skip to Main Content

ফিচার I অফিস টু প্যান্ডেল

মহালয়া থেকে দশমী, রোজ মেলে না ছুটি। তাই বলে কি প্যান্ডেল হপিং বাদ থাকবে? মোটেই নয়। তাই অফিস থেকেই হোক পূজার ঘোরাঘুরি। লিখেছেন শ্রেয় চৌধুরী ও আবু সালেহ শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ

ব্যস্ত নাগরিক জীবনে উৎসব আর পেশাদারত্বের চমৎকার সমঝোতার নাম ‘অফিস টু প্যান্ডেল’। কর্মক্ষেত্রে দুর্গাপূজার ছুটির পরিধি সীমিত হওয়ায় অনেকের ষষ্ঠী বা সপ্তমী পর্যন্ত অফিস করতে হয়। আর দিন শেষে যানজট ঠেলে বাড়ি ফিরে আবার বের হওয়া যেমন ক্লান্তিকর, তেমনই সময়সাপেক্ষ। তাই দৈনন্দিন কাজের একঘেয়েমি কাটিয়ে সহকর্মীদের নিয়ে অফিস থেকে সরাসরি মণ্ডপে ঘুরতে যাওয়া হয়ে উঠেছে সমকালীন শারদীয় সংস্কৃতির নতুন ট্রেন্ড।
বাংলার মানুষ শরৎকে চিরকালই দেখে এসেছে সাদা-লাল পাড়ের শাড়িতে। এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী গানে শারদীয়ার উদ্‌যাপনে কাজী নজরুল ইসলাম এঁকেছেন শিউলি ছোপের শাড়ির ছবি

শাপলা শালুকে সাজাইয়া সাজি শরতে শিশিরে নাহিয়া,
শিউলি-ছোপানো শাড়ি পরে ফের আগমনী গীতি গাহিয়া

