পাতে পরিমিতি I হরমোন বেজড ডায়েট
অনেক সময় আমরা যত কম খাবারই খাই না কেন, সহজে ওজন কমতে চায় না; আবার অনেকে বেশি খাবার খাওয়ার পরও ওজন ততটা বাড়ে না। আসলে সমস্যা ক্যালরিতে নয়; বরং আমাদের শরীরে রয়েছে এমন এক নিয়ন্ত্রক, যার কারণে আমরা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি প্রতিদিন। একে বলে ‘হরমোন’। সে অনুযায়ী সঠিক খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশি
আমাদের দেহে বিভিন্ন ধরনের হরমোন নানা রকম কাজ করে। কোনো হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে দেহে কত দ্রুত মেটাবলিজম চলবে, কোনোটি আবার ঠিক করে দেয় শরীরে চর্বি জমার স্থান। আবার হরমোনই ক্ষুধা লাগলে আমাদের অনুভূতি জোগায়, এমনকি ঘুম নিয়ন্ত্রণেও কাজ করে। হরমোনের যেকোনো বিষয় নিয়ে ডায়েট মেইনটেইন করতে মানা হয় হরমোন-বেজড ডায়েট। এ ক্ষেত্রে শুধু খাওয়া কমাতে হয়, তা নয়; বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এই ডায়েট।
ইনসুলিন
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি খুব কমন শব্দ। ইনসুলিন প্যানক্রিয়াস থেকে নিঃসৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। এর ঘাটতি বা কার্যকারিতা কমে গেলে শরীরে বাসা বাঁধে ডায়াবেটিস। খাবার গ্রহণের পর রক্তে ইনসুলিনের অভাবেই মূলত চিনির আধিক্য দেখা দেয় ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে। বারবার বেশি চিনি বা রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট খেলে ইনসুলিনের ওপর চাপ বাড়ে এবং ধীরে ধীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে খাদ্যতালিকায় রাখা চাই লাল চাল বা আংশিক ব্রাউন রাইস, ওটস, ডাল, ছোলা, মাছ, ডিম, গোটা ফল, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ইত্যাদি।
হরমোন ফ্রেন্ডলি ডায়েটে একজন ডায়াবেটিস রোগীর বাদ দেওয়া চাই কিছু খাবার; যেমন কোল্ড ড্রিংকস, হোয়াইট ব্রেড বিশেষ করে ময়দা, অতিরিক্ত পলিশড রাইস, মাটির নিচে উৎপাদিত সবজি অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ ইত্যাদি। অন্যদিকে, ব্যালেন্সড লাইফস্টাইল, পরিমিত ও সময় অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ এবং হালকা শরীরচর্চা ইত্যাদি প্রতিদিনের ইনসুলিন ব্যালেন্সের প্রধান রুটিন। এই হরমোন নিয়ন্ত্রণে আরও কিছু পরামর্শ মেনে চলা শ্রেয়।
শুধু কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার গ্রহণ না করে, এর সঙ্গে প্রোটিন বা ফাইবার রাখা চাই। যেমন সবজি খিচুড়ি কিংবা লো ফ্যাট মিল্ক বা ইয়োগার্ট খেতে পারেন ওটস যোগে। এতে সুগার স্পাইক হওয়ার ঝুঁকি কম।
ডায়াবেটিস রোগীর দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা যেন একরকম শাস্তি। যখনই আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার গ্যাপ হয়, তখনই সুগার নামতে শুরু করে দেয়; আর হঠাৎ করে দেখা দিতে পারে হাইপোগ্লাইসেমিয়া। ব্যালেন্স লাইফস্টাইলের মাধ্যমেই এমন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ডায়াবেটিস রোগীদের কেউ কেউ রাতে বেশ ভারী খাবার গ্রহণ করেন। ফলে তাদের মর্নিং ব্লাড গ্লুকোজ বাড়তি থাকে। তাই এমন রোগীদের ডিনার হালকা হওয়াই মঙ্গল।
গ্রেলিন ও লেপটিন
