাল গ্রিক সৌন্দর্যের ইঙ্গিত মিলেছে।
জ্যাক পোসেন
চলতি বছরের মেট গালার প্রদর্শনীর থিম ছিল কস্টিউম আর্ট আর ড্রেস কোড ফ্যাশন ইজ আর্ট। তাই অতিথিদের পোশাকে উঠে এসেছিল চিত্রকর্ম থেকে শুরু করে প্রাচীন ভাস্কর্যের নানা রেফারেন্স। এর মধ্যে বিশেষভাবে নজর কেড়েছিলেন মার্কিন মডেল কেন্ডেল জেনার। জ্যাক পোসেনের ডিজাইন করা গ্যাপ স্টুডিওর সাদা গাউনটি অনুপ্রাণিত হয়েছিল দ্বিতীয় শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বের বিখ্যাত গ্রিক ভাস্কর্য উইংগড ভিক্টরি অব সামাথরেইস থেকে। ভাস্কর্যটির বাতাসে উড়তে থাকা ড্রেপিং ও গতিশীলতাকে তরল জার্সি, সাটিন-ফেসড শিফন ও অরগ্যাঞ্জার মাধ্যমে পোশাকে অনুবাদ করা হয়েছিল।
মাইক মারিনো
তবে ভাস্কর্যের অনুকরণে সবচেয়ে আক্ষরিক রূপটি দেখা গেছে মার্কিন মডেল ও উপস্থাপিকা হেইডি ক্লামের লুকে। প্রসথেটিক মেকআপ ও বিশেষ বডি ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে তিনি যেন জীবন্ত মার্বেল ভাস্কর্যে পরিণত হয়েছিলেন। রাফায়েলে মন্তির ভেইলড ভেস্টাল ভাস্কর্য থেকে অনুপ্রাণিত এই লুক রাতের অন্যতম আলোচিত উপস্থিতি হয়ে ওঠে।
প্রেরণা পুরাণ
খোদাইশিল্প থেকে সবচেয়ে বেশি নেওয়া হয়েছে মোটিফ। প্রিন্ট ও প্যাটার্নে। অনেক আগে থেকে। তবে এখন কাজ হচ্ছে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন। ভাস্কর্যের আদলে ডিজাইনাররা তৈরি করছেন স্কাল্পটেড ও বডি-স্কিমিং সিলুয়েট। অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা নৃত্যরত অপ্সরার মূর্তি। নাচের ভঙ্গি অনুসরণে তৈরি করা হচ্ছে অপ্রতিসম সিলুয়েট ও কার্ভড সিমলাইন গঠন। মূর্তির প্রবাহিত চুল থেকে অনুপ্রাণিত হচ্ছে ঝালর ও সুতার দৃষ্টিনন্দন স্টাইল। করা হচ্ছে বিশালাকার গয়নার সমন্বয়। বাজু, বিছা, মুকুট, লহর—বাদ যাচ্ছে না কিছুই।
কোমরের বাঁক অনুসরণ করে সেই স্টাইলে করা হচ্ছে ড্রেপিং। আধুনিক ট্রাউজার্সে ধুতিসদৃশ ভাঁজ, শাড়িসদৃশ ভাঁজের গাউন, ক্রস-বডি ড্রেপ আর লেয়ার্ড প্যানেল। ফ্লোয়ি প্যাটার্নের হালকা কাপড়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে স্কাল্পটেড করসেট টপ। কোমরবন্ধের আদলে তৈরি হচ্ছে বেল্ট। গয়নায় দেখা মিলছে মুকুট, কণ্ঠহার, নূপুর কর্ণফুলের মতো গয়নার ভাস্কর্যসুলভ নকশা।
সরাসরি ভাস্কর্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে পাথরের টেক্সচারের আদলে নতুন ধারার এমব্রয়ডারি দেখা যাচ্ছে ব্র্যান্ডগুলোর ডিজাইনার কালেকশনে। সুতা, কাপড়, এমনকি কাপড়ের ওপর কারুকাজখচিত এমব্রয়ডারিতে ব্যবহৃত হচ্ছে স্টোন, আইভরি, অ্যান্টিক গোল্ড, টেরাকোটার মতো আর্দি টোনের রংগুলো। দেখে মনে হয় যেন পাথরের ভাস্কর্য জীবন্ত হয়ে নেমে এসেছে ফ্যাশন জগতে।
তথ্যসূত্র: জার্নাল অব ফ্রান্সিস বুকানন
হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান অ্যান্ড ইস্টার্ন আর্কিটেকচার; ১৮৭৬, জেমস ফার্গুসন।
টেইলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস জার্নাল

ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top