ফরহিম I হ্যাশট্যাগ টার্কিশ বিয়ার্ড
সোশ্যাল মিডিয়ায় হাইপড। পূর্ণ রূপে পুরুষত্ব। শিকড় পোঁতা তুরস্কে। শুধু সাধারণ দাড়ি-গোঁফ নয়, সামাজিক মর্যাদাও উপস্থিত
তুরস্কের পুরুষেরা দারুণ স্টাইলিশ। একদম টিপটপ। অভ্যস্ত বেসপোক গ্রুমিংয়ে। যাকে বলে কাস্টমাইজড স্টাইল। অর্থাৎ অন্যকে দেখে নয়; বরং নিজেকে যেমনটা মানাবে, ঠিক তেমন। নাকচ করে দেন ওয়ান-সাইজ-ফিটস-অলের ধারণা। তবে নেওয়া যেতেই পারে অনুপ্রেরণা। এ ধারায় গুরুত্ব পায় মুখের গড়ন অনুযায়ী দাড়ি ও গোঁফ রাখার স্টাইল। শেভিং কৌশলেও থাকে বিশেষত্ব। বেসপোক গ্রুমিংয়ের আওতায় নানাভাবে বিয়ার্ড স্টাইল করেন তারা।
সাকাল সিতিলে
দাড়িকে তুর্কি ভাষায় বলে ‘সাকাল’; আর ‘সিতিলে’ অর্থ ট্রিম করা। দুইয়ে মিলে ‘সাকাল সিতিলে’। তুরস্কের সংস্কৃতিতে দাড়ি পবিত্রতার প্রতীক। তাই ক্লিন শেভের পক্ষপাতী নন তুর্কি পুরুষেরা। তা দেওয়া গোঁফ আর ঘন দাড়িতে প্রকাশিত হয় তাদের পুরুষত্ব। গুরুত্ব পায় ব্যক্তিগত স্টাইল স্বাচ্ছন্দ্যও।
গোঁফ নীতি
ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশ করে ঠোঁটের ওপর ঘন ও যত্নসহকারে ট্রিম করা গোঁফ। রাজনৈতিক মতাদর্শও ঠাঁই পেয়েছে সেখানে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং তার দলের সমর্থকেরা সাধারণত এক সেন্টিমিটার গোঁফ রাখেন। অন্যদিকে, অতিরাষ্ট্রবাদী এমএইচপি দলের গ্রে উলভস সদস্যদের চেনা যায় তাদের লম্বা ঝুলে থাকা গোঁফ দিয়ে। অটোমান সাম্রাজ্যের নস্টালজিয়ায় যারা ভোগেন, তারা দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেঞ্চুরি সিরিজের সুলতান সুলেমানের মতো ঘন, লম্বা এবং ঠোঁটের দুদিকে পেঁচানো গোঁফ রাখেন। খানদানি এই স্টাইলকে বলা হয় বাকান্ট। এই পুরুষালি বৈশিষ্ট্যের একমাত্র উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছিলেন মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক। তুর্কি জাতির জনক হলেও গোঁফ রাখতেন না তিনি। প্রগতিশীল নেতা হিসেবে রক্ষণশীল অটোমান ঐতিহ্যের বিপরীতে অবস্থান ছিল তার।
ধর্ম চর্চা থেকে রাজনীতি, দাড়ি-গোঁফ গুরুত্ব পেয়েছে তুরস্কের সমাজব্যবস্থায়ও; বিশেষ করে সামাজিক পদমর্যাদা প্রকাশে। হালকা, মাঝারি, ঘন দাড়ি রাখেন তুর্কি সমাজের সব স্তরের পুরুষেরা। অভিজ্ঞ নরসুন্দরের হাতে পরিপাটি রাখেন নিয়মিত। এ কারণে ইউরোপ-আমেরিকার বেশির ভাগ দেশের তুলনায় তুরস্কে তাদের পেশা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তা স্থানান্তরিত হয়। আবার একই সেলুনে দাড়ি কাটেন এক পরিবারের সব পুরুষ। বাংলাদেশের মতো তুরস্কের বড় শহর থেকে মফস্বল এবং গ্রামের রাস্তার মোড়ে মোড়ে আছে অসংখ্য স্যালন। সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও সেসবে গোঁফ-দাড়ি ছাঁটাতে যান তুর্কি পুরুষেরা। শেষে নেন গরম তোয়ালের ভাপ ও মাসাজ। সংস্কৃতিটা এ দেশের মতোই।
