ফিচার I রসনেন্দ্রিয় রহস্য
বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য গ্রহণ অনিবার্য। মানুষ তাই খাবারকে সাধারণত উপকারীই ভাবে। ফলে খাবার দেখলে মস্তিষ্কের অবচেতন স্তর থেকে আসে নিরাপত্তাবোধের সংকেত
বাজার বেড়েছে কলেবরে। একই উপাদানে তৈরি হাজারো প্রসাধনী। তাই ক্রেতার আগ্রহ তৈরির বিষয়ে পাকা কথা দিতে পারছেন না ব্র্যান্ড স্পেশালিস্ট। বিউটি মার্কেটিংয়ের যুগে ক্রেতার চোখ কীভাবে পণ্যটি দেখবে, তা নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। অবিশ্বাসের অস্থির এই সময়ে তাই নির্ভরতা বাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে চিরচেনা খাবার।
ফুডি এরা
নব্বইয়ের দশকে লিপ স্ম্যাকার ব্র্যান্ডের কটন ক্যান্ডি লিপ বামের মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ রূপ নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া চালিত এক পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক আকাক্সক্ষায়। আজকের বিউটিপ্রেমীরা যেসব প্রোডাক্টে ঝুঁকছেন, সেগুলোর মধ্যে আছে বিউটি ট্রেন্ড গ্লেজড ডোনাট স্কিন, যা টিকটকে পেয়েছে বিলিয়ন ভিউ। সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মজুড়ে ডেজার্ট-প্রাণিত সুগন্ধির সার্চ গ্রোথ বেড়েছে বছরে প্রায় ২০০ শতাংশ। উদাহরণ দেওয়া যাক। স্ট্রবেরি গার্ল মেকআপের একটিমাত্র টিকটক টিউটরিয়ালই পেয়েছে ৪৫ দশমিক ১ মিলিয়ন ভিউ!
বাজারে প্রসাধনীর চাপে, অতিরিক্ত প্রোডাক্টের ভিড়ে, যখন প্রায় একই রকম কাজ করা অসংখ্য ক্রিম, সেরাম আর লিপস্টিকের ভেতর কার্যকারিতার পার্থক্য স্পষ্ট হয় না, তখন মার্কেটিং আশ্রয় নেয় অনুভূতির। অর্থাৎ, সৌন্দর্য তখন আর শুধু কার্যকারিতা নয়; হয়ে ওঠে অনুভবের বিষয়। ঠিক এখানেই খাবার সন্ধি করে সৌন্দর্যের জগতে।
টেলিভিশনের পর্দায় একটি সেরামের বোতল আর মধুর জার। দুটোই কাচের। আলো পড়লে দুটোই ঝলমল করে। পার্থক্য শুধু—মধু খাদ্যপণ্য, আর সেরাম সৌন্দর্যপণ্য। যে পুষ্টি, কোমলতা আর প্রাকৃতিক নিরাপত্তার জন্য আমরা মধুকে বিশ্বাস করি, বিজ্ঞাপন নিঃশব্দে অবচেতন মস্তিষ্ককে বোঝায়—এই সেরামেও সেই গুণ আছে। আবার, দুধের কথাই ধরা যাক। দুধ মানে মা, সুরক্ষা, পুষ্টি আর নির্ভরতা। মানুষের জীবনের প্রথম খাদ্য। বিজ্ঞাপনে যখন কোনো বিউটি প্রোডাক্টে মিল্ক টেক্সচার দেখানো হয়, মস্তিষ্ক সেটি স্বাভাবিকভাবেই নিরাপদ ও কোমল হিসেবে গ্রহণ করে। যেন পণ্যটি নিজেই বলছে, ‘আমি ক্ষতিকর নই, আরামদায়ক। তোমার ত্বক, চুলের জন্য ভালো।’ এই সূক্ষ্ম বিভ্রম ব্যবহার করেই বিজ্ঞাপন মানুষকে পণ্য কেনায় আকৃষ্ট করে।
টেক্সচার ট্রিক
ত্বক আর জিহ্বা—দুটোই স্পর্শ বোঝে। ক্রিমি, মসৃণ, গ্লসি—এই শব্দগুলো যেমন খাবারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তেমনি সৌন্দর্যপণ্যের বেলায়ও। অ্যাভোকাডোর মসৃণ স্লাইস দেখলে যেমন নরম, স্বাস্থ্যকর স্বাদের ছোঁয়া পাওয়া যায়; তেমনি টকটকে বেরি রঙের লিপ গ্লস দেখলে মস্তিষ্ক কল্পনা করে কোমল, রসাল ঠোঁট। তখন মস্তিষ্ক প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, এটা হয়তো ত্বকের জন্যও ভালো হবে; এর ঘ্রাণ নিরাপদ হবে, ত্বক পুষ্টি পাবে।
