ফরহিম I বেসপোক বেসিক
একসময় প্রয়োজনমাফিক চুল কাটা, ক্লিন শেভ করা আর সামান্য সুগন্ধি প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল পুরুষের সৌন্দর্যচর্চা। এখন তা আর শুধু রুটিন নয়; আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ, নিজেকে ভালোবাসার সচেতন অভ্যাস এবং ব্যক্তিত্ব তুলে ধরার শক্তিশালী ভাষা। ফাহমিদা শিকদারের লেখায় বাকিটা
এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বেসপোক গ্রুমিং। এটি এমন ধারণা, যা গতানুগতিক তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়; বরং প্রত্যেক পুরুষের ব্যক্তিগত প্রয়োজন, জীবনধারা ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নিজস্ব একটি গ্রুমিং দর্শন।
বেসপোক গ্রুমিং
গ্রুমিং বা রূপচর্চার অভ্যাসগুলো মূলত গড়ে ওঠে পণ্যের সহজলভ্যতা আর বিজ্ঞাপনের ওপর ভিত্তি করে। বাজারে যা চলে বা অন্যরা যা ব্যবহার করেন, বেশির ভাগ ক্রেতা তা-ই বেছে নেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রত্যেক মানুষের ত্বক, চুল ও জীবনযাপন সম্পূর্ণ আলাদা। একজন খেলোয়াড় এবং একজন করপোরেট চাকরিজীবীর গ্রুমিং রুটিন এক হতে পারে না। এই বোধ থেকে বেসপোক গ্রুমিংয়ের জন্ম।
এটি এমন এক দর্শন, যেখানে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম বা চেকলিস্ট নেই। এর সূত্রপাত ঘটে আত্মপর্যবেক্ষণ দিয়ে। আপনার ত্বক কি শুষ্ক? স্ক্যাল্প অতিরিক্ত তৈলাক্ত? দিনের বেশির ভাগ সময় এসির নিচে থাকেন, নাকি রোদে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেই বেসপোক গ্রুমিং সবচেয়ে কার্যকর সমাধানটি তৈরি করে।
সাধারণ বা জেনেরিক গ্রুমিং পণ্যগুলো তৈরি হয় সর্বসাধারণের কথা মাথায় রেখে, যা অধিকাংশের জন্য চলনসই হতে পারে; কিন্তু সেরা ফল দেয় না। বেসপোক গ্রুমিং ঠিক এই জায়গায় কাজ করে। এটি শেখায় কেন একটি নির্দিষ্ট ক্লিনজার ব্যবহারে পাওয়া যেতে পারে সুফল। কেন সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে সেলফ কেয়ার কাজে দেয়। এখানে দামি ব্র্যান্ড নয়; মুখ্য হলো সঠিক পণ্য নির্বাচন, যা সময়ের সঙ্গে বদলায়। বয়স, আবহাওয়া বা কাজের চাপের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রুটিনও বদলে যায়।
ত্বকের সঙ্গে বোঝাপড়া
ভালো পোশাক বা স্টাইলিশ হেয়ারকাট—সবই ম্লান হয়ে পড়ে, যদি ত্বক ক্লান্ত বা নিষ্প্রাণ দেখায়। তাই বেসপোক গ্রুমিংয়ের প্রথম ও প্রধান ধাপ ত্বকযত্ন।
ক্লিনজিং ও এক্সফোলিয়েশন
