skip to Main Content

ফিচার I সেফোরা কিড

জেন আলফার মেকআপ প্রেম ছাড়িয়ে গেছে সবাইকে। বাজার মাল্টি-ট্রিলিয়ন ডলার হওয়ার আভাস। সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডলে স্কিন কেয়ার স্মুদিতে বাজিমাত

দিন দিন বাড়ছে সৌন্দর্যপণ্যের কলেবর। মেকআপ থেকে স্কিন কেয়ার—নিত্যনতুন ট্রেন্ডে গা ভাসাচ্ছেন বড়রা। পিছিয়ে নেই ছোটরাও। ত্বকযত্নের সঙ্গে আইশার পরিচয় দুই বছর আগে। ১০ বছর বয়সে। মায়ের ফোনে টিকটক আর পিনটারেস্ট দেখতে দেখতে। এরপর বায়না করে অথবা জমানো টাকা দিয়ে একটি-দুটি ক্রিম কেনা শুরু; আজকাল মুখে ফেস মাস্ক, এমনকি সেরাম ব্যবহার করছে ১২ বছরের এই শিশু। মেকআপেও তার অগাধ আগ্রহ। মায়েরটা দিয়ে চলবে না; চাই নিজের প্রসাধনী। বয়স ও প্রয়োজনের আগেই ত্বকচর্চা আর প্রসাধনে অভ্যস্ত এই শিশুদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সেফোরা কিডস’।
এই তো কিছুদিন আগের কথা। সুযোগ পেলেই মায়ের ড্রেসিং টেবিল থেকে গায়েব হতো লিপস্টিক, না হয় আইলাইনার। মুখের মধ্যে চলত ইচ্ছেমতো আঁকিবুঁকি। মনে হতো যেন মায়ের মতো সেজেছি। মা ক্রিম দিলে মুখ এগিয়ে দেওয়া। অনভিজ্ঞ হাতে চুল আঁচড়ে জট পাকিয়ে ফেলা। সেই দিন ফুরিয়েছে। এখন আর মায়ের ড্রেসিং টেবিলে চোখ যায় না শিশুদের। বিশেষ করে জেন আলফাদের, যাদের বয়স বিশেষত এখন ১৩ বছর বা তারও কম। টিন ও টুইন বলা হয় তাদের। জন্ম থেকে প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় যাদের। অভ্যাসবশত স্ক্রিনে আটকে থাকে চোখগুলোও। যেখানে নানা রিলসে ঘুরে বেড়ায় স্কিনফ্লুয়েন্সার আর মেকআপ আর্টিস্টরা। শিশুদের উদ্দেশে না হলেও তাদের চোখ এড়ায় না সেগুলো। চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনে আচ্ছন্ন হয় শিশুমন। অতঃপর খেলা ছেড়ে দাঁড়ায় আয়নার সামনে। চলে অনুকরণের প্রয়াস। বারবি পুতুলের বদলে ছোট্ট মেয়েটি আবদার করে বসে রিলসে দেখা কোনো ফেস মাস্ক বা সেরামের।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক গণমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে দেখা গেছে এমনই একটি শিশুকে। রুবি হেইল। ৯ বছর বয়সী শিশুটি স্কিন কেয়ারে আসক্ত। ‘কারণ, টিকটক’, নিজেই বলে রুবি। মায়ের সঙ্গে সেফোরায় যায়। টিকটকে যা দেখে, তা-ই কিনতে চায়। রুবির মতো শিশুরা বিশ্বজুড়ে আলোচিত; আর সমালোচিত তাদের এই বিউটি অবসেশন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অহরহ দেখা মিলছে তাদের। ১২ বছর বয়সী নর্থ ওয়েস্ট, ১৩ বছর বয়সী পেনেলোপি ডিসিক, ৯ বছর বয়সী ক্যাসি কিংবা ৬ বছর বয়সী হারপার বুথের মতো চাইল্ড ইনফ্লুয়েন্সারদের অ্যাকাউন্টে ফলোয়ার সংখ্যা কোটির কাছাকাছি। সবই শিশু। ফুলপ্রুফ স্কিন কেয়ার রুটিন থেকে ফুল গ্ল্যাম মেকআপ—সবই করছে এই শিশুরা। দেখাদেখি শিখছে তাদের শিশু দর্শকেরা।
বিউটি প্রোডাক্টে অবসেসড এই শিশুদের সেফোরা কিডস ডাকায় চূড়ান্ত দোষ গিয়ে পড়ে সেফোরার ঘাড়ে! কারণ, বর্তমান বাজারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যপণ্যের রিটেইলার সেফোরা। গেল সত্তরের দশকে, যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছিল এসব পণ্যের বাজার, তখন ব্র্যান্ড ও ক্রেতার যোগাযোগ আর সম্পর্ক তৈরির কাজটি আরেকটু সহজ করার কথা ভাবছিলেন ফরাসি উদ্যোক্তা দমিনিক মানদোনুউদ। ক্রেতারা যেন সরাসরি দেখে, বুঝে-শুনে এবং ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যের মধ্যে পার্থক্য করে কিনতে পারেন, সেই প্রয়াসে নিজ শহর প্যারিসে প্রতিষ্ঠা করেন সেফোরার প্রথম আউটলেট। বর্তমানে বিশ্বের ২৯টি দেশে এর আউটলেট রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি। মাল্টিব্র্যান্ড এই প্ল্যাটফর্মে এক ছাদের নিচে পাওয়া যায় পাঁচ শতাধিক ব্র্যান্ডের পণ্য। আরবান ডিকে, হুদা বিউটি, টু ফেসড, গ্লো রেসিপির মতো জনপ্রিয় বিউটি ব্র্যান্ডগুলো একনজরে দেখে নিতে পারেন ক্রেতারা। আছে পরখ করার