ত্বকতত্ত্ব I বং vs কে
রাজত্ব করছে কে-বিউটি। দখল করে নিচ্ছে স্কিন কেয়ারের পুরো জগৎ। অথচ ত্বকযত্নের নানা কৌশলের কমতি নেই বাংলার বিউটিতেও
আজকাল নিজেরটা রেখে পরেরটা—এই ধারাভাষ্যে চলছে বাঙালির ত্বকচর্চা। প্রভাবিত করছে বৈশ্বিক ট্রেন্ডগুলো। সৌন্দর্য সাধনায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে কোরিয়ান পন্থা ও পণ্য। পরেরটা যে মন্দ, তা নয়। তবে জানা চাই নিজেরটাও। বোঝা চাই পার্থক্য। কারণ, মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে ত্বক। আছে ভৌগোলিক প্রভাবও। আবহাওয়া, আর্দ্রতা, জীবনযাপন আর খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতাও ত্বকের গঠনে স্পষ্ট। পৃথিবীর মানচিত্রে তাই অঞ্চল, দেশ ও জাতিভেদে ত্বকের ধরন ও গড়ন ভিন্ন হয়।
সীমান্ত পাড়ি দিলেই বদলে যাওয়া সমাজব্যবস্থা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পাল্টে যায় ত্বকযত্নের উপায়গুলো। যত্নের পন্থা নির্ধারিত হয় ত্বক অনুযায়ী। অঞ্চলভেদে পাল্টে যায় কলাকৌশল; তৈরি হয় পার্থক্য। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর যে স্থানে সূর্যের তাপ বেশি, আর যে স্থানে কম—দুটি ভিন্ন জায়গায় বসবাসরতদের ত্বকের যত্ন ভিন্ন হওয়াই সমীচীন। তবু ইন্টারনেটের আশীর্বাদে সীমানা পেরোয় তথ্য। এক দেশের ত্বকযত্নের সংস্কৃতি পৌঁছে যায় অন্য দেশে। কে-বিউটিও তাই। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে কোরিয়ান স্কিন কেয়ার এখন সবার চেনা। রপ্তানি বাজারেও তারা এগিয়ে। দ্য ইকোনমির তথ্যমতে, গত বছর ২০২টি দেশে বিউটি পণ্য রপ্তানি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি আর তাদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ত্বকের মানুষের হাতে পৌঁছে দিয়েছে নিজেদের তৈরি স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট।
কে-বিউটি কোর
দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বজয় সত্য। কে-ড্রামা, সিরিজ ও সিনেমার অবিশ্বাস্য সব গল্প এবং কে-পপ গান, নাচ আর তারকাদের সৌন্দর্য—সবই মন ছুঁয়েছে বিশ্ববাসীর। দেশটির সংস্কৃতি পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। বিটিএস থেকে ব্ল্যাকপিংক, প্রিয় কোরীয় তারকাদের জীবনধারণ থেকে ফ্যাশন চর্চা, অতঃপর ত্বকযত্নও ঠাঁই পেয়েছে বৈশ্বিক আঙিনায়। সেই সূত্রে উত্থান ঘটেছে কোরিয়ান বিউটি ইন্ডাস্ট্রির। পালে যেন নতুন হাওয়া। কে-বিউটির হাত ধরে ইন্ডাস্ট্রিটি এগিয়েছে আধুনিকায়নের পথে। ঘটেছে পটপরিবর্তনও। একসময় যে স্কিন কেয়ার ছিল পশ্চিমা বিলাসিতা, সেটিকে সাধারণের জন্য সহজলভ্য করেছে দক্ষিণ কোরিয়া।
কিছুকাল আগেও প্লাস্টিক সার্জারিতে ডুবে থাকা কোরিয়া মনোনিবেশ করেছে ত্বকযত্নে। অর্থাৎ, সংশোধনের পরিবর্তে সংবরণ। বিস্তৃত এই কোরের মূল ফোকাস ত্বকের সুস্থতা। কাচের মতো মসৃণ ত্বক বা যাকে বলে ক্লিন বিউটি। নিখুঁত, আর্দ্র ও উজ্জ্বল। বিশেষ মনোযোগ স্কিন ব্যারিয়ারে। রোদ, তাপ, ময়লাসহ বাইরের সব দূষণ থেকে রক্ষা পাবে ত্বক। নিয়ন্ত্রণে থাকবে ত্বকের পিএইচ লেভেল। এই কোর চর্চার অন্যতম বিষয় মাল্টিস্টেপ স্কিন কেয়ার এবং লেয়ারিং। ক্লিনজার, টোনার, শিট মাক্স, এসেন্স, সেরাম, ময়শ্চারাইজার এবং সবশেষে সানস্ক্রিন, একটির পর একটি। আছে টেন-স্টেপ স্কিন কেয়ার মেথড। সৌন্দর্যপণ্যের এই মাল্টিভার্সে ত্বকের জন্য হার্শ উপাদানের পরিবর্তে প্রাধান্য পাবে জেন্টল ইনগ্রেডিয়েন্ট। সেন্টেলা বা সিকা, গ্রিন টি, স্নেইল মিউসিন, জিনসেং, রাইস এক্সট্যাক্ট ছাড়াও প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত নানা নির্যাস দিয়ে বানানো হয় কে-বিউটির বেশির ভাগ পণ্য। ত্বকের মৃতকোষ দূর করা বা এক্সফোলিয়েশন অপরিহার্য। সম্পূর্ণ রুটিনমাফিক। হুট করে নয়; ধীরে ধীরে। চূড়ান্ত লক্ষ্য—গ্লোয়িং গ্লাস স্কিন। অবশ্য সেখানে পৌঁছে থেমে গেলে চলবে না। যত্ন চলা চাই নিয়মিত।
