সঙ্গানুষঙ্গ I প্রেরক: প্রিয় পৃথিবী
প্রকৃতির অপার দান। যুগে যুগে শিল্পের অনুপ্রেরণা। আধুনিক অনুষঙ্গেও দারুণ দাপট। তত্ত্বতালাশে আবৃতি আহমেদ
বস্তুজগতের পাঁচটি মৌলিক উপাদানের উল্লেখ রয়েছে দর্শনতত্ত্বে—ভূমি, পানি, বাতাস, আগুন ও আকাশ। বলা হয়, এই পাঁচের সমন্বয়ে পরিচালিত হয় পৃথিবী। শাস্ত্রের ভাষায় পঞ্চভূত বা পঞ্চমহাভূত বলে পরিচিত। সংস্কৃত শব্দ পঞ্চের সহজ বাংলা পাঁচ। মহা অর্থ মহান বা বৃহৎ; আর ভূত অর্থ মৌলিক উপাদান। এই পাঁচকে সঙ্গে নিয়েই প্রকৃতির যাত্রা। তার কিছুটা পায় মানুষ—দর্শণে, অনুভবে আর প্রয়োজনে। নেয় অনুপ্রেরণা। সবকিছুতেই। শুধু বস্তুত নয়, সৃষ্টিতেও। মানবদেহ ও ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে প্রকৃতির যোগাযোগ ঘটায় এই পাঁচ।
মৃত্তিকা
পঞ্চভূতের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও দৃঢ় উপাদান; জানান দেয় শক্তি, স্থিরতা, ভার, স্থায়িত্ব, উর্বরতা ও অস্তিত্বের; আর যোগাযোগ স্পর্শ, ঘ্রাণশক্তি ও দৃষ্টির সঙ্গে। মাটি, গাছ, কাঠ, পাথর নিয়ে ভূমি। প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ ও ধাতুও এর অংশ। প্রাচীনকাল থেকে মাটি ও পাথর দিয়ে প্রয়োজনীয় নানা অনুষঙ্গ তৈরি করেছে মানুষ; বিশেষ করে গয়না। পাথরকে নানা আকারে কেটে, ঘষে-মেজে গয়না তৈরির নজির রয়েছে ইতিহাসে। উদাহরণ মেলে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতার নিদর্শনে। রঙিন রত্নপাথরের অলংকার প্রাচীন মিসরীয়দের ব্যবহার্য ছিল বলে সাক্ষ্য দেয় ইতিহাস। রোম ও গ্রিসের নিদর্শনেও পাওয়া যায় পাথরের গয়না। হীরা, চুনি, পান্না, নীলকান্তমণি—সবই ভূমি থেকে প্রাপ্ত রত্ন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী গয়নার অংশ হয়ে জায়গা করে নিয়েছে ফ্যাশনে। আর ভূমি থেকে উত্থিত খনিজ ধাতুর গয়না তৈরি হয় সোনা, রুপা দিয়ে।
মাটির তৈরি গয়না কতটা পুরোনো, সে সম্পর্কে ধারণা করা যায় একটি আবিষ্কার থেকে। প্রায় ১৫ হাজার বছরের পুরোনো অলংকার পাওয়া গেছে লেভান্ট অঞ্চলের নাতুফিয়ান প্রত্নস্থলে। ধরণি থেকে পাওয়া এই উপাদান এখনো প্রাসঙ্গিক। টেকসই ফ্যাশনেও তার গুরুত্ব অপরিসীম। মাটি, কাঠ, ধাতু, পাথর; এমন নানা রূপে গঠনগত ও আলংকারিক—দুই রূপেই যোগ হয়েছে ফ্যাশনে।
পানি
বিশ্বে প্রাচীন গয়নাগুলোর মধ্যে শামুকের খোল দিয়ে তৈরি অলংকারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। ইসরায়েলের স্কাল কেইভ থেকে পাওয়া শামুকের খোলের পুঁতি প্রায় এক লাখ বছর বা তার বেশি পুরোনো বলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ধারণা করা হয়। এসব প্রমাণে বলা যায়, সমুদ্র ও জলজ জগতের নানা উপাদান মানুষের অলংকারচর্চায় বহু প্রাচীনকাল থেকে জায়গা করে নিয়েছে। শামুকের খোল, কোরাল, ঝিনুক ও মুক্তার মতো সামুদ্রিক উপকরণে তৈরি হয়েছে নানা গয়না। শুধু উপকরণেই নয়, গয়নার নকশাতেও পানির তারল্য ও প্রবাহের ছাপ দেখা যায়। পানির প্রবাহ থেকে প্রাণিত মেলটেড গয়না বহুদিনের ফ্যাশনের চেনা অনুষঙ্গ। এ ছাড়া আছে জলের ফোঁটা, সমুদ্রের ঢেউসহ বেশ কিছু মোটিফ।
