টেকসহি I গ্লো গিমিক
ভ্রমণের আনন্দ আর ব্যাগ গোছানোর ঝক্কি—দুইয়ের মাঝে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজের রূপচর্চার সরঞ্জাম সামলানো। শখের ড্রেসিং টেবিল তো আর সঙ্গে নেওয়া সম্ভব নয়; তাই সমাধানে ট্যুরিজম ফ্রেন্ডলিই সই
পুরো ভ্যানিটি উঠিয়ে ব্যাগে ভরে নেওয়া যাবে না; আবার প্রিয় বিউটি প্রোডাক্ট ফেলে গেলে ছবির চেহারায় ক্লান্তি ফুটে ওঠার ভয়। নারী হোক বা পুরুষ—ট্রাভেলের সময় স্কিন কেয়ার আর মেকআপ রুটিন ঠিকঠাক রাখা তাই বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যার সহজ সমাধান দিতেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ট্রাভেল-ফ্রেন্ডলি বিউটি কিট বা মিনি প্রোডাক্ট। বড় বোতলের ঝামেলা এড়িয়ে ছোট আর স্মার্ট প্যাকেজিংয়ের এসব পণ্য লাগেজ রাখবে হালকা; আর আপনাকে রাখবে সতেজ।
ট্রাভেল-ফ্রেন্ডলি প্রোডাক্ট
সহজ করে বললে, ট্রাভেল-ফ্রেন্ডলি প্রোডাক্ট হলো মেকআপ বা ত্বকযত্ন পণ্যের স্মার্ট সংস্করণ। মূলত আপনার লাগেজের কথা মাথায় রেখে তৈরি। ছোট হলেই কিন্তু ট্রাভেল-ফ্রেন্ডলি বলা যায় না; এমন পণ্যের থাকা চাই আরও কিছু গুণ।
কমপ্যাক্ট ও টেকসই প্যাকেজিং: পণ্যটির আকার হওয়া চাই হাতের তালুর সমান বা তার চেয়ে ছোট। পাশাপাশি এর কনটেইনার হতে হবে মজবুত, যেন ব্যাগের চাপে ভেঙে না যায়। এ ক্ষেত্রে প্লাস্টিক বা মেটাল বেশি ব্যবহৃত হয়।
বহুমুখী কার্যকারিতা: যে পণ্য দিয়ে আপনি দুই বা তিনটি কাজ সারতে পারেন, সেটিই সেরা। যেমন লিপ অ্যান্ড চিক টিন্টের কথাই ধরুন। এটি ঠোঁট রাঙানোর পাশাপাশি গালের ব্লাশ হিসেবেও ব্যবহার উপযোগী।
স্পিল-প্রুফ টেকনোলজি: ভ্রমণের সময় ব্যাগ নিয়ে সবচেয়ে বড় ভয় হলো লিকুইড প্রোডাক্ট লিক করা। তাই পাম্প-লক বা এয়ারটাইট ক্যাপযুক্ত কনটেইনার বেছে নেওয়া শ্রেয়।
এয়ারলাইনস স্ট্যান্ডার্ড: যদি আকাশপথে ভ্রমণ করেন, তাহলে লিকুইড বা জেলজাতীয় পণ্যের আকার অবশ্যই ১০০ মিলিলিটারের কম হওয়া চাই, যা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিয়ম (টিএসএ) অনুযায়ী অনুমোদিত।
ট্রাভেল-ফ্রেন্ডলি প্রোডাক্ট বেছে নেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ চলাচলের সুবিধা। দীর্ঘ যাত্রায় বা পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করার সময় লাগেজ যত হালকা হবে, ঘোরাঘুরির ঝক্কি তত কমবে। অন্যদিকে, পুরো বড় বোতল সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণে বের হওয়া মানেই সেটি ভেঙে যাওয়া কিংবা লিক করে নষ্ট হওয়ার বাড়তি দুশ্চিন্তা। কিন্তু ছোট ট্রাভেল কিট বা রিফিলযোগ্য কনটেইনার ব্যবহার করলে সফরের দিনগুলোতে যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকু পণ্যকেই সঙ্গী করা সম্ভব। এতে যেমন শখের প্রসাধনী অপচয় হওয়ার ভয় থাকে না; তেমনি এয়ারপোর্টে ব্যাগ চেক-ইনের সময় বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হয় না। এ ছাড়া যেকোনো সময় চটজলদি মুখ ধুয়ে সানস্ক্রিন রিঅ্যাপ্লাই কিংবা মেকআপের টাচ-আপের জন্য ছোট প্যাকেজিং দারুণ অপশন।