বেঙ্গল বিউটি
ত্বক নিয়ে শুরু থেকে সরব ছিল বাঙালি মন। হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্যনির্ভর। প্রাকৃতিক উপাদানে ভরপুর। পরীক্ষামূলক। গুণগত মানে যা ভালো, তা-ই ত্বকে ব্যবহারের নজির আছে এ তটে। ব্যবহৃত হয়েছে প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত লতাপাতা থেকে খাদ্যদ্রব্য। সভ্যতার পর সভ্যতার বিস্তারে ত্বকযত্নে সঙ্গী হয়েছে নানা সন্ধির সমন্বয়। অভ্যস্ততা বেড়েছে পরিবেশের প্রতিকূলতার সঙ্গে মানানসই স্কিন কেয়ারে। প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত আবহাওয়া, অস্থির আর্দ্রতা, সূর্যের তাপের তীব্রতা, জীবনধারণের কৌশল এবং খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব পড়েছে কৌশলগুলোতে। গ্রীষ্মে এক রকম, আবার শীতে অন্য রকম। প্রকৃতির সঙ্গে ত্বক খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়াস।
একসময় সাবান ছিল বিলাসী পণ্য। পুকুরের নিচে জমা নরম মাটি দিয়ে ত্বক ও চুল পরিষ্কার করত এই অঞ্চলের মানুষ। অভিজ্ঞতাই ছিল ভরসা। প্রচলিত ছিল আয়ুর্বেদিক। তিন হাজার বছরের বেশি পুরোনো এই চর্চায় শরীর ও মনের সঙ্গে একযোগে গুরুত্ব পায় ত্বক। প্রাধান্যে প্রকৃতি। বাদামের তেল, লতাপাতার মিশেল, হরেক রকম মাটি ছাড়াও কত কী! উজ্জ্বলতার জন্য বাঙালির পছন্দ ভেষজ উপাদানে তৈরি ফেসপ্যাক। ত্বকের আর্দ্রতায় ব্যবহৃত হয় নারকেল, বাদাম ও জলপাইয়ের তেল। খাঁটি ঘি, মাখন আর মধু দিয়ে তৈরি হয় ক্রিম। তৈলাক্ততা রোধ করে মুলতানি মাটি। রোদে পোড়া ভাব কমায় হলুদ ও চন্দনের গুঁড়া। প্রদাহ কমায় ঘৃতকুমারীর রস। ব্রণ বা ইনফেকশনে নিম, চিরতা ও তুলসীপাতা। সৌন্দর্যচর্চায় স্বমহিমায় দুধ। বিয়ের আগে দুধ দিয়ে বর-কনের স্নান করার রেওয়াজ আছে এ তটে। করা হয় গায়েহলুদের আয়োজন। স্নানের আগে তেল মালিশ এবং কিছুক্ষণ রোদে বসার প্রথাও বেশ পুরোনো। ধারণা করা হয়, এতে ভিটামিন ডি-এর চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ত্বক মসৃণ হওয়ার সঙ্গে শক্তি পায় হাড়গুলো। উজ্জ্বলতা বাড়ানোর জন্য জনপ্রিয় হলুদ, বেসন, দুধ এবং ভেষজ তেল মিশ্রিত উপটান।
মোগল আমল থেকে পাওয়া চর্চাগুলোও বাদ যায় না বাঙালির স্কিন কেয়ার থেকে। গোলাপ ও জাফরানের জলে মুখ ধোয়া; সুগন্ধিযুক্ত তেল, আতরের ব্যবহার বিরাজমান এখনো। সময়ের সঙ্গে আধুনিকায়নের বোতলে বন্দী হয়েছে প্রাচীন ও প্রচলিত পন্থাগুলো। উপকরণ ঠিক রেখে ব্যবহারকে করা হয়েছে ফলপ্রসূ। বিদেশি বিউটি পণ্যের চেয়ে অনেকটাই সুলভ মূল্যে কেনা যায় এসব দেশি পণ্য।
কে-বিউটি ইন্ডাস্ট্রি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। দারুণ ট্রেন্ডি। নিত্যনতুন পণ্যে ভরপুর। ভীষণ বাণিজ্যিক। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রশংসিত। অন্যদিকে বাঙালির ত্বকযত্ন ঐতিহ্যনির্ভর। প্যাকেজিংয়ে পরিবর্তন আসতে পারে; কিন্তু কৌশলগুলো পুরোনো। নানি থেকে মা, মা থেকে মেয়ে—প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া। কে-বিউটির মতো জটিল নয়। নেই মাল্টিস্টেপ স্কিন কেয়ার রুটিন। খরচও তাই পকেট-ফ্রেন্ডলি। যদিও আজকাল আন্তর্জাতিক আয়োজনে কাজ করছে কে-বিউটি, তবু ভৌগোলিক বাস্তবতা এড়ানো কঠিন। দুয়ের মাঝে আসতে পারে বিভ্রান্তি। ত্বক বুঝে দুটোই হতে পারে সঙ্গী।
আবৃতি আহমেদ
মডেল: তাজরিয়ান
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
