skip to Main Content

ফিচার I হিলিং ড্রিংকস

সারা দিন রোজা শেষে শরীরে পানিশূন্যতা ও পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। তাই বিশেষত ইফতারে রাখা চাই এমন পানীয়, যা দেহ, মন—উভয়ের জন্য উপকারী

হিলিং ড্রিংকস বলতে এমন সব পানীয়কে বোঝায়, যা শরীর ও মনের স্বাভাবিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়ক। হজম শক্তির উন্নতি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার, হরমোনের সামঞ্জস্য রক্ষা, অন্ত্র ও ত্বকের প্রদাহ প্রশমন, প্রশান্তিদায়ক ও স্বাভাবিক ঘুম নিশ্চিত করতে এবং মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে আদিকাল থেকে আয়ুর্বেদ ও ইউনানি শাস্ত্রে নানাবিধ হিলিং ড্রিংকসের ব্যবহার দেখা যায়। আমাদের গৃহস্থালি জীবনেও রসুইঘরে দেখা মেলে এমন সব উপাদানের, যা সুস্বাস্থ্যের জন্য অমূল্য রতন। ইফতার শুধু রোজা ভাঙার মুহূর্ত নয়; সারা দিনের শারীরিক ক্লান্তি, পানিশূন্যতা ও মানসিক চাপ কাটিয়ে শরীরকে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানোর সন্ধিক্ষণও। এই সময়ে সঠিক পানীয় বেছে নিলে, ইফতার হয়ে উঠতে পারে উপকারী ও স্বস্তিকর।
আনারের শরবত রোজার মাসে কিংবা অন্যান্য সাধারণ সময়েও স্বাস্থ্যের জন্য প্রশান্তিদায়ক। এতে এমন সব প্রাকৃতিক উপাদান থাকে, যা শরীরে শক্তি জোগায় এবং মন প্রফুল্ল রাখে। দিনমান পানাহার না করায় শরীর অনেক সময় দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ইফতারে আনারের প্রাকৃতিক শর্করা ও ফ্রুকটোজ দেহকে দ্রুত শক্তি দেয়। ফলে ক্লান্তি ও দুর্বলতা ঝটিতি দূর হয়। শুধু শরীর নয়, আনার মনকে সতেজ রাখতেও বেশ সহায়ক। এর রঙিন রস ও প্রাকৃতিক স্বাদ, মানসিক উদ্বেগ কমাতে, মন উদ্দীপ্ত করতে এবং দীর্ঘ সময় সতেজ রাখতেও কার্যকর।
রক্ত পরিশোধনে অসামান্য ভূমিকা রাখে আনার। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, বিশেষ করে পিউনিসিক অ্যাসিড এবং ভিটামিন সি রক্ত পরিষ্কার, রক্তচাপ ভারসাম্যপূর্ণ এবং হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখে। রোজার সময় অনেকের রক্তচাপ সাময়িকভাবে কমে যায় এবং শরীরে অক্সিজেন প্রবাহ কমে যেতে পারে; তখন আনারের শরবতে এই ভারসাম্য বজায় থাকে। এ ছাড়া আনারে থাকা প্রাকৃতিক এনজাইম পাকস্থলী ও অন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করে; হজম স্বাভাবিক রাখে। ফলে ইফতার বা সাহরীর পর পেট ভারী হওয়ার অনুভূতি, গ্যাস বা অস্বস্তি কমে যায় এবং শরীর সহজে রোজার লম্বা অনাহারে থাকার সময়টা সহ্য করতে পারে। প্রাচীনকাল থেকে আনারের ব্যবহার বহু অঞ্চলে, বিশেষ করে পারস্য ও আরব বিশ্বে বহুল প্রচলিত। বিশেষত, ইফতারে এর শরবত বেশ গুরুত্বপূর্ণ পানীয় হিসেবে পরিবেশিত হয়।
দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকায় ইফতারের সময় পাকস্থলী এ সময় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় হঠাৎ ভারী খাবার গ্রহণ করলে অনেকের বমি ভাব, অস্বস্তি, বুক জ্বালা কিংবা মাথা ভারী লাগার মতো সমস্যা দেখা দেয়। আদা-লেবু পানি মুহূর্তে শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। আদায় থাকা প্রাকৃতিক বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান পাকস্থলীর রক্তসঞ্চালন বাড়ায় এবং হজম এনজাইমের নিঃসরণ সক্রিয় করে; ফলে খাবার গ্রহণের জন্য পেট ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয়। অন্যদিকে লেবু পাকস্থলীর ভারী ভাব কমিয়ে হজমপ্রক্রিয়াকে হালকা ও গতিশীল করে তোলে। এই দুটির সমন্বয় বমি ভাব এবং গা ঘোলানোর অনুভূতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। লেবুতে থাকা ভিটামিন সি রোজার পর শরীর দ্রুত সতেজ, ক্লান্তি দূর এবং ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় করে তোলে। একই সঙ্গে আদার উষ্ণতা সারা দিনের অবসাদ কাটিয়ে শরীরে আরামদায়ক উষ্ণ অনুভূতি এনে দেয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় পাকা পেঁপে বেশ জনপ্রিয় ফল। এখানে গরমের ঋতুতে পেঁপের শরবত বা স্মুদি প্রশান্তির জন্য অনেকের খাদ্যতালিকার শীর্ষে থাকে। পেঁপে স্মুদি ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ফোলেট এবং পটাশিয়াম সমৃদ্ধ। এটি হজমপ্রক্রিয়াকে সহায়তা করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং যকৃতের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। স্মুদিতে বাদামের দুধ যোগ করলে প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে হাড়, দাঁত ও পেশির জন্য উপকারী হয়ে ওঠে। আবার বরফ বা ঠান্ডা দুধ যুক্ত করলে দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে পুরোটা সময়।
সারা দিন খালি পেটে থাকার পরে ভাজাপোড়া বা ভারী খাবার গ্রহণ করলে অনেকের অ্যাসিডিটি, বুক জ্বলা কিংবা পেট ভারী হয়ে থাকার মতো অস্বস্তি দেখা দেয়। দইয়ের ঘোলে থাকা প্রোবায়োটিক উপাদান অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করে, যা পাকস্থলীর জন্য আরামদায়ক। একই সঙ্গে এটি পাকস্থলীর অম্লতার ভারসাম্য বজায় রেখে অ্যাসিডিটির সমস্যা কমাতে সহায়ক। ইয়োগার্ট শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা রাখে, যা রোজার সময় সৃষ্ট অতিরিক্ত গরম ভাব বা অস্বস্তি দূর করে। ইফতারের শুরুতে বা খাবারের সঙ্গে দইয়ের ঘোল পান করলে ভারী খাবারের চাপ পাকস্থলীর ওপর কম পড়ে এবং হজমপ্রক্রিয়া মসৃণ থাকে। ফলে ইফতারের পর শরীর হালকা থাকে, ক্লান্তি কম লাগে এবং ইবাদত বা দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়।
দীর্ঘক্ষণ অভুক্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকার কারণে মানবদেহের কোষগুলো শুকিয়ে যায়। তোকমা দানার মতো পানিতে ভেজানো বীজ গ্রহণ করা গেলে অন্ত্রের ভেতর থেকে শরীরে আর্দ্রতা যোগ, অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য তৈরি এবং ক্লান্তি দূর হয় দ্রুত। ইসবগুলের প্রাকৃতিক ফাইবার অন্ত্রকে রাখে শান্ত এবং হজমের প্রক্রিয়াকে সহজ ও স্থিতিশীল করে তুলতে সক্ষম। রোজা রাখার পর পেট ভারী এবং অ্যাসিডিটি বা অস্বস্তি অনুভূত হওয়া সাধারণ ঘটনা। এ সময় এক চুমুক ইসবগুল ও সবজা বীজের শরবত অন্ত্রকে নরম ও শান্ত রাখে। হজম ভারসাম্যপূর্ণ এবং পেটের অস্বস্তি দূর করে। এই দুই উপাদান একসঙ্গে শরীরের ভেতরে একধরনের ধৈর্য ও স্থিতিশীলতা তৈরি করে, যা রোজার সময় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় সংযম বজায় এবং শক্তি ধরে রাখার পাশাপাশি গরম বা ক্লান্তি মোকাবিলা করতে দারুণ কার্যকরী এই শরবত। প্রাচীন পারস্য ও ভারতীয় উপমহাদেশের রান্নাঘরে এই বীজগুলো শরবতে বহুকাল ধরে ব্যবহৃত।
