skip to Main Content

মনোজাল I রোদজ্বলা রূপকথা

মেকআপ গলে যায়, কাজল ছড়িয়ে পড়ে, শ্রাবস্তীর কারুকাজের মতো মুখের বিবর্ণ পরিণতি! উত্তাপে উবে যায় সাজকাহন। মনে জমে মেঘ

মায়াবী শীত নিয়েছে বিদায়। তাপমাত্রা জানান দেয়, এসে গেছে রুদ্র বৈশাখের দিন। গনগনে সূর্যের দাপটে তাপমাত্রার চোখরাঙানি। একটুখানি লিলুয়া বাতাসের খোঁজ যেন একান্ত প্রিয় মানুষটিকে একবার দেখতে পাওয়ার ব্যাকুলতার মতো। রোদের অতি বেগুনি রশ্মি থেকে ত্বক নিরাপদ রাখার এক শ এক তরিকা এখন সবারই জানা। সানস্ক্রিনের লেয়ার থেকে আমব্রেলা সেফটি—সবই রাখা হয় সেই তালিকায়। তবু কি দুশ্চিন্তা সামলানো সম্ভব?
বৈশাখের বর্ণনায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,/ তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল।’ বাংলাদেশের জন্য বৈশাখ আসলেই তা-ই। প্রচণ্ড রোদ, উচ্চ আর্দ্রতা আর বাতাসে ধুলাবালি—সব দিক থেকে যেন সর্বনাশের নীলনকশা! তার সঙ্গে যুক্তি করে হানা দেয় ঘাম, ব্রণ বা ট্যান। এ সময়ে ত্বকের প্রতিক্রিয়া খুব দ্রুত দেখা যায়। আত্মবিশ্বাসও কাউকে কাউকে বড্ড জ্বালায়। যেন গা ছমছম—কী হয়, কী হয়! কিন্তু দুয়ার আটকে বাসায় বসে থাকার জো তো নেই। রোজকার কাজে ঘরের বাহির হতেই হয়। দুশ্চিন্তা তখন সকাল-বিকেল নিয়ম করে দেয় হাজিরা। পুরো বছরের তুলনায় তাই এ সময় অনেকের চিন্তা বাড়ে ত্বক নিয়ে। ছোট ছোট বিষয়ও তখন বড় মনে হতে থাকে। কেউ বারবার আয়নায় মুখ দেখেন। মনে মনে প্রশ্ন করেন, মুখটা কি খুব ঘেমে যাচ্ছে? খুব ক্লান্ত লাগছে? নাকি আগের চেয়ে একটু বেশি কালচে দেখাচ্ছে?
গ্রীষ্মে অনেকের মনে একধরনের আগাম আশঙ্কা কাজ করে; বিশেষ করে কোনো অনুষ্ঠান, অফিস মিটিং বা উৎসবের আগে। সাজ টিকবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় সব হয়ে যেতে পারে এলোমেলো। টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় বাড়ে পণ্যের প্রলেপ। আবার কখনো সাজে হাজার রকম মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, যেখানে হারিয়ে যায় সৌন্দর্যই! অনেকে দ্রুত সমাধানের খোঁজে একসঙ্গে অনেক পণ্য ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু গরমে অতিরিক্ত পণ্য ব্যবহারে ত্বক আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে; ফলে বিরক্তি ও হতাশা বাড়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো উজ্জ্বল ত্বককে সৌন্দর্যের একটি বড় মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়। তাই গ্রীষ্মের ট্যান বা পিগমেন্টেশন অনেকের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। ফিল্টার করা ছবি বা নিখুঁত মেকআপের ছবি দেখে অনেকে নিজের ত্বকের সঙ্গে তুলনা টানতে শুরু করেন। এই অস্বস্তি অনেক সময় আচরণেও প্রভাব ফেলে। কেউ দিনের বেলায় বাইরে যেতে অনীহা, কেউ ছবি তুলতে চান না। সমস্যা বড় না হলেও নিজের ত্বক নিয়ে অতিরিক্ত সচেতনতা আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে।
গরম নিজেই শরীর ও মনের ওপর প্রভাব ফেলে। তীব্র তাপ মানুষকে সহজে ক্লান্ত বা খিটখিটে করে তুলতে পারে। তার সঙ্গে ঘাম, আঠালো অনুভূতি আর ব্রণের মতো সমস্যা যুক্ত হলে নিজের চেহারা নিয়েও বিরক্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ফলে তৈরি হয় এক চক্র; আবহাওয়া ত্বকে প্রভাব ফেলে, ত্বকের পরিবর্তন আত্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করে, আর সেই মানসিক চাপ আবার ত্বক নিয়ে বাড়তি উৎকণ্ঠার জন্ম দেয়।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সহজ উপায় ত্বকযত্ন সহজ রাখা। গ্রীষ্মে সাধারণত একটি মৃদু ফেসওয়াশ, হালকা ময়শ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিন—এই তিন ধাপই যথেষ্ট। কম পণ্য ব্যবহার করলে ত্বকের ওপর চাপও কম পড়ে। আবহাওয়া উপযোগী পণ্য বেছে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। জেলভিত্তিক ময়শ্চারাইজার, হালকা সানস্ক্রিন এবং হালকা মেকআপ গরমে ত্বককে আরাম দেয়। কিছু সহজ অভ্যাসও সাহায্য করতে পারে; যেমন অতিরিক্ত ঘামের পর মুখ ধুয়ে নেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং রোদে বের হলে ছাতা বা ছায়ার ব্যবহার ঘটানো। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে চিন্তায়। ত্বক ঋতুর সঙ্গে বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। গ্রীষ্মে ত্বক একটু বেশি তৈলাক্ত হতে পারে; রোদের কারণে উঁকি দিতে পারে ট্যানও। এই পরিবর্তনগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করলে অযথা চাপ অনেকটাই কমে আসে। আয়নায় বারবার মুখ দেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবির সঙ্গে তুলনা করার অভ্যাস কমিয়ে দিলে নিজের ত্বক ঘিরে ফিরে পাওয়া সম্ভব স্বস্তি।
গ্রীষ্মের ত্বক-উৎকণ্ঠা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না; অথচ অনেকে নীরবে এই অনুভূতির ভেতর দিয়ে যান। আবহাওয়া, জীবনযাপন আর সামাজিক প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে আমাদের ত্বক ঘিরে অনুভূতি প্রভাবিত হয়। তাই বছরের সবচেয়ে গরমের সময়ে নিখুঁত ত্বকের পেছনে দৌড়ানোর চেয়ে স্বাভাবিক পরিবর্তন মেনে নিয়ে যত্ন করাই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সৌন্দর্যচর্চা। যেখানে সুন্দরতা আর স্বস্তি পথ চলবে হাত ধরাধরি করে।

 সারাহ্ দীনা
মডেল: ফারহানা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top