ট্রাভেল কেয়ার হিরো
ট্রাভেলের সময় ব্যাগ হালকা রেখে ঝক্কি কমাতে মাল্টি-ইউজ প্রোডাক্টের জুড়ি মেলা ভার। এই অলরাউন্ডারগুলো লাগেজের অনেকটা জায়গা বাঁচায়। এ ছাড়া এগুলো ভ্রমণের সময় ঝটপট টাচ-আপে বেশ কাজের। এক ঢিলে দুই পাখি মারার এই কৌশলে প্যাকিং যেমন সহজ হয়, তেমনি মেকআপ কিটও হয়ে ওঠে হালকা। ব্যাগের বোঝা না বাড়াতে চাইলে মাল্টিপারপাস প্রোডাক্টের ওপর ভরসা রাখা ভালো।
লিপ অ্যান্ড চিক টিন্ট
আলাদা করে লিপস্টিক, ব্লাশ আর আইশ্যাডো বয়ে বেড়ানোর দিন শেষ! একটি ছোট টিন্ট দিয়েই ঠোঁটে রঙের ছোঁয়া দিতে পারেন, আবার সেটি গালে হালকা ব্লেন্ড করে দিলেই চলে আসবে চমৎকার প্রাকৃতিক আভা। এমনকি চোখের পাতায় সামান্য ছুঁয়ে দিলেই তৈরি হয়ে যাবে দারুণ আইশ্যাডো। একটি নো-মেকআপ লুকের জন্য এর চেয়ে বেশি কিছুর কি দরকার আছে?
বিবি বা সিসি ক্রিম
ময়শ্চারাইজার, সানস্ক্রিন আর হালকা ফাউন্ডেশন—এই তিনের কাজ যখন একটি টিউব করে দেয়, তখন আলাদা করে তিনটি জিনিস নেওয়ার মানেই হয় না। এটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে, রোদ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং ত্বকের ছোটখাটো দাগছোপ ঢেকে এনে দেয় একদম ফ্রেশ এবং ন্যাচারাল ফিনিশ। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি লুকানোর জন্য এটিই আপনার সেরা হাতিয়ার।
অল-পারপাস বাম
এটি আপনার ট্রাভেল কিটের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মাল্টি টাস্কার। ঠোঁট ফাটা বা শুকিয়ে যাওয়া রোধ করা ছাড়াও এটি হাতের কনুই বা গোড়ালির রুক্ষতা কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। এমনকি নখের কিউটিকল অয়েলের বিকল্প হিসেবে কিংবা বাতাসের ঝাপটায় অবাধ্য হয়ে ওঠা চুল আলতো করে বসিয়ে দিতেও এর জুড়ি নেই।
মেকআপ স্টিক
ভ্রমণের সময় ব্রাশ বা বিউটি ব্লেন্ডার পরিষ্কার রাখা এবং বহন করা বেশ ঝামেলার। তাই স্টিক ফাউন্ডেশন, কনট্যুর বা হাইলাইটার স্টিক বেছে নেওয়া যেতে পারে। সরাসরি ত্বকে এগুলোর প্রলেপ দিয়ে আঙুলের ডগার সাহায্যে ব্লেন্ড করে নেওয়া যায়। ক্রিমের মতো টেক্সচার হওয়ায় এগুলো পাউডারের মতো ভেঙে যাওয়ার কিংবা ব্যাগের ভেতর ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থাকে না।
ভ্রমণের আনন্দে মেতে ওঠার আগে নিজের স্কিন কেয়ার, হেয়ার আর বডি কেয়ারের ছোটখাটো কিন্তু জরুরি জিনিসগুলোও গুছিয়ে নেওয়া চাই। ব্যাগের ওজন না বাড়িয়েও কীভাবে নিজের যত্ন নেবেন, তার জন্য চাই একদম সঠিক পণ্যের এক স্মার্ট তালিকা।
ত্বকযত্নে টুকিটাকি
ক্লিনজার ও মাইসেলার ওয়াটার: সারা দিনের ধুলোবালি পরিষ্কার করতে, ছোট ফেসওয়াশ আর মেকআপ তুলতে ট্রাভেল সাইজড মাইসেলার ওয়াটার সঙ্গে রাখা যেতে পারে।
সানস্ক্রিন স্টিক: এটি এখনকার সেরা উদ্ভাবন! হাতের স্পর্শ ছাড়াই সরাসরি মুখে ঘষে নেওয়া যায় এবং ব্যাগে খুব একটা জায়গা নেয় না।
শিট মাস্ক: সারা দিন ঘোরার পর রাতে একটি ঠান্ডা শিট মাস্কে মুখ ঢেকে শুয়ে থাকুন, ত্বকের সব ক্লান্তি নিমেষে উধাও হয়ে যাবে!
