skip to Main Content

বহুরূপী I সেমাই সমাহার

বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘরে পরিচিত একটি খাবার। সাধারণত উৎসব কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে হালকা ডেজার্ট হিসেবে খাওয়া হয়। সেমাই ছাড়া ঈদের ভোজ তো জমেই না!

সেমাই। একটি প্রাচীন নুডলস-ধরনের খাদ্য। তৈরি হয় বিভিন্ন শস্য থেকে। আর প্রতিটি শস্যের সেমাইয়ের নিজস্ব স্বাদ, গঠন ও পুষ্টিগুণ আলাদা। ইতিহাস বলছে, সেমাইয়ের উৎপত্তি চীনে। প্রাচীন চীনা নুডলস থেকে রূপান্তরিত হয়ে এটি ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে ছড়িয়েছে।
কয়েকজন ইতিহাসবিদের মতে, হান সাম্রাজ্যের সময় অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ২৭০ থেকে ২০০ অব্দের মধ্যে চীনে নুডলস তৈরির কৌশল আবিষ্কৃত হয়। সে সময় চীনারা নুডলসকে বলতেন ‘মিয়ান’। মধ্যপ্রাচ্যে সেমাই নাম নিয়ে সেই মিয়ান পৌঁছেছে আরব বা পারস্যের বণিকদের মাধ্যমে। প্রাচ্যের ওই মধ্যাঞ্চলে কুনাফা বা সেমাইয়ার মতো রেসিপির মাধ্যমে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে চিকন এই নুডলস। সেখান থেকে ধীরে ধীরে খিলজি, মোগলদের হাত ধরে এই উপমহাদেশে পেয়েছে জনপ্রিয়তা। সুতরাং মূল উদ্ভাবনের দেশ চীন হলেও সেমাই বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন রূপে প্রসারিত।
গমে গাম্ভীর্য
গমের সেমাই সুপরিচিত, সূক্ষ্ম এবং হালকা হলুদাভ বা সাদা রঙের। গমের আটা থেকে তৈরি। প্রচলিত গ্লুটেনের কারণে সহজে নরম হয়ে যায়। রান্নার আগে সাধারণত গমের সেমাইকে হালকা তেলে ভেজে নরম সোনালি রং আনা হয়। এরপর দুধ, পানি, চিনি বা ঘি মিশিয়ে মিষ্টি হালুয়া, দুধের সেমাই রূপে ব্যবহারের চল রয়েছে। মূল কৌশল হলো আগে কিছুটা জ্বাল দিয়ে দুধ ঘন করে নেওয়া। এরপর ভাজা সেমাই সেই দুধে যোগ করে, ধীরে ধীরে সেদ্ধ করা। চিনি, এলাচি, কিশমিশ ও বাদাম যোগে এটি হয়ে ওঠে ক্রিমি, সুস্বাদু আর সুঘ্রাণে ভরপুর মিষ্টান্ন।
এই সেমাই দিয়ে বানানো অন্যান্য জনপ্রিয় রেসিপির মধ্যে রয়েছে সেমাই বরফি। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে উৎসব এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানে এর জনপ্রিয়তা বাড়বাড়ন্ত। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে এই সেমাই থেকে কুনাফা তৈরি করা হয়, যেখানে সেমাইকে ঘি, চিনি ও পনিরের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয় একটি ক্রিসপি ও মিষ্টি ডেজার্ট।
পুষ্টির দিক থেকে গমের সেমাই প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ। এটি শক্তি দেয় এবং শিশু ও তরুণদের জন্য হালকা খাদ্য হিসেবে আদর্শ। ঐতিহ্যগতভাবে, গমের সেমাই ঈদ, বিয়ের অনুষ্ঠান এবং সামাজিক উৎসবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্য ও লেবানিজ সংস্কৃতিতে এটি সেমাইয়া হালুয়া বা বাদামের পুর দেওয়া কুনাফা রেসিপিতে ব্যবহৃত হয়। কুনাফায় চিনির সিরা, নারকেল বা বাদাম যোগ করার চলও রয়েছে।
চালে চাতুর্য