আরেকটি প্রাকৃতিক হিলিং উপাদান মৌরি। প্রাকৃতিকভাবে শীতল ও সুগন্ধযুক্ত। মৌরির এই গুণ পাকস্থলী শান্ত রাখতে সহায়ক। হজম এনজাইমের কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি অন্ত্রে শীতল একটা প্রলেপ এনে দেয় মৌরিতে থাকা অ্যানেথোল। ফলে অ্যাসিডিটি, পেট ফাঁপা ও বুক জ্বালার সমস্যা কমে। ইফতারের শুরুতে মৌরি পানি পান করলে পাকস্থলী খাবার গ্রহণের জন্য দারুণ প্রস্তুত হয়ে ওঠে; হজমপ্রক্রিয়া হয় অনেকটাই নির্বিঘ্ন।
জিরা প্রাচীনকাল থেকে হজমশক্তি উদ্দীপক হিসেবে ঘরে ঘরে ব্যবহৃত। এতে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যাকটিভ যৌগ পাকস্থলীর হজম রস ও এনজাইমের নিঃসরণ বাড়াতে সহায়ক। ইফতারির শুরুতে জিরা পানি পান করলে পাকস্থলী হঠাৎ ভারী খাবারের ধাক্কা সামলাতে পারে এবং খাবার সহজে ভাঙতে সক্ষম হয়। এই পানীয় পেট ভারী হয়ে থাকা, গ্যাস জমা, বুক জ্বালা ও অস্বস্তির অনুভূতি কমাতে কার্যকর। একই সঙ্গে এটি শরীরের ভেতরের অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং ইফতারের পর হালকা ও আরামদায়ক অনুভূতি তৈরি করে।
গোলাপজল তার প্রাকৃতিক সুগন্ধ ও শীতল গুণের কারণে শরীর ও মনের ওপর স্নিগ্ধ, প্রশান্তিদায়ক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় রোজা রাখার ফলে সৃষ্ট ক্লান্তি, মাথা ভার ভাব ও মানসিক অস্থিরতা কমাতে গোলাপজল মেশানো পানি কার্যকর। গোলাপজলের শরবত শরীরকে ভেতর থেকে শীতল রাখে এবং ইফতারের সময় হঠাৎ পানিশূন্যতার কারণে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, তা দূর করতে কাজে দেয়। এই পানীয় হালকা ডিটক্সের মতোও কাজ করে। শরীরের ভেতরের অপ্রয়োজনীয় তাপ ও চাপ কমিয়ে দেয় নিমেষে।
আরেকটি উপাদানের কথা এতে না যুক্ত করলেই নয়, অ্যালোভেরা। এর ব্যবহারের সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ মেলে প্রাচীন মিসরে। খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০ অব্দে রচিত ইবার্স প্যাপিরাসে অ্যালোভেরার উল্লেখ রয়েছে। মিসরীয়রা একে বলত অমরত্বের উদ্ভিদ। এর প্রাকৃতিক আর্দ্রতা শরীরের কোষগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে। অ্যালোভেরার শরবত পানে ক্লান্তি, মাথা ভারী ভাব বা অস্থিরতা অনেকটা কমে আসে। ইফতারে এক গ্লাস এমন শরবত শরীরকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনে। এর স্বচ্ছ, কোমল বৈশিষ্ট্য পাকস্থলীর ভেতরের অস্থিরতা কমায়; হজমতন্ত্রকেও করে শান্ত। এর নিরপেক্ষ স্বাদ মনে আনে প্রশান্তি। বহু সংস্কৃতিতে তাই একে বলে হিলিং প্ল্যান্ট।

 ফুড ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top