skip to Main Content

নখদর্পণ I রাজত্বে রাজস্থান

সোনার বালি, রং আর কৃষ্টি মিলেমিশে আছে সেখানে। জলমহালের শান্ত রূপ, হাওয়া মহলের ঝরোখা—সব দেখা যায়। সেই রাজস্থানি নকশা এবার নখে। যা দেখে মনে পড়ে যায় পদ্মাবতীর তেজ, জয়পুরের গোলাপি রং, যোধপুরের নীল আর কালবেলিয়ার নাচ

ভারতের রাজস্থান একসময় রাজপুত রাজাদের শাসনে ছিল। রাজমহলের সেই সংস্কৃতি আজও সেখানে বিদ্যমান। নখেও তার প্রভাব মেলে। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একটি নতুন বিউটি ট্রেন্ড চোখে পড়ছে। রাজস্থানি ধাঁচের নেইল আর্ট। উজ্জ্বল রং, সূক্ষ্ম নকশা এবং ঐতিহ্যবাহী মোটিফে ভরপুর। সরাসরি মূলধারার ঐতিহ্য হিসেবে খুব বিখ্যাত না হলেও এর ডিজাইন স্টাইল বিউটি ট্রেন্ডে এখন দারুণ জনপ্রিয়।
এখানকার নকশায় তাই দেখা যাচ্ছে টাই-ডাইপ্রাণিত নকশা, রাজপুত মিনিয়েচার আর্ট। হালের মিরর ওয়ার্কও সেখানে উপস্থিত। রাজপুত মিনিয়েচার আর্টেরও দেখা মেলে। তাতে নিজস্বতার প্রতি ভালোবাসা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। দেশি অ্যাসথেটিক নামের ট্রেন্ড মিলেনিয়াল আর জেনারেশন জেডদের দেশাত্মবোধকে সুন্দরতার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে। নেইল ক্যানভাসে সুপ্রকাশিত মোটিফে ধরা দেয় রং আর সৃজনশীলতা।
রাজস্থানি নেইল আর্টের মূল অনুপ্রেরণা এসেছে রাজস্থান থেকে; যেখানে রাজাধিরাজদের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মরুভূমিকে কেন্দ্র করে জীবনযাত্রা। কারুশিল্প এবং উজ্জ্বল রং ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চল। রাজস্থানি পোশাক, গয়না কিংবা টেক্সটাইলের মতো এখানকার নেইল আর্টেও দেখা যায় গাঢ় লাল, হলুদ, সবুজ, নীল কিংবা সোনালি রঙের ব্যবহার। এই রংগুলো মরুভূমির একঘেয়ে পরিবেশের বিপরীতে মানুষের জীবনযাত্রার প্রাণবন্ততা প্রকাশ করে। এই নেইল আর্টের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সূক্ষ্ম নকশা। অনেক সময় এতে মেহেদির নকশা থেকে অনুপ্রাণিত লাইন, ছোট ফুল, পেসলি মোটিফ বা মণ্ডলাকার ডিজাইনের দেখা মেলে। সূক্ষ্ম হাতের কাজ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচা হাতে নয়, দক্ষতাতেই হতে পারে পরিপূর্ণ। রাজস্থানি টেক্সটাইলও এই নেইল আর্টে বড় প্রভাব ফেলে; বিশেষ করে টাই-ডাই ধাঁচের প্যাটার্ন বা মিরর ওয়ার্ক মোটিফ অনেক সময় নেইল ডিজাইনে থাকে উপস্থিত। ফলে নখের ছোট জায়গাটিও হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী শিল্পের এক ক্ষুদ্র ক্যানভাস।
তবে বর্তমানে যে রাজস্থানি নেইল আর্ট দেখা যাচ্ছে, তা পুরোপুরি ঐতিহ্যবাহী রূপে ফিরে আসেনি; বরং এটি একধরনের ফিউশন। আধুনিক ট্রেন্ডের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী মোটিফের মিশ্রণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সব নখে জটিল নকশা না করে একটি বা দুটি অ্যাকসেন্ট নেইলে রাজস্থানি ডিজাইন ব্যবহার। আবার অনেকে ন্যুড বা হালকা রঙের বেসে সোনালি লাইন বা মেহেদি-অনুপ্রাণিত নকশা যোগ করছেন। ফলে ডিজাইনটি একই সঙ্গে আধুনিক এবং ঐতিহ্যবাহী মনে হয়। এই ট্রেন্ডের জনপ্রিয়তার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম; বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও পিন্টারেস্ট। বিউটি কনটেন্ট ক্রিয়েটররা নিয়মিত নতুন নতুন নেইল আর্ট আইডিয়া শেয়ার করছেন। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো উৎসব বা বিয়ের সাজের সঙ্গে মিলিয়ে রাজস্থানি ধাঁচে সাজানো হচ্ছে নখ। এই ধরনের ছবি বা ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং তরুণদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করছে।
ফ্যাশন বিশ্লেষকদের মতে, তরুণেরা এখন শুধু পশ্চিমা ফ্যাশন অনুসরণ করতে চান না; বরং নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উপাদানগুলোকে আধুনিকভাবে উপস্থাপনে আগ্রহী। তাই তাদের পরনে অনেক সময় জিনসের সঙ্গে ঝুমকা কিংবা স্নিকারের সঙ্গে কুর্তার দেখা মেলে। একইভাবে নেইল আর্টেও ঐতিহ্যবাহী মোটিফ নতুনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উৎসব ও বিয়ের মৌসুমও এই ট্রেন্ডকে শক্তিশালী করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিয়ে বা উৎসবের সময় সাজগোজে ঐতিহ্যবাহী উপাদান ব্যবহার করা স্বাভাবিক বিষয়। পোশাক, গয়না বা মেকআপের পাশাপাশি এখন নেইল আর্টও সেই সাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। রাজস্থানি নকশা এ ক্ষেত্রে একটি আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।
উল্লেখযোগ্য আরেকটি বিষয় হলো, বর্তমান সময়ের অনেক তরুণ-তরুণী হাতে তৈরি বা কারুশিল্প-প্রভাবিত ডিজাইনে আগ্রহী। দ্রুত সম্পন্ন হওয়া কোনো সাধারণ নকশার চেয়ে তারা এমন কিছু পছন্দ করেন, যেখানে শিল্পীর সৃজনশীলতা ফুটে ওঠে। রাজস্থানি নেইল আর্টে সেই কারুশিল্পের অনুভূতি স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাজস্থানি নেইল আর্টের পুনরাগমন শুধু একটি বিউটি ট্রেন্ড নয়; দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রকাশও বটে। ঐতিহ্যের রং, লোকশিল্পের নকশা এবং আধুনিক ফ্যাশনের সংমিশ্রণে তৈরি এই স্টাইল দেখিয়ে দেয়, ছোট্ট একটি নখের ক্যানভাসও সংস্কৃতির গল্প বলতে পারে। বর্তমান সময়ে যখন ফ্যাশন ক্রমেই ব্যক্তিগত অভিব্যক্তির মাধ্যম হয়ে উঠছে, তখন রাজস্থানি নেইল আর্ট সেই অভিব্যক্তির এক নতুন ভাষা তৈরি করছে। যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা পাশাপাশি হাঁটে।

 বিউটি ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top