চালের সেমাই পাতলা, স্বচ্ছ বা হালকা সাদা ও নরম। চালের আটা বা ভাত থেকে তৈরি। রান্নার সময় সাধারণত আগে হালকা ভেজে নরম করে, তারপর দুধ বা পানি দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। চালের সেমাই দিয়ে তৈরি হয় সেমাই খিচুড়ি, হালকা দুধের ডেজার্ট। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যেমন থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ায় সেমাইকে বলে ‘প্যাড থাই’। নারকেল দুধের মিষ্টি স্যুপ বা স্টার ফ্রাইড নুডলসে এজাতীয় সেমাই ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া চীনা রান্নায় চালের সেমাই দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন নুডলস স্যুপ। মালয়েশিয়ায় নারকেল দুধে তৈরি মিষ্টি স্যুপের সঙ্গে এই সেমাইয়ের ব্যবহার দেখা যায়। বিশেষত বাবুর চা চা নামক মিষ্টান্নে মিষ্টি আলু, ট্যাপিওকা ও নারকেল দুধের সঙ্গে চালের সেমাই যোগের চল রয়েছে।
বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলোতে চালের সেমাই দিয়ে তৈরি হয় হালকা দুধের ডেজার্ট। যেখানে গমের সেমাইয়ের বদলে রাইস ভার্মিসেলি ব্যবহৃত হয়। এতে ডেজার্টটি হয় আরও কোমল ও সহজপাচ্য। নারকেল দুধ, এলাচি ও সামান্য গুড় মিশিয়ে এই চালের সেমাই দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন আমাদের দেশে সেমাই পিঠা বা চুশি পিঠা নামে পরিচিত।
পুষ্টির দিক থেকে চালের সেমাই সহজে হজমযোগ্য এবং কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ। এটি শিশু ও বয়স্কদের জন্য সহজপাচ্য। ঐতিহ্যগতভাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় হালকা খাবার হিসেবে পরিবেশন করা হয় পারিবারিক ভোজ বা উপোসের দিনে। আন্তর্জাতিকভাবে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনে চালের সেমাই একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত, যা মিষ্টি ও নোনতা—উভয় রেসিপিতে ব্যবহৃত।
সয়াবিনে স্বস্তি
সয়াবিন সেমাই হালকা বাদামি বা হলুদাভ রঙের। সয়াবিনের আটা বা গুঁড়া থেকে তৈরি। রান্নার সময় প্রথমে হালকা ভেজে নরম করে, তারপর দুধ বা পানি দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। এই সেমাইয়ের প্রচলিত রেসিপির মধ্যে রয়েছে প্রোটিন সেমাই খিচুড়ি, হেলদি ডেজার্ট এবং স্বল্প চিনিযুক্ত সেমাই। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ সয়াবিন সেমাইকে ডায়েটারি স্ন্যাকস বা প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারে ব্যবহার করেন।
পুষ্টির দিক থেকে এই সেমাই প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ। এতে কার্বোহাইড্রেট কম থাকে। হজম সহজ। পশ্চিমা দেশগুলোতে সয়াবিন সেমাই প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট ও স্বাস্থ্যকর ডায়েট হিসেবে জনপ্রিয়। ঐতিহ্যগতভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় হেলদি রেসিপিগুলোতে এই সেমাইয়ের ব্যবহার শুরু হয়েছে।
বাজরায় বাজি
বাজরার সেমাই বাজরা বা পার্ল মিলেট থেকে তৈরি। এর রং হালকা বাদামি এবং তুলনামূলকভাবে রুক্ষ হলেও রান্নার পর নরম হয়ে ওঠে। রান্নার আগে হালকা তেলে ভেজে, তারপর পানি বা দুধ দিয়ে সেদ্ধ করা হয়।
