ফিচার I অনুষ্ণ অধর
আভায় আচ্ছন্ন ঠোঁট; যাকে বলে আন্ডারটোন। তিন ধরনের হয়—ওয়ার্ম, নিউট্রাল ও কুল। কারসাজিটা আদতে লিপস্টিকের। পারফেক্ট আভার খোঁজে বদলে যায় লিপস্টিক ট্রেন্ডগুলো। যেমনটা ঘটছে এখন। অনেক দিন উষ্ণ ঠোঁটের পর আবারও ট্রেন্ডে ফিরেছে অনুষ্ণ, মানে কুল টোনড লিপস
লিপস্টিকের কোন শেড কেমন দেখাবে, তা নির্ভর করে ঠোঁটের স্বাভাবিক রঙের ওপর। একে বলে লিপ আন্ডারটোন। ঠোঁটের আন্ডারটোনের সঙ্গে মিলিয়ে বেছে নেওয়া যেতে পারে লিপস্টিকের পারফেক্ট শেড। বেশ কয়েকটি কৌশলে জানা যেতে পারে ঠোঁটের স্বাভাবিক আন্ডারটোন। সবচেয়ে পরিচিত উপায় ভেইন টেস্ট। কবজির কাছে ত্বকের নিচে স্পষ্ট হয়ে ওঠে রগগুলো। সেগুলো যদি সবুজ দেখায়, তাহলে ওয়ার্ম বা উষ্ণ। নীলাভ বা বেগুনি দেখালে কুল আন্ডারটোন। দুটির কোনোটিই স্পষ্ট বোঝা না গেলে নিউট্রাল আন্ডারটোন। এ ক্ষেত্রে ত্বকের সঙ্গে ঠোঁটের তারতম্য হতে পারে। তাই আন্ডারটোন বোঝা চাই ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে। স্বাভাবিক আলোতে মানানসই রং বেছে নেওয়া যেতে পারে ঠোঁটের জন্য। তবে বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ, ট্রেন্ডের বাইরে গিয়েই ট্রেন্ড তৈরি হয় বিউটি ইন্ডাস্ট্রিতে। তাই ওয়ার্ম, কুল বা নিউট্রাল—সবেতেই পরখ করা যেতে পারে চলতি যেকোনো ট্রেন্ড। কুল টোনড লিপসের ব্যাপারটাও তা-ই।
কুল দ্য লিপস
ওয়ার্ম আন্ডারটোনে পিচি পিংক, অরেঞ্জ, কোরাল ও ব্রাউনের মতো উষ্ণ হয় লিপস্টিক শেড। কুল আন্ডারটোন ঠিক উল্টো। ঠোঁটে ছড়ায় স্নিগ্ধ, অথচ শীতল আভা। গাঢ় রঙে নীলাভ আর হালকা রঙে ছাই বা সাদাটে দেখায় ঠোঁট। ম্লান নয়, আবার উজ্জ্বলও নয়। বলা যায় সাটেল। বোল্ড রঙেও সতেজ দেখায় ঠোঁট। প্রাচীন মিসরে প্রকৃতি থেকে পাওয়া রঙিন জেমস্টোন চূর্ণ করে কিংবা পোকামাকড় থেকে তৈরি হতো কুল টোনের গাঢ় শেডগুলো; বিশেষ করে নীলাভ লাল। উষ্ণ ত্বকে বেশ মানাত। ব্রিটিশ রানি প্রথম এলিজাবেথের আমলে ফ্যাশনেবল ছিল ফ্যাকাশে ত্বকের সঙ্গে লালচে শীতল ঠোঁট। গোলাপি আর বেগুনিও আধিপত্য করে কুল টোনে। সদ্য কাটা স্ট্রবেরি অথবা গোলাপের পাপড়ির মতো রোজি লিপস আর গাঢ় বেগুনি মানেই গথ স্টাইল—দুটোই প্রশংসিত আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মহলে। ভিক্টোরীয় যুগে হালকা গোলাপি ঠোঁট ছিল সুস্বাস্থ্যের প্রতীক। তা ছাড়া অন্য রকম নিষ্পাপ দেখায় টিন্ট, ব্লাশ, ব্লারি বেরির মতো রংগুলো।
