skip to Main Content

কুন্তলকাহন I কাঁকই কথন

কেশবতীমাত্রই জানেন, একটি জুতসই চিরুনির গুরুত্ব কতটা। গ্রিক মিথোলজির দেবী আফ্রোদিতিকেও বহু শিল্পকর্মে দেখা গেছে চিরুনি হাতে। আবার ছোটবেলার লালঝুঁটি কাকাতুয়াও চেয়েছিল চিরুনি আর আয়না

চিরুনি পৃথিবীর প্রাচীনতম আবিষ্কারগুলোর একটি। বাংলায় এর আরেক নাম কাঁকই—চুল আঁচড়ানোর উপকরণ। কালের ব্যবধানে প্রয়োজনের খাতিরে বেড়েছে চিরুনি ব্যবহারের পরিধি। হয়ে উঠেছে পারিপাট্যের অংশ। চিরুনির উদ্ভাবন প্রস্তর যুগে—এমনটাই ধারণা প্রত্নতাত্ত্বিকদের। আধুনিক চিরুনির প্রাচীনতম উদাহরণ পাওয়া যায় সুইডেনে। খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দে পাথর ও পশুর হাড় ছাড়াও টিন, রুপা ও তামা-দস্তার সমন্বয়ে গঠিত একধরনের ধাতু থেকে তৈরি করতেন সুইডিশরা। প্রাচীন মিসর, গ্রিস ও রোমে চিরুনি ছিল ধনীদের নিত্য অনুষঙ্গ। হাতির দাঁত, কচ্ছপের খোলস, হরিণ ও অন্যান্য গবাদিপশুর শিং দিয়ে চিরুণি তৈরি করেছেন প্রথমদিকের মানুষ। অষ্টাদশ শতাব্দীতে তৈরি বিলুপ্ত ম্যামথ প্রজাতির হাতির দাঁত দিয়ে খোদাই করা প্রাচীন চিরুনি পাওয়া গিয়েছিল পূর্ব সাইবেরিয়ায়। ব্রোঞ্জ ও লৌহ যুগে তৈরি হয়েছে সোনা, রুপা, এমনকি লোহা-তামার চিরুনি। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ১০ আউন্স খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি চিরুনিটি সে সময়ের উদ্ভাবন। বহুকাল পরে, কৃষ্ণসাগরের কাছে এক সিথিয়ান রাজার সমাধিতে পাওয়া গিয়েছিল সেটি।
দক্ষিণ এশিয়ায় অনুষঙ্গের পাশাপাশি অলংকার হিসেবেও সমাদৃত হয়েছে কাঁকই। পরিপাটি চুলে দারুণ সব কারুকার্যখচিত চিরুনি গুঁজতেন চীন, জাপান ও কোরিয়ার নারীরা। প্রকাশ পেত আভিজাত্য। নিত্য ব্যবহারের তাড়নায় আবিষ্কৃত হয়েছিল কাঠের চিরুনি। তবে দাম বেশি হওয়ায় কেনার সাধ্য ছিল শুধু ধনীদের। দ্রুতই পরিবর্তন ঘটে এই পরিস্থিতির। উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন ব্যবসায়ী দুই ভাই ইসায়াহ ও জন হায়াত আবিষ্কার করেন সস্তা এবং টেকসই প্লাস্টিক সেলুলয়েডের চিরুনি। ফলে কাঁকই চলে আসে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার নাগালে।
প্রসার প্রসঙ্গ
ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে চিরুনিও এনেছিলেন ব্রিটিশরা। সেগুলো ছিল কাঠ, পশুর হাড় ও শিং, হাতির দাঁত, কচ্ছপের খোলস আর পিতলের তৈরি। রাজা-উজিরেরা ব্যবহার করতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে কলকাতা ও ঢাকায় পশুর হাড় দিয়ে তৈরি হতো কাঁকই। সে সময় সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল জার্মানির গাটাপার্চা গাছের ডাল দিয়ে তৈরি চিরুনি। পরের শতকের শেষের দিকে জাপানে কুটিরশিল্প হিসেবে সেলুলয়েডের চিরুনি ছড়িয়ে পড়ে। একই ব্যাপার ঘটে চীন ও ইউরোপে। এই উপমহাদেশ তখন স্বদেশি আন্দোলনে সরব। সে সময় ব্রিটিশদের তৈরি চিরুনির বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন ঝিনাইদহের বাসিন্দা মন্মথনাথ ঘোষ। ১৯০৬ সালে চিরুনি বানানো শিখতে তিনি জাপানে গিয়েছিলেন। এর তিন বছর পর দেশে ফিরে নিজ শহরে স্থাপন করেন এ দেশের প্রথম কাঁকই কারখানা, ‘যশোর কম্ব, বাটন অ্যান্ড ম্যাট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড’। এর ঘোর বিরোধিতা করেছিল ব্রিটিশরা। তবু এ তটে দ্রুতই শিল্পে রূপ নেয় চিরুনি।