এই সেমাই দিয়ে তৈরি হয় পুষ্টিকর খিচুড়ি, নারকেল ও বাদাম যুক্ত হালুয়া, যা প্রধানত উত্তর ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়। পুষ্টি দিক থেকে, এটি ফাইবার সমৃদ্ধ, লো-গ্লাইকেমিক সূচকযুক্ত এবং স্বাস্থ্যকর। ঐতিহ্যগতভাবে, ভারতের রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে বাজরার সেমাই উৎসবের সময়ে পারিবারিক ভোজে পরিবেশন করার রেওয়াজ রয়েছে। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলেও এটি স্থানীয় খাদ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত।
কর্ন ক্যারিশমা
মকাই বা ভুট্টার সেমাই হালকা হলুদাভ রঙের; ক্রিসপি ও মৃদু স্বাদের। এটি কর্নস্টার্চ বা ভুট্টার মাড় থেকে তৈরি। রান্নার আগে মকাইয়ের সেমাই হালকা ভেজে নরম করা হয়। আর ক্রিসপি রাখার জন্য একে সেদ্ধ করা হয়।
ক্রিসপি সেমাই, হেলদি স্যালাদ, হালকা ডেজার্ট তৈরি করা হয় ভুট্টার সেমাই দিয়ে। শিশুদের খাবারেও এটি জনপ্রিয়। পুষ্টির দিক থেকে, কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ এবং সহজে হজমযোগ্য। অন্যান্য পুষ্টিগুণ তেমন একটা নেই। ইউরোপ ও আমেরিকায় কর্ন সেমাই স্ন্যাকস ও ডেজার্টে ব্যবহৃত হয়। আমেরিকায় ভুট্টায় তৈরি যেকোনো খাবারই বেশ জনপ্রিয়, সে ক্ষেত্রে এই সেমাইও ব্যতিক্রম নয়।
ছোলায় সতেজ
ছোলা সেমাই গাঢ় হলুদ বা বাদামি রঙের এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ। এটি নরম হলেও গলে যায় না। রান্নার আগে হালকা ভেজে, তারপর পানি বা দুধ যোগে সেদ্ধ করা হয়। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যপণ্য দোকানে এখন চানা বা চিকপিভিত্তিক সেমাই কিংবা ভার্মিসেলি পাওয়া যায়। গ্লুটেন-ফ্রি বা হাই-প্রোটিন খাদ্যাভ্যাস অনুসরণকারীরা এগুলো বেশি ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে পরীক্ষামূলক বা ঘরোয়া পর্যায়ে চানা আটার সেমাই তৈরি হয়। ভারতে; বিশেষ করে উত্তর ভারত ও গুজরাট অঞ্চলে, যেখানে বেসনভিত্তিক নানা মিষ্টি; যেমন লাড্ডু ও হালুয়া জনপ্রিয়, সেখানে এর বেশ কদর। তবে ছোলার আটা দিয়ে নুডলস বা সেমাই ধরনের প্রস্তুতিও দেখা যায়। স্বাস্থ্যসচেতনদের মধ্যে এটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে; কারণ, এই সেমাইয়ে পুরোপুরি চানা আটা ব্যবহার করা গেলে প্রোটিন বেশি মেলে এবং গ্লুটেন কম কিংবা বলতে গেলে একদমই থাকে না।
জোয়ারে জোয়ার
জোয়ার শস্যটি প্রাচীনকাল থেকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্যসংস্কৃতির অংশ। অনেক দেশে জোয়ারকে শরগুম নামে চেনে লোকে। গ্লুটেন-ফ্রি খাদ্যাভ্যাস সম্প্রতি জনপ্রিয় হওয়ায় জোয়ারের আটা দিয়ে তৈরি সেমাই বা ভার্মিসেলি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই সেমাই সাধারণত হালকা ধূসর বা অফ হোয়াইট রঙের হয় এবং রান্নার পর এতে একটি স্বাভাবিক শস্যঘ্রাণ থাকে। এটি গ্লুটেন ফ্রি এবং তুলনামূলক নরম। হালকা ভেজে, তারপর পানি বা দুধ দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। মানে, সুজির হালুয়া কিংবা দুধের সেমাইয়ের মতো রান্নার চল রয়েছে।
এই সেমাইয়ে তৈরি পরিচিত রেসিপির মধ্যে গ্লুটেন ফ্রি ডেজার্ট, হেলদি খিচুড়ি উল্লেখযোগ্য। পুষ্টির দিক থেকে এটি ফাইবার সমৃদ্ধ, লো-গ্লাইকেমিক এবং স্বাস্থ্যকর। আন্তর্জাতিকভাবে, গ্লুটেন ফ্রি রান্নায় এবং পশ্চিমা দেশগুলোর স্বাস্থ্যসম্মত ডায়েটে জোয়ারের সেমাই বেশ জনপ্রিয়।

 ফুড ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top