শরৎ নিয়ে এমন রঙিন কল্পনার প্রধান কারণ শারদীয় দুর্গোৎসব। উৎসবের গাঢ় রংগুলো নৈবেদ্যর ডালা পেরিয়ে নেমে আসে পূজার সাজে—শাড়ি, পাঞ্জাবিতে। তবে পোস্টমডার্ন ফ্যাশনের দুনিয়ায় দুর্গাপূজার সাজ মানেই ভারী শাড়ি, জমকালো গয়না আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা আয়নার সামনে প্রস্তুতি—এমন দিন বোধ হয় শেষ। এখন পূজার ফ্যাশনে ট্রেন্ডের পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ আরাম ও ব্যক্তিগত স্টাইল; বিশেষ করে প্যান্ডেল থেকে প্যান্ডেলে ঘোরার দিনে এমন পোশাকই বেশি স্বস্তির, যা দেখতে উৎসবমুখর, কিন্তু পরতে একেবারেই সহজ।
শারদীয় দেবীরা
বাঙালি নারীর সাজের অনেকটাই শুরু হয় শাড়ি দিয়ে। সেই শাড়িই হতে পারে পূজার ক্যাজুয়াল সাজের প্রথম পছন্দ। সুতি, জামদানি, মসলিন, লিনেন-সিল্ক কিংবা নরম সিল্ক-ব্লেন্ডের শাড়ি গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় তুলনামূলক আরামদায়ক। শাড়ির সঙ্গে খুব ভারী ব্লাউজের বদলে সিম্পল কাটের স্লিভলেস, ছোট হাতা কিংবা আধুনিক নেকলাইনের ব্লাউজ বেছে নেওয়া যায়। লাল-সাদা অবশ্যই চিরন্তন, তবে উৎসবের পাঁচ দিন শুধু এই দুই রঙে আটকে থাকারও কোনো মানে নেই। পান্না, আসমানি, রানী গোলাপি—সবই হতে পারে পূজার রঙের অংশ।
শাড়ির ঝক্কিতে পড়তে না চাইলে পছন্দের তালিকায় থাকতে পারে কুর্তি, পালাজ্জো, স্ট্রেইট প্যান্ট কিংবা কো-অর্ড সেট। ফুলেল বা জ্যামিতিক প্রিন্টের কুর্তির সঙ্গে সাদামাটা বটম, অথবা প্যাস্টেল সেটের সঙ্গে স্টেটমেন্ট কানের দুল—অল্প আয়োজনে তৈরি হয়ে যাবে পূজার লুক। আরও ক্যাজুয়াল থাকতে চাইলে সেটিরও উপায় আছে। গ্রাফিক টি-শার্ট এখন বেশ ট্রেন্ডি। এর সঙ্গে জিনস বা রিল্যাক্সড ট্রাউজার আর স্নিকার—এই কম্বিনেশনেও একেবারে জমে যাবে পূজার ফ্যাশন।
স্বর্গের দেব যেন
পাঞ্জাবি বা কুর্তা থাকছে, তার সঙ্গে ধুতি পরতেই হবে এমন নয়। ট্রাউজার, ডেনিম কিংবা সিম্পল প্যান্টের সঙ্গে কুর্তা মিলিয়ে নেওয়া যায়। সাদা, বেইজ, কালো, মেরুন কিংবা ডিপ গ্রিনের মতো রঙের পোশাকে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি, জ্যাকার্ড বা টেক্সচার যোগ করলে সাজটি হয়ে উঠতে পারে উৎসবের উপযোগী, আবার বজায় থাকবে হালকা ক্যাজুয়াল মুড। এক ঢিলে দুই পাখি।
রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাসের মতে, পোশাক নির্বাচনে একটু কৌশলী হলেই ক্যাজুয়াল আউটফিটেও আনা যায় পূজার আমেজ। উৎসবধর্মী ফ্যাব্রিক, প্যাটার্ন, হাতের কাজ, এমব্রয়ডারি কিংবা প্রিন্ট—এসবের দিকে নজর রেখে পোশাক বেছে নিলে সাধারণ ক্যাজুয়াল পোশাকও হয়ে উঠতে পারে উৎসবমুখর।
প্রভাবক
ক্যাজুয়াল আউটফিটে কীভাবে যোগ করা যায় পূজার আয়োজন, অ্যাকসেসরিজ ও জুয়েলারি—সেটা সৌমিকের কাছ থেকে শুনি। সৌমিক দাসের কথায়, আমরা রঙ বাংলাদেশে পাঞ্জাবি, শাড়ি ছাড়াও টপস, কামিজ, শার্ট, ফতুয়া, টি-শার্ট, ওড়না, উত্তরীয়, ধুতি, গয়নাসহ হরেক রকম সামগ্রী রাখি পূজার বিশেষ আয়োজনে। সাধারণ একটি টপস, কামিজ বা টিউনিকের সঙ্গে পূজার মোটিফের ওড়না বা স্কার্ফ, কিংবা গয়না যোগ করেই উৎসবের সাজ তৈরি করা যায়। সাধারণ পোশাকের সঙ্গে আমাদের পূজার বিশেষ ধুতি পরে গলায় উত্তরীয় ঝুলিয়েও পুরুষেরা যোগ দিতে পারেন উৎসবের আয়োজনে। পূজার মোটিফের টি-শার্ট, শার্ট, ফতুয়া, কাতুয়াও হতে পারে ভালো অপশন।
পূজার সাজে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনুষঙ্গ। পোশাক সাদামাটা হলে অক্সিডাইজড সিলভার, ম্যাট গোল্ড, মুক্তা কিংবা রঙিন পাথরের গয়না লুককে আলাদা করে তুলতে পারে। তবে প্যান্ডেল থেকে প্যান্ডেলে ঘোরার বিষয়টি মাথায় রেখে ভারী গয়নার বদলে এমন কিছু বেছে নেওয়া ভালো, যা দীর্ঘ সময় পরেও অস্বস্তি তৈরি করবে না। একই কথা প্রযোজ্য জুতার ক্ষেত্রে। সাজ যতই সুন্দর হোক, অস্বস্তিকর জুতা পুরো অভিজ্ঞতাই নষ্ট করে দিতে পারে।
ঐকতান
অফিস টু প্যান্ডেল শুধু প্রতিমা দর্শনের মাধ্যম নয়, এটি করপোরেট দূরত্ব ঘোচানোরও এক সুযোগ। কাজের কঠোর নিয়মের বাইরে অফিসের বস ও সহকর্মীদের সঙ্গে মেট্রোর ভিড় সামলানো, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে কড়া চায়ের ভাঁড়ে চুমুক কিংবা দলবদ্ধ সেলফি—সবই কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ককে করে তুলতে পারে আরও সহজ ও আন্তরিক।
নাগরিক জীবনের শত ব্যস্ততা কিংবা ডেডলাইনের চাপ বাঙালির উৎসবমুখর প্রাণকে আটকে রাখতে পারে না। শারদীয় উৎসব তারই প্রমাণ। অফিসের ব্যস্ততার মাঝেও যে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠা যায়, সময় কম হলেও যে আনন্দে কমতি থাকে না—পূজা তা-ই মনে করিয়ে দেয়। শুধু চাই একটু পরিকল্পনা আর ইতিবাচক মনোভাব। তাহলেই অফিস শেষে শুরু হতে পারে উৎসব-অভিযান।

মডেল: সিয়াম ও নাভিলা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: ব্লুচিজ ও বেলওয়ারি
ছবি: কৌশিক ইকবাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top