হেয়ার ও বডি কেয়ার
ড্রাই শ্যাম্পু: ট্যুরে তো আর রোজ চুল ধোয়া সম্ভব না! চুলে তাৎক্ষণিক ভলিউম আনতে আর তেলতেলে ভাব কাটাতে ড্রাই শ্যাম্পুর ওপর রাখা যেতে পারে ভরসা।
রোলার বল পারফিউম: কাচের বড় ও ভারী বোতলের বদলে ছোট রোলার বল পারফিউম বেছে নেওয়া শ্রেয়, যা হ্যান্ডব্যাগে বা পকেটে অনায়াসে রাখা যায়।
প্রো টিপস
প্যাকিং করাও একটি শিল্প! অল্প স্থানে অনেক কিছু আঁটানোর কিছু টিপস জেনে রাখা মঙ্গল।
সলিড পণ্য বেছে নেওয়া যেতে পারে। লিকুইড ফেসওয়াশ বা শ্যাম্পুর বদলে সলিড সোপ বার বা শ্যাম্পু বার ব্যবহার মঙ্গল। লিক হওয়ার ভয় একদম জিরো!
কন্টাক্ট লেন্স কেস বেশ কাজের। যদি মাত্র ১-২ দিনের ট্যুর হয়, তবে লেন্স কেসের ছোট দুটো খোপে ফাউন্ডেশন আর নাইট ক্রিম রাখুন। জায়গা বাঁচবে অনেকটুকু।
লিকুইড বোতলের ক্যাপ খোলার পর এক টুকরো প্লাস্টিক দিয়ে এর মুখ আটকে দিন, তারপর ক্যাপ লাগান। এতে কোনোভাবেই ভেতর থেকে কিছু বের হবে না।
‘যদি লাগে’ ভেবে এক গাদা জিনিস না নিয়ে নিজের স্কিন টাইপ অনুযায়ী যা প্রতিদিন প্রয়োজন, সেটুকুই নিন।
ভ্রমণের মূল সার্থকতা হলো যান্ত্রিকতা থেকে ছুটি নিয়ে নিজেকে রিচার্জ এবং নতুনভাবে আবিষ্কার করা। এই ঘোরাঘুরির আনন্দের মাঝে বিউটি ও মেকআপ রুটিনে যেন কোনোভাবেই ব্যাঘাত না ঘটে, সে জন্য একটি গোছানো আর স্মার্ট বিউটি কিট হতে পারে সেরা ট্রাভেল কমপ্যানিয়ন। এটি একদিকে যেমন লাগেজ হালকা রাখবে, অন্যদিকে যেকোনো গন্তব্যে দেবে ঝটপট তৈরি হওয়ার আত্মবিশ্বাস। তাই অহেতুক বড় বোতলের বোঝা ফেলে দিয়ে এই ছুটির দিনগুলোতে বুদ্ধিদীপ্ত প্যাকিংয়ের ওপর ভরসা রাখা যেতে পারে।
ফাহমিদা শিকদার
ছবি: ইন্টারনেট