চিরুনি চর্চা
প্লাস্টিকের সস্তা চিরুনিতে নিত্যদিনের অভ্যস্ততা। তার মাঝে স্বভাবতই প্রকৃতিতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা মানুষের। বেশ কয়েক যুগ ধরে তাই প্রসার বেড়েছে কাঠের চিরুনির। কারণ, প্লাস্টিকের কাঁকই সহজলভ্য হলেও চুল ও মাথার ত্বকের সুস্থতার জন্য যথেষ্ট নয়। প্লাস্টিকের ধারালো দাঁতে আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে মাথার ত্বক। কেশে স্ট্যাটিক ইলেকট্রিসিটি উৎপন্ন করে প্লাস্টিকের চিরুনি। এতে চুলে জট লাগতে পারে। এসব ঝামেলা প্রতিরোধ করে কাঠের কাঁকই। প্লাস্টিক ও ধাতব চিরুনি থেকে নরম হওয়ায় এটি মাথার ত্বককে যেকোনো ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দেয়। নিম, চন্দন ছাড়াও আছে বাঁশের চিরুনি। কোন চুলে কোন কাঠের চিরুনি ভালো, এ নিয়েও আছে নানা অভিজ্ঞ মত। কেননা, কাঁকই আদতে তেলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। যেন কেশচর্চার বিশেষ অংশ। জেনে নেওয়া যাক বিভিন্ন কাঠের চিরুনি ও সেগুলোর উপকারিতা।
নিম
ভেষজ উদ্ভিদ নিম। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ভীষণ প্রশংসিত। নিমগাছের শিকড় থেকে শুরু করে পাতা, ডাল—সবই ঔষধি। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণে ভরপুর। নিম কাঠের চিরুনিও তা-ই। আছে অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য। মাথার ত্বকে জীবাণুর সংক্রমণ রোধ করে। প্রদাহ কমায়। খুশকি শুধু দূরই করে না, এর ফিরে আসাও প্রতিহত করে। চুল পরিষ্কার রাখে। মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। চুলের গোড়া উদ্দীপিত করে চুল বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তৈলাক্ত মাথার ত্বকে বিশেষ উপকারী। বেশ মজবুত ও টেকসই।
চন্দন
সুগন্ধি এই কাঠের তৈরি চিরুনি যেন আভিজাত্যের প্রতীক। চন্দন কাঠের কাঁকই দিয়ে চুল আঁচড়াতেন এই অঞ্চলের রাজা-রানিরা। চুল মসৃণ ও কোমল রাখতে এর জুড়ি নেই। মজবুত এই কাঠের চিরুনি ভীষণ টেকসই। মাথার ত্বকে স্থির বিদ্যুৎ তৈরি করে না। আঁচড়ানোর সময় চুলে সুগন্ধি ছড়ায়। সেই ঘ্রাণ টিকে থাকে অনেকটা সময়।
বাঁশ
বাঁশ হালকা ও সহজলভ্য। কাঠের চেয়ে দামে কম হলেও মানে প্রায় সমান। বেশ পরিবেশবান্ধব। কারিগরদের সুদক্ষ হাতের কৌশলে তৈরি হয় বাঁশের চিরুনি। নিখুঁত এর দাঁতগুলো। আরামে আঁচড়ানো যায় চুল। মসৃণ পৃষ্ঠের এসব কাঁকই খুব টেকসই। দেখতেও সুন্দর। দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য উপযোগী।
যত্নআত্তি
অল্প যত্নেই ভালো থাকে চিরুনি। টেকেও অনেক দিন। তবে চুল ভালো রাখতে কাঁকইয়ের যত্ন নেওয়া চাই নিয়মিত। পরিষ্কার করার জন্য পানি ব্যবহার না করে অল্প তেলে ভিজিয়ে নরম কাপড় দিয়ে আলতো মুছে নিতে পারেন। চিরুনিতে আটকে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে পুরোনো টুথব্রাশ ব্যবহার করা যেতে পারে। তা ছাড়া প্রতিবার চুল আঁচড়ানোর পর কাঁকইয়ে আটকে থাকা চুল সরিয়ে ফেললে এমনিই পরিষ্কার থাকবে।

 বিউটি ডেস্ক
মডেল: দিবা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top