গেল শতকের বিশের দশকে অত্যাধুনিক ফ্যাশনিস্তা নারীদের বলা হতো ফ্ল্যাপার। তাদের ঠোঁটে শোভা পেত ওয়াইন, ডার্ক প্লাম এবং বেরি শেডের লিপস্টিক। এর পরের কয়েক দশকে কুল টোন লিপস্টিক পরিণত হয় ফিল্ম ও গ্ল্যামার জগতের অংশে। সে সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্ন, মেরিলিন মনরো, এলিজাবেথ টেইলর, গ্রেস কেলির লাল টুকটুকে কিংবা হালকা গ্লসি গোলাপি ঠোঁটও ছিল কুল টোনের। এ ধারায় প্রথম থেকে স্পষ্ট ছিল লালের আধিপত্য। তবে ব্লু-বেসড রেড ছাড়াও কুল টোনের লালে আছে চেরি এবং রাসবেরি রেড। আশির দশকে লালের পাশাপাশি ট্রেন্ডে আসে ফুশিয়া, বাবলগাম, মভের মতো বেশ কয়েকটি গোলাপি শেড। বেগুনির মধ্যে দেখা যায় পাম, ভায়োলেট, ল্যাভেন্ডার। উদাহরণ হতে পারে ২০১৬ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের রেড কার্পেটে ঐশ্বরিয়া রাইয়ের সাজ। বোল্ড বেগুনি রঙের ঠোঁটে উপস্থিত অভিনেত্রী সে বছর আলোচনার পাশাপাশি কুড়িয়েছিলেন ব্যাপক সমালোচনাও। তবে নজর কেড়েছিলেন ঠিকঠাক। কুল টোনের বিষয়টাই এমন। ক্র্যানবেরির রঙেও তৈরি হয় কুল টোনের শেড। স্বচ্ছ বা ন্যুড কালারগুলোতে শীতল আভা স্পষ্ট হয় ঠোঁটে। দেখায় একদম এফোর্টলেস!
ইন ট্রেন্ড
সংগ্রহের নাম দ্য এভিয়ারি। বাংলায়, পক্ষিশালা। পাখি থিমের পোশাকে ভরপুর রানওয়ে। তারই মধ্যে বারবার মডেলদের চেহারায় আটকে যাচ্ছে উপস্থিত অতিথিদের চোখ। যেন নতুন কিছু দেখতে পাচ্ছেন তারা। সাজে আধিক্য নেই। নেই কমতিও। নীল আর লালের ব্যবহারে উষ্ণতা নেই। চোখ থেকে গাল বেয়ে ঠোঁটের আবহও ঠান্ডা। যেন ছড়িয়েছে শীতলতা। মার্কিন ফ্যাশন ডিজাইনার হ্যারিস রিডের এ বছরের ফ্যাশন শো যেন শুরুতে সেট করেছে কুল টোনড সাজের ট্রেন্ড। এ ধরনের সাজ সাধারণত উইন্টার শোগুলোতে দেখা গেলেও এই শো স্প্রিং ও সামার কালেকশন নিয়ে। একই চিত্র দেখা গেছে নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, মিলান, এমনকি দুবাই ফ্যাশন উইকেও। কুল টোন আবার ফিরে আসছে—বিষয়টি স্টাইলিস্ট ম্যাগাজিনকে জানান মার্কিন মেকআপ আর্টিস্ট জেনিফার অলিভার। তিনি বলেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া ফিড এবং মেকআপ ব্যাগ—দুটোই ভরপুর ছিল ব্রোঞ্জ ও উষ্ণ টেরাকোটা শেডের মেকআপ সামগ্রীতে। ২০২৫ সালে ট্রেন্ডে ছিল বেইজ ও মোকা ব্রাউন শেডগুলো। ব্রোঞ্জিং ড্রপস এবং বেস ব্রোঞ্জিংয়ের মতো টেকনিক ভাইরাল হয়েছে। তবে নতুন বছরে উষ্ণ টোনগুলোর বদলে কুল এবং অ্যাশি মেকআপ দেখা যাবে। আরও শার্প, ক্লিন এবং স্কাল্পটেড দেখাবে সাজ।