সুযোগ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, সেফোরায় গড়ে ৪৫ মিনিটের বেশি সময় নিয়ে কেনাকাটা করেন ক্রেতারা। এই পুরো সময় ক্রেতাকে অনন্য এক অভিজ্ঞতা উপহার দেয় সেফোরা। তবে মূল কাজ ব্র্যান্ড ও ক্রেতার সংযোগ স্থাপন। বিশ্বজুড়ে এমন বিউটি রিটেইলারের অভাব নেই। দক্ষিণ কোরিয়ায় অলিভ ইয়োং, জাপানে কসমে, যুক্তরাষ্ট্রে আলট্রা-বিউটি, চীনে হারমে, অস্ট্রেলিয়ায় মেক্কা আর বাংলাদেশে আছে বিউটিভ, সাজগোজ, লিরা ইমপোর্টসহ বেশ কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম। সব কটিতেই বিচরণ বেড়েছে শিশুদের। গ্লোবাল মার্কেটিং রিসার্চ সংস্থা নিলসনের পরিসংখ্যান বলছে, ১২ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের পরিবারগুলো ২০২৩ সালে ত্বকের যত্ন এবং মেকআপের জন্য ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা কিশোর বয়সীদের পরিবারের তুলনায় বেশি।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের পেডিয়াট্রিকস জার্নালে ১০০টি টিকটক ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা তাদের ত্বকে গড়ে ১১ ধরনের উপাদান ব্যবহার করছে, যেগুলোর প্রতিটি তাদের জন্য ক্ষতিকর। এই ভিডিওগুলো দেখছে সদ্য স্কুলে ভর্তি হওয়া শিশুরাও। কথা বলছে স্কিন কেয়ার আর বাজারে আসা নতুন প্রসাধন পণ্য নিয়ে। সব সমস্যার সমাধান ইন্টারনেটে খোঁজা শিশুরা সহজে ঝুঁকছে নিখুঁত ত্বক পাওয়ার প্রতিযোগিতায়। আয়নায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে মুখ। ছোট্ট একটি ব্রণ বা দাগেও বাড়ছে অস্থিরতা। কোনো সমস্যা না থাকলেও তৈরি হচ্ছে ‘দেখেছি তাই কিনতে হবে’ মনোভাব।
সৌন্দর্যপণ্যগুলোর রঙিন প্যাকেজিং, কৌতুকবহ বিচিত্র সব নামে আকৃষ্ট হচ্ছে শিশুরা। প্রভাবিত হচ্ছে সহজে। এটি কাজে লাগাচ্ছে ব্র্যান্ডগুলো। সেফোরায় গ্লো রেসিপি, লিনেইজের মতো ব্র্যান্ডগুলোর রঙিন সব পণ্য কিনছে টিন ও টুইনরা। এই চাহিদা মাথায় রেখে শিশুদের জন্য সেভাবেই পণ্য তৈরি করছে বেশ কিছু ব্র্যান্ড। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ড্রাংক এলিফ্যান্ট। সাধারণত ১২ বছর বয়সী এবং তার চেয়ে বড়দের জন্য স্কিন কেয়ার তৈরি করে ব্র্যান্ডটি। তবে ঘটছে উল্টো! ইন্টারনেট আর ইনফ্লুয়েন্সারদের কল্যাণে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুরাও আকৃষ্ট হচ্ছে ব্র্যান্ডটির পণ্যে। আরও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, এই ব্র্যান্ডগুলো চাইল্ড ইনফ্লুয়েন্সারদের পিআর প্যাকেজ পাঠাচ্ছে, যার হউল ভিডিও কনটেট দেখছে তাদের শিশু দর্শকেরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্কিন কেয়ার পণ্যগুলোর বেশির ভাগে রেটিনল, ভিটামিন এ, ল্যাকটিক অ্যাসিডের মতো নানা ধরনের অ্যান্টি-এজিং উপাদান থাকে, যা শিশুদের ত্বকের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। সেফোরা কিডস নিয়ে প্রকাশিত সিএনএনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে লেবানিজ ত্বক বিশেষজ্ঞ ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ডা. শিরিন ইদ্রিসের মতে, ত্বকে যে সমস্যা তৈরিই হয়নি, সেটির সমাধান কেন খুঁজতে হবে? তাই বয়সের আগে এগুলো কোনোভাবেই ব্যবহার করা যাবে না। অন্যথায় অ্যালার্জি, প্রদাহ, পুড়ে যাওয়ার মতো আরও বড় ক্ষতি হতে পারে ত্বকে। তা ছাড়া যেকোনো বয়সে স্কিন কেয়ার করতে হবে ত্বক অনুযায়ী। ত্বকের যা প্রয়োজন, তা-ই যুক্ত করা চাই রুটিনে।
অস্ট্রেলিয়ান ত্বক বিশেষজ্ঞ অ্যান হ্যালবার্টের মতে, স্কিন কেয়ার যদি করতেই হয়, তাহলে শিশুরা অয়েল-ফ্রি সানক্রিন ব্যবহার করতে পারে। টোনার ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। ত্বক শুষ্ক মনে হলে, একটি সাধারণ ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। আর দামি বা ব্র্যান্ডের হলেই যে পণ্য ভালো হবে, এমন কোনো কথা নেই।

 আবৃতি আহমেদ
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top