রিস্ক ফ্যাক্টর
যাদের দাড়ি ঘন নয়, তারা হাঁটেন চরম পথে। তাই বেশ কয়েক বছর ধরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তুরস্কের দাড়ি ও গোঁফ প্রতিস্থাপন চিকিৎসা। ব্যাপারটি হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের মতোই। ইস্তাম্বুলের অলিগলিতে দেখা মেলে এমন অনেক সার্জারি ক্লিনিক। স্বল্প খরচে দাড়ি-গোঁফ পারফেক্ট করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তাই দেশ-বিদেশের লাখো পর্যটকের গন্তব্য হয়ে উঠছে তুরস্ক। তবে এ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি কম নয় সমালোচনাও। কারণ, এর রিস্ক ফ্যাক্টর। গত বছরের জুলাইয়ে তুরস্কে গিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ার্ড ট্রান্সপ্লান্ট করার সময় মৃত্যু হয়েছে ৩৮ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ নাগরিকের। এমন ঘটনা এড়াতে আজকাল সার্জারির পরিবর্তে প্রাকৃতিক সমাধানে জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সবচেয়ে উত্তম হলো, যেমন আছে তেমনি গ্রুম করে পরিপাটি রাখা।
#টার্কিশবিয়ার্ড
সরব সোশ্যাল মিডিয়া। সাদরে গৃহীত হচ্ছে নতুন সব। সেখানে এই টার্কিশ বিয়ার্ডও একটি। টিভি-সিরিজে দেখা, বুরাক ডেনিজ ও জন ইয়ামানের মতো প্রিয় নায়কদের স্টাইল নিয়ে চলে আলোচনা। ইস্তাম্বুলবাসীর স্টাইলে মুগ্ধ হয় বিশ্ববাসী। #বিয়ার্ডগোলস আর #টার্কিশবিয়ার্ড লেখা রিলসগুলোতে বেসপোক গ্রুমিং স্টাইলে দাড়ি ট্রিম করে দেখাচ্ছেন তুরস্কের পুরুষেরা। টিকটক জুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তেমনই একটি স্টাইল। কিছুটা শেডের মতো। গালের ওপরের দিকে এবং কানের কাছ থেকে হালকা হবে দাড়ি। গাল বেয়ে নিচের দিকে ঘন হতে থাকবে। চাপ দাড়ির মতোই, তবে গালের কাছে ভরাট নয়। হালকা থেকে গাঢ় হবে। স্টেবল, লং স্টেবল, ডাকটেইল, ভার্ডি—যেকোনো স্টাইলেই ট্রিম করা যেতে পারে এভাবে। গোঁফ হওয়া চাই মুখের সঙ্গে মানানসই। হালকা, মাঝারি কিংবা ঘন। প্রচলিত স্টাইলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো শেভরন, ল্যাম্পশেড, ওয়ালরুশ, ইংলিশ, হাঙ্গেরিয়ান ও ডালি। যাকে যেমন মানাবে, তেমনিভাবে স্টাইল করা যেতে পারে গোঁফ। নতুন কিছু ট্রাই করতেও নেই মানা।
তুর্কি পুরুষেরা সযত্নে অভ্যস্ত। ঠিক যেমনটা হওয়া চাই, তেমনই। পরিপাটি থাকার হিসাবে ছাড় দেন না একদম। সংযুক্ত এই বিশ্বে সহজে চোখে পড়ে তাদের স্টাইল চর্চাগুলো। দাড়ির ব্যাপারটাও তা-ই। ঐতিহ্যের অংশ হলেও ব্যক্তিত্ব ও আধুনিক ফ্যাশনের সমন্বয় ঘটায়।
বিউটি ডেস্ক
মডেল: জস মির্জা
মেকওভার: পারসোনা মেনজ
ছবি: জিয়া উদ্দীন
