skip to Main Content

তনুরাগ I লবঙ্গ লাবণ্য

মসলা ও মুখশুদ্ধি। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে প্রশংসিত প্রকৃতির দান। সৌন্দর্যচর্চায়ও প্রসিদ্ধ লবঙ্গের ব্যবহার

লাল টুকটুকে ফুলের ছোট্ট কুঁড়ি। গাছের নাম সিজিজিয়াম অ্যারোমেটিকাম। সহজ বাংলায়, লবঙ্গ গাছ। ফুল ঝরে গেলে বেরিয়ে আসে কুঁড়ি। শুকিয়ে বাদামি হলে তীব্র হয় সৌরভ। কৌটাবন্দী হয় মসলা হিসেবে। রান্নার স্বাদ বাড়ায়। চিবিয়ে খেলে দূর হয় মুখের দুর্গন্ধ। অজানা নয় লবঙ্গের ঔষধি গুণও। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ছোট্ট একটি লবঙ্গে একসঙ্গে ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ, সি, কে ছাড়া আছে প্রচুর ফাইবার—যা স্বাস্থ্যকর। ত্বকে ব্যবহারের তাড়না থেকে জুড়েছে সৌন্দর্যচর্চায়। যুগের পর যুগ ধরে প্রাচীন চীন, মিসর, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্যযুগীয় ইউরোপ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সৌন্দর্য সাধনায় ব্যবহৃত হয়েছে লবঙ্গ। দেশ-বিদেশের আয়ুর্বেদচর্চায় পাওয়া যায় এর উল্লেখ। খাবার থেকে ত্বকে এর গুণকে যথাযথ কাজে লাগিয়েছে মানুষ। নিয়মিত ব্যবহারের সাবান থেকে তেলে, লবঙ্গ হয়ে উঠেছে রূপ-লাবণ্যের অংশ।
উপহারের উপকার
একটি লবঙ্গ দানার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জুড়ে থাকে ইউজেনল। সুগন্ধিযুক্ত প্রাকৃতিক ওষুধ। নির্দিষ্ট মাত্রার তাপে লবঙ্গ গলিয়ে সংগ্রহ করা এই তরল ব্যবহৃত হয় অ্যান্টিসেপটিক ও অ্যানেসথেটিক হিসেবে। ব্যবহারেও আছে নির্দিষ্ট নির্দেশনা। সাধারণত প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম ইউজেনলকে নিরাপদ মাত্রা হিসেবে ধরা হয়। এটি প্রদাহরোধী। ইউজেনলযুক্ত তেল, ক্রিম বা সেরাম ত্বকের প্রদাহ কমাতে পারে। আর প্রদাহ কমে গেলে ত্বকের অনেক সমস্যাও কমে আসে। তাই লবঙ্গকে বলা হয় প্রকৃতির উপহার।
সৌন্দর্য শুচি
ত্বকের পরিচ্ছন্নতায় গুরুত্ব পেয়েছে সৌরভ এবং জীবাণুর প্রতিরোধ। লবঙ্গ দুটোতেই এক্সপার্ট। মধ্যযুগের ইউরোপে দৈহিক পরিচ্ছন্নতায় ব্যবহৃত হতো লবঙ্গের তেল। প্রতিরোধ করত জীবননাশকারী ভয়াবহ সব ইনফেকশন। ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকার সৌন্দর্য এবং শুচির ঐতিহ্যেও পাওয়া গেছে তেল বা পানিতে মিশিয়ে লবঙ্গের ব্যবহার। ভারতীয় উপমহাদেশের এ তটে উপটানজাতীয় ভেষজ প্যাকের সঙ্গে লবঙ্গের গুঁড়া মিশিয়ে ব্যবহারের প্রচলন অনেক পুরোনো। যা জানান দেয় লবঙ্গের সুগন্ধ। কমায় জীবাণুর বিচরণ।
নিরাময় ক্ষমতা
লবঙ্গের জীবাণুরোধী বৈশিষ্ট্য ব্রণের প্রবণতা কমাতে পারে। লবঙ্গের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিসেপটিক বৈশিষ্ট্য ব্রণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে। এতে ব্রণের প্রবণতা কমে আসে। লবঙ্গ তেলের ইউজেনল প্রদাহ ও লালচে ভাব কমিয়ে আনতে সক্ষম। লবঙ্গ বা ক্লোভ অয়েলের সঙ্গে যেকোনো ক্যারিয়ার অয়েল বা ময়শ্চারাইজারের সঙ্গে মিশিয়ে স্পট ট্রিটমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ১ চা-চামচ নারকেল তেলের সঙ্গে ২ থেকে ৩ ফোঁটা লবঙ্গ তেল মিশিয়ে ব্রণের দাগের ওপর প্রলেপ দিয়ে সারা রাত রেখে সকালে ধুয়ে ফেললে দ্রুত কমে যেতে পারে দাগ। শুধু ব্রণেরই নয়, এ পদ্ধতিতে শরীরের যেকোনো স্থানের দাগ দূর করা সম্ভব।