প্রতিদিনের ধুলোবালি, ঘাম ও দূষণ রোমকূপ বন্ধ করে দেয়, যা ত্বক নিস্তেজ করে তোলে। তাই ত্বকের ধরন বুঝে মাইল্ড ক্লিনজার ব্যবহার জরুরি। অতিরিক্ত ক্ষারযুক্ত ক্লিনজার ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে, যা দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে। মাইল্ড ক্লিনজারের পাশাপাশি সপ্তাহে এক বা দুবার এক্সফোলিয়েশন বা স্ক্রাবিং প্রয়োজন। এটি মৃত কোষ সরিয়ে ত্বককে শ্বাস নিতে সাহায্য করে এবং পরবর্তী ধাপের পণ্যগুলোর কার্যকারিতা বাড়ায়।
সেরাম
বেসপোক স্কিন কেয়ারে এর ভূমিকা অপরিসীম। ময়শ্চারাইজার যেখানে ত্বকের ওপরের স্তরে কাজ করে, সেরাম সেখানে গভীরে প্রবেশ করে পুষ্টি জোগায়। ত্বকের সমস্যা ও প্রয়োজনীয়তা বুঝে এর ব্যবহার করা চাই। কিছু সাধারণ তথ্য এখানে সহায়তা করতে পারে। ভিটামিন সি নিস্তেজ ত্বকে উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখে। হায়ালুরনিক অ্যাসিড শুষ্ক ত্বকে গভীর আর্দ্রতার জন্য কাজ করে; তাতে ত্বক শুষ্কতা থেকে রক্ষা পায়। রেটিনল বয়সের ছাপ বা ক্লান্তি দূর করতে পারে। ক্লিনজিংয়ের পরে এবং ময়শ্চারাইজারের আগে সেরাম ব্যবহার ত্বকের টেক্সচারে আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
ময়শ্চারাইজার
ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং বাইরের ধুলোবালি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এটি অপরিহার্য। তৈলাক্ত ত্বকের ক্ষেত্রে জেল-বেসড এবং শুষ্ক ত্বকে ক্রিম-বেসড ময়শ্চারাইজার বেছে নেওয়া মঙ্গল। এর প্রয়োগ ছাড়া স্কিন কেয়ার আদতে অসম্পন্ন থেকে যায়।
চুল ও দাড়ির খেয়াল
চুলের যত্নে সবচেয়ে বড় ভুল হলো সবাইকে একই কাতারে ফেলা। বেসপোক গ্রুমিং অনুযায়ী, ব্যবহারকারীর চুলের ঘনত্ব, ধরন ও স্ক্যাল্পের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে রুটিন ঠিক করা উত্তম।
শ্যাম্পু ও কন্ডিশনিংয়ের ভারসাম্য
প্রতিদিন শ্যাম্পু ব্যবহারের অভ্যাস প্রাকৃতিক তেল নষ্টের মাধ্যমে চুল রুক্ষ ও ভঙ্গুর করে দেয়। যাদের স্ক্যাল্প খুব তৈলাক্ত বা যারা প্রচুর ঘামেন, তাদের ঘন ঘন শ্যাম্পু ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ২-৩ বারই যথেষ্ট। তবে মনে রাখা চাই, শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার জরুরি। এটি চুল নরম রাখে এবং জট বাঁধতে দেয় না।
হেয়ার মাস্ক ও সেরাম
চুলের রিসেট বাটন হিসেবে সপ্তাহে একবার হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করা ভালো। এটি চুলের গভীরে পুষ্টি জোগায় এবং ড্যামেজ রিপেয়ার করে। অন্যদিকে, প্রতিদিনের স্টাইলিংয়ে সহায়তা করতে এবং দূষণ থেকে বাঁচাতে ব্যবহার করা যেতে পারে হেয়ার সেরাম। এটি চুলকে ভারী না করেই ফ্রিজ-ফ্রি এবং পরিপাটি রাখে।
দাড়ির যত্ন