এমন লিপ মেকআপের সঙ্গে ব্রাউনের বদলে কনট্যুর হবে অ্যাশি। নব্বইয়ের দশকের সুপারমডেল গ্ল্যাম থেকে অনুপ্রাণিত কুল বেবি পিংক ব্লাশ থাকবে এ বছরের সাজে। সঙ্গে মানানসই কুল টোনড লিপস। মভ লিপ লাইনারে আউটলাইন করা ঠোঁটে শীতল রঙের কোনো লিপশেড। ছায়া খেলবে ঠোঁটে। গাঢ় থেকে হালকা, আবার হালকা থেকে গাঢ়; কখনো আবার পুরোপুরি হালকা অথবা পুরোপুরি গাঢ়।
জেনিফার অলিভারের মতে, ট্রেন্ড মোতাবেক কুল টোনড লিপ আঁকতে চাইলে সহায়ক হতে পারে একটি তোপ শেডের লিপলাইনার। এটি মূলত ভার্সাটাইল একটি রং। মিউটেড তবে ট্রেন্ডি। কুল গ্রে-বেইজের শেড। শার্প লুকের জন্য যেকোনো তোপ-বেসড লিপলাইনার দিয়ে ঠোঁটের চারপাশে ডেপথ ও কনট্যুর তৈরি করে তারপর লিপস্টিক অ্যাপ্লাই করা যেতে পারে। উষ্ণ অরেঞ্জ বা ব্রাউন শেডের পরিবর্তে কুল ও গ্রে আন্ডারটোনের যেকোনো লিপলাইনার হলেও চলবে। ব্যালেন্স করা চাই চোখের সাজের সঙ্গে। রাখা যেতে পারে ম্যাট, গ্লসি বা স্যাটিন।
ম্যাক কসমেটিকসের লাস্টারগ্লাস শিয়ার-শাইন লিপস্টিক রেঞ্জের সবচেয়ে জনপ্রিয় কুল শেড অ্যালোন টাইম এবং কুল স্পাইস। একই রেঞ্জে আছে বিশটির বেশি কুল টোনের লিপস্টিক শেড। নারস, নিক্স, ববি ব্রাউন, ল’রিয়েল, ওয়েট অ্যান্ড ওয়াইল্ডের মতো মেকআপ ব্র্যান্ডগুলোর নুড শেডের সংগ্রহেও পাওয়া যায় কুল টোন। লিপস্টিকের এই ধারায় গুরুত্বটা ঠিক ঠোঁটে নয়; বরং হাসিতে। কুল টোনের ঠোঁটের হাসিতে সাদা দেখায় দাঁত। মার্জিত ও রুচিশীল দেখায় সাজ। তবে বেছে নেওয়া চাই ত্বকের সঙ্গে মানানসই শেড। যেমন খুব ফরসা ত্বকে বেবি পিংক, কুল রোজ, মভ, সফট বেরি, ল্যাভেন্ডারের মতো শেডগুলো বেশ মানানসই। মিডিয়াম বর্ণের ত্বকে মভ, রোজ, ক্র্যানবেরি, প্লাম, কুল রেড। বোল্ড, হাই-পিগমেন্ট কুল শেড; যেমন ডিপ বেরি, ওয়াইন, প্লাম, ব্লু-বেসড রেড, রিচ ভায়োলেট মানায় বাদামি বা গাঢ় বর্ণে।
গেল বছর থেকে এই মেকআপ নিয়ে আলোচনায় মেতেছে নেট দুনিয়া। পিন্টারেস্টে কুল টোনড মেকআপ লিখে সার্চ করা বেড়েছে ৩৭৬ শতাংশ। অল্প সময়ে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে ট্রেন্ডটি।
বিউটি ডেস্ক
মডেল: আনসা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