বাতাস
শ্বাসপ্রশ্বাসের উৎস, যাতে নিহিত থাকে প্রাণশক্তি। বাতাসপ্রাণিত গয়না মানেই মোটিফের কারসাজি। এমন নকশা, যাতে বাতাসের চরিত্র বিদ্যমান। গতিশীলতা, স্বাধীনতা আর স্বচ্ছতা। হালকা আর আমুদে। বাতাসপ্রাণিত গয়নার মোটিফে দেখা যায় উড়ন্ত পাখির পালক, ডানা আর আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘ। বাতাসের প্রবাহ ফুটে ওঠে বাঁকানো বা ঢেউখেলানো ধাতব নকশায়। গয়নাটি যেন স্থির নয়, বরং চলমান। অদৃশ্য বাতাস গয়নায় দৃশ্যমান না হয়ে বরং এর অনুভূতিই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। হালকা, গতি ও স্বাধীনতার রূপে।
অগ্নি
আগুনকে সরাসরি গয়নায় রূপ দেওয়া না গেলেও অনেক গয়না তৈরিতে আগুনের ব্যবহার অপরিহার্য। মানুষ যখন মাটিকে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করতে শেখে, তখন থেকে তৈরি হতে শুরু করে টেরাকোটা পুঁতি, মূর্তি ও অলংকার। সোনা, রুপার মতো বিভিন্ন ধাতু আগুনে গলিয়ে নানা আকৃতি দিয়ে গয়না তৈরি করা হয়। তৈরি করা হয় আংটি, কানের দুল, পুঁতি, ব্রোচ, পেনডেন্ট, ব্রেসলেট—আরও কত কী। দেখা যায় আগুনপ্রাণিত মোটিফ। ফ্লেইম, অ্যাম্বার, মল্টেন মেটাল, বার্ন্ট টেক্সচার, স্মোক ও স্পার্ক। শক্তির প্রকাশ ঘটে এ ধরনের মোটিফে।
আকাশ
শূন্যতা ও অসীমতার প্রতিচ্ছবি আকাশ। পঞ্চমহাভূতের সবচেয়ে সূক্ষ্ম উপাদান হিসেবে ভারতীয় দর্শনে আকাশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আকাশ শব্দটি অনেক সময় স্পেস বা ইথারের ধারণার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা হয়। চাঁদ, তারা, গ্রহ, নক্ষত্র, মেঘ থেকে শুরু করে মহাকাশ—সবই আকাশপ্রাণিত নকশার অনুপ্রেরণা। রাতের আকাশের চাঁদ ও নক্ষত্র থেকে অনুপ্রাণিত গয়নায় তাই দেখা যায় মহাজাগতিক মোটিফ। প্রাচীন সভ্যতাগুলোর অলংকারেও সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রের প্রতীক ব্যবহারের নজির রয়েছে। অনেক সংস্কৃতিতে এসব প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা, দেব-দেবী কিংবা চন্দ্রচক্রের ধারণা। আধুনিক মহাজাগতিক নকশায় দেখা যায় গ্যালাক্সি, গ্রহ-নক্ষত্র ও মিল্কিওয়ের অনুকরণ। চাঁদের বিভিন্ন পর্যায়ের আকৃতিও জায়গা করে নিয়েছে পেনডেন্ট, কানের দুল ও ব্রেসলেটে। সূর্য ও নক্ষত্রের প্রতীকও রয়েছে সমকালীন অলংকারের নকশায়।
মডেল: নাবিলা
মেকওভার: পারসোনা
জুয়েলারি: ক্যানভাস
ছবি: কৌশিক ইকবাল