অগোছালো ও রুক্ষ দাড়ি আপনার পুরো লুক নষ্ট করে দিতে পারে। দাড়ির নিচের ত্বক ভালো রাখতে এবং দাড়ির উজ্জ্বলতা বাড়াতে নিয়মিত বিয়ার্ড অয়েল বা বাম ব্যবহার করা যেতে পারে। উপযুক্ত চিরুনি ও ব্রাশ দিয়ে দাড়ি আঁচড়ালে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং দাড়ি থাকে পরিপাটি।
টুলস অ্যান্ড টেকনিক
শুধু ভালো পণ্য কিনলেই হবে না; সঠিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার জানাও জরুরি। আধুনিক মাল্টি-ব্লেড রেজরের ভিড়ে শেভিংয়ের শিল্প ভুলে যাওয়ার জোগাড়! বেসপোক গ্রুমিং আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ক্ল্যাসিক শেভিংয়ের সময়ে। একটি ভালো মানের ডাবল-এজ সেফটি রেজর বা স্ট্রেট রেজর শেভিংকে কোনো যান্ত্রিক কাজ থেকে রিচুয়ালে পরিণত করে। এটি পরিবেশবান্ধব এবং ত্বকে ইরিটেশন কমায়। সঠিক ক্রিম বা সোপ ব্যবহার করে, ত্বকের ওপর চাপ না দিয়ে শেভ করার কৌশল জানলে শেভিং হয়ে ওঠে আরামদায়ক। এ ছাড়া দাড়ি বা গোঁফ মেইনটেইন করার জন্য ভালো মানের ট্রিমার ও কাঁচির ব্যবহার জানাও জরুরি।
সুগন্ধি ও সিগনেচার স্টাইল
সুগন্ধি বা ফ্র্যাগরেন্স হলো আপনার উপস্থিতির অদৃশ্য স্বাক্ষর। বেসপোক গ্রুমিংয়ে সুগন্ধি নির্বাচন ভীষণ ব্যক্তিগত একটি বিষয়। সকল সুগন্ধি সব সময় কিংবা যেকোনো পরিবেশে মানায় না। দিনের বেলা বা অফিসের জন্য হালকা সাইট্রাস, অ্যাকুয়াটিক গ্রিন নোট দীর্ঘ সময় সতেজ রাখে। অন্যদিকে, রাতের পার্টি বা বিশেষ ডেটে উদ, অ্যাম্বার বা স্পাইসি নোটের সুগন্ধি ব্যক্তিত্বে গভীরতা ও আভিজাত্য যোগ করতে সক্ষম। নিজের শরীরের সঙ্গে মানানসই একটি সিগনেচার সেন্ট খুঁজে বের করা সময়সাপেক্ষ হলেও জরুরি। কারণ, সঠিক সুগন্ধি ঘোষণা করে না; বরং আপনার উপস্থিতিকে অনুভব করায়।
গ্রুমিং যখন জীবনযাপনের অংশ
বেসপোক গ্রুমিং বা এই পার্সোনালাইজড কেয়ার কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা। যখন কোনো ব্যক্তি নিয়মিত নিজের ত্বক, চুল ও শরীরের যত্ন নেন, তা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ায় না; বরং আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। ঠিকমতো মুখ ধোয়া, চুল আঁচড়ানো কিংবা পছন্দের সুগন্ধি ব্যবহার করার মতো ছোট ছোট অভ্যাসই ধীরে ধীরে জীবনযাপনের স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়। কেউ যখন জানেন, বেস্ট লুক নিয়ে পৃথিবীর সামনে দাঁড়াচ্ছেন তিনি, তখন তার হাঁটাচলা, কথাবার্তা ও আচরণে একধরনের স্থিরতা ও আভিজাত্যের প্রকাশ ঘটে।
দিনের শেষে বেসপোক গ্রুমিং আত্মপ্রতিশ্রুতি। তাতে অন্য কাউকে অনুকরণ নিষ্প্রয়োজন। নিজেকে চেনা, চাহিদা জানা এবং সেই অনুযায়ী যত্ন নেওয়াই প্রকৃত স্টাইল। কেননা, যখন গ্রুমিংয়ের সঙ্গে আত্মসম্মান ও স্বস্তি জুড়ে যায়, তখন সেটা সত্যিকারের স্মার্টনেসে পরিণত হয়।
মডেল: সিয়াম
মেকওভার: পারসোনা মেনজ
ছবি: কৌশিক ইকবাল