এক্সফোলিয়েশন এক্সপার্ট
ত্বকের জন্য মৃদু এক্সফোলিয়েটিং হিসেবে কাজ করতে পারে লবঙ্গের নির্যাস। ত্বকের ওপর জমে থাকা মৃত কোষ দূর করে। পরিষ্কার ও মসৃণ করে ত্বক উজ্জ্বল দেখায়। এ জন্য মাসাজ অয়েল হিসেবেও লবঙ্গ তেলের জুড়ি নেই।
বার্ধক্য প্রতিরোধ
শক্তিশালী অ্যান্টি-এজিং উপাদান হিসেবে কাজ করে লবঙ্গ। ত্বকের শিথিলতা, সূক্ষ্ম রেখা এবং বলিরেখা কমাতে সহায়তা করতে পারে। লবঙ্গ তেল ব্যবহারে ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। এতে ত্বক তারুণ্যময় ও উজ্জ্বল দেখায়। লবঙ্গের নির্যাসযুক্ত বা সাধারণ সেরাম বা ময়শ্চারাইজারের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা লবঙ্গ তেল মিশিয়ে নিয়মিত ব্যবহার করলে ত্বকের বার্ধক্য রোধ হয়। এতে বিদ্যমান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বক মসৃণ করে। কোষ পুনরুজ্জীবনে সহায়ক এবং ত্বক নিরাময়কে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম। কোলাজেন ও ইলাস্টিন বাড়ায়। বলিরেখা কমাতে সহায়ক। ফিরিয়ে আনতে পারে ত্বকের হারিয়ে যাওয়া লাবণ্য।
হাইড্রেশন হিস্ট্রি
পুষ্টিগুণে ভরপুর লবঙ্গ ত্বককে ভেতর থেকে আর্দ্র ও পুষ্ট রাখে; বিশেষ করে শীতকালে দারুণ কাজ করে লবঙ্গ তেল। ত্বক সতেজ, নরম ও মসৃণ করে তুলতে পারে।
ব্যবহারবিধি
স্কিন কেয়ার পণ্যে লবঙ্গের নির্যাস থাকতে পারে। ক্রিম বা ময়শ্চারাইজারের ইনগ্রেডিয়েন্ট তালিকায় দেখে নেওয়া শ্রেয়। যেকোনো সাধারণ তেলের সঙ্গে এক-দুই ফোঁটা ক্লোভ অয়েল মিশিয়ে ব্যবহার করলে ত্বক উপকৃত হয়। সেরাম বা এসেন্সেও থাকতে পারে লবঙ্গের উপস্থিতি। আজকাল লবঙ্গের নির্যাস দিয়ে স্কিন কেয়ার পণ্য তৈরি করছে বেশ কয়েকটি স্কিন কেয়ার ব্র্যান্ড। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো ক্লোভ, ক্লোভার ও নেক্সন বোটানিকস। ডিআইওয়াই পদ্ধতিতে ঘরে লবঙ্গ গুঁড়া করে অ্যালোভেরা জেল কিংবা মধুর সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা যেতে পারে ফেস মাস্ক ও বডি মাস্ক।
সতর্কবার্তা
লবঙ্গযুক্ত পণ্য ত্বকে ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করিয়ে নেওয়া জরুরি। অ্যালার্জি থাকলে ব্যবহার না করাই মঙ্গল। চোখের নিচে, কান ছাড়াও শরীরের সংবেদনশীল অংশে লবঙ্গ তেল ব্যবহার এড়ানো শ্রেয়। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে, কেটে গেলে কিংবা ঘায়ে ব্যবহার করলে ব্যথা বাড়ার ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত ব্যবহারে স্কিন ব্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কৃত্রিম আয়োজনে ছেয়েছে সৌন্দর্যচর্চা। তারপরও বারবার প্রকৃতিতে ফিরতে চেয়েছে মানুষ। যুগের পর যুগ ধরে তাই টিকে আছে লাবণ্যে লবঙ্গ চর্চা।

 বিউটি ডেস্ক
মডেল: ফারহানা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top