কালার কল
রংও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। ফল বা খাবারের উষ্ণ লাল, কোমল গোলাপি, মধুর মতো সোনালি রং আমাদের অবচেতন মনে মিষ্টতা, উষ্ণতা আর জীবনীশক্তির সংকেত পাঠায়। গোলাপি ফেস মাস্ক যেন গোলাপের রস; সোনালি সেরাম দৃশ্যত সূর্যের আলো মেশানো মধু হয়ে ওঠে ভোক্তার কল্পনায়।
নিউরোমার্কেটিং মিস্ট্রি
নিউরোমার্কেটিংয়ের মতে, মানুষের ক্রয় সিদ্ধান্তের বড় অংশই ঘটে অবচেতন স্তরে। ক্রিমি টেক্সচার, গ্লসি আলো, মোলায়েম রং—সব মিলিয়ে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টার সক্রিয় হয়। তখন ‘আমার এটা দরকার কি না’র বদলে মস্তিষ্ক ভাবে, ‘এটা থাকলে ভালো লাগবে।’
খাবারের ছবি মানুষের কাছে পুষ্টি আর সুস্থতার প্রতীক। এই বিশ্বাস কাজে লাগিয়ে বিউটি ব্র্যান্ডগুলো দেখায়—বেরি, মধু, অ্যাভোকাডো কিংবা বাদাম যদি শ্যাম্পু বা ক্রিমে থাকে, তাহলে ত্বক পুষ্টি পাবে। কোষ পুনরুজ্জীবিত হবে। আসলে সৌন্দর্যের মনোবিজ্ঞান মানেই আকাক্সক্ষার মনোবিজ্ঞান। খাবারের স্বাদ, টেক্সচার আর বিলাসিতার ভাষা ব্যবহার করে ব্র্যান্ডগুলো মানুষের সবচেয়ে প্রাথমিক আবেগ তথা আরাম, আনন্দ আর পুষ্টির চাহিদাকে ছুঁতে চায়। প্রাকৃতিক উপাদান দেখানো মানে ভোক্তার উদ্বেগের উত্তর দেওয়া। দূষণ, কেমিক্যাল আর অতিরিক্ত প্রসেসিংয়ের যুগে কলা, দুধ, মধু, নিম বা বেরির দৃশ্য ক্রেতাকে দেয় মানসিক প্রশান্তি। ব্র্যান্ড নিজেকে পরিচ্ছন্ন, যত্নশীল ও দায়িত্বশীল হিসেবে তুলে ধরে।
আধুনিক ক্রেতারা জানেন, বিজ্ঞাপন তাদের প্রভাবিত করছে। তবু তারা প্রভাবিত হন। কারণ, ক্রয় সিদ্ধান্তের বড় অংশ যুক্তি দিয়ে নয়; আবেগে ভর করে নেওয়া হয়। দুধ বা ফলের ভাষায় সৌন্দর্য প্রোডাক্ট উপস্থাপন করলে মস্তিষ্ক কল্পনা করে কোমল ত্বক, আরামদায়ক স্পর্শ আর নিজের জন্য একটু বিলাস। খাবার গ্রহণ, স্পর্শ আর আনন্দের অনুভূতিগুলো মানুষের নিউরনে খুব কাছাকাছি জায়গায় প্রসেস হয়। তাই যা দেখতে সুস্বাদু, তা অবচেতন মস্তিষ্কে ভোগযোগ্য হয়ে ওঠে। বিউটি প্রোডাক্ট তখন আর শুধু পরিচর্যার জিনিস থাকে না; হয়ে ওঠে কাম্য, লোভনীয়, নিজের জন্য একধরনের ট্রিট। ঠিক যেন ডেজার্ট! চকলেট গলে যাওয়া, মধুর ধীরে গড়িয়ে পড়া, হুইপড ক্রিমের নরম ঢেউ—এই দৃশ্যগুলো শুধু ক্ষুধা নয়; জাগায় আরামের আর কামনার অনুভূতি। ফুড-পর্ন কালচার থেকে নেওয়া এই ভিজ্যুয়াল ভাষাই বিউটিকে ভোগ্য করে তোলে। তখন একটি সাধারণ ক্রিম, সেরাম বা লিপবাম আর শুধু স্কিন কেয়ার নয়; হয়ে ওঠে চোখ, ত্বক আর মনের গভীরে পৌঁছানোর এক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা। রসায়নের মাধ্যমে একটি সাধারণ ক্রিম, সেরাম বা লিপস্টিক হয়ে ওঠে এক সুন্দর অভিজ্ঞতা।
নাঈমা তাসনিম
মডেল: প্রিয়ন্তী
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