এদের বলে ক্ষুধার হরমোন। অনেক সময় আমরা যতই খাই না কেন, যেন পেট ভরে না! বারবার ক্ষুধা লাগে। আসলে এই অনুভূতির পেছনে কলকাঠি নাড়ে গ্রেলিন নামক হরমোন। আর খাওয়ার পর পেট ভরেছে কি না, মস্তিষ্কে সেই সংকেত পাঠানোর হরমোনটির নাম লেপটিন। তবে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, সারা দিনের চাহিদার তুলনায় অনেক কম পরিমাণে প্রোটিন গ্রহণ করা, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারকে খাদ্যতালিকার শীর্ষে জায়গা দেওয়া ইত্যাদি কারণে এই দুই হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। ডায়েটে কিছু খাবার অন্তর্ভুক্ত করা গেলে এই ভারসাম্য রক্ষা অনেকটা সহজ হয়।
সকালের নাশতা হওয়া চাই প্রোটিন সমৃদ্ধ। এ ক্ষেত্রে ডিম বা ডাল রাখা জরুরি। তবে যারা গতানুগতিক ডায়েটের বাইরে ব্রেকফাস্ট করতে চান, তারা প্রোটিনের সোর্স হিসেবে ইয়োগার্ট বেছে নিতে পারেন।
উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘ সময় আমাদের পেটে থাকে; সে ক্ষেত্রে সারা দিনের খাদ্যতালিকায় যথেষ্ট পরিমাণে ফাইবারের নিশ্চয়তা গ্রেলিন ও লেপটিনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক।
স্ন্যাকস হিসেবে হলেও সিডস ও নাটস যুক্ত করা চাই প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায়। এতে বারবার ক্ষুধা লাগার সমস্যার অনেকটাই সমাধান ঘটে।
পর্যাপ্ত পানি পান শুধু ডিহাইড্রেশন দূরীকরণে নয়; দীর্ঘ সময় পেট খালি থাকলে যে অ্যাসিডিটি তৈরি হয়, তার পাশাপাশি ক্ষুধার অনুভূতি কমাতেও ভূমিকা রাখে।
শুধু খাবার গ্রহণই নয়, বাদ দেওয়া চাই এমন অপ্রয়োজনীয় খাবারও, যা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। অতিরিক্ত সুগার কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে কম ক্যালরি গ্রহণ করা অথবা ক্রাশ ডায়েট বা শুধুই কার্বোহাইড্রেট ব্রেকফাস্ট যেমন সকালে কেবল পাউরুটি খাওয়া ইত্যাদি অভ্যাসের পাশাপাশি রাতে খুব কম ঘুমানোর কারণেও এ ধরনের হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ঘটতে পারে। এই হরমোন ব্যালেন্সের জন্য কিছু পরামর্শ মানা যেতে পারে।
সকালের পাতে প্রোটিন থাকলে সারা দিন ক্ষুধা কম লাগে; তাই ব্রেড খেলে ব্রাউন ব্রেড বেছে নেওয়া উত্তম, সঙ্গে থাকুক ডিমও।
৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমাতে পারলে লেপটিন সেনসিটিভিটি বাড়ে। তাই প্রয়োজন ছাড়া রাত না জাগার চেষ্টা করা মঙ্গল।
ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাবার গ্রহণ করা শ্রেয়। যে খাবার গ্রহণ করছেন, তা শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—এই বার্তা সঠিকভাবে পাঠের জন্য নিজের মস্তিষ্ককে সময় দেওয়া চাই।
কর্টিসল
এটি স্ট্রেস হরমোন। দীর্ঘদিন ধরে কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকলে আমাদের স্বাভাবিক মেজাজ হয়ে পড়ে খিটখিটে; সুগার ক্রেভিং বেড়ে গিয়ে পেটের মেদ ও ঘুমের সমস্যার উদ্রেক ঘটে। এই হরমোন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক খাবারের তালিকার শীর্ষে রয়েছে কলা। এটি নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর। প্রতিদিন একটি এই সুপার ফুড খাওয়া যেতে পারে স্ট্রেস কমানোর জন্য। তা ছাড়া ইভনিং স্ন্যাকস হিসেবে খেতে পারেন এক মুঠো বাদাম। কয়েক ধরনের বাদাম মিক্সড করে স্যালাদের সঙ্গেও গ্রহণ করতে পারেন এ সময়ে। তাতে ওজন নিয়ন্ত্রণে এবং মেজাজ ফুরফুরে থাকার সম্ভাবনা বাড়বে। এ ছাড়া ডার্ক চকলেট, গ্রিন টি, ম্যাগনেশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার; যেমন শাক, ডাল ইত্যাদিও কর্টিসল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও মাত্রাতিরিক্ত সুগার গ্রহণ, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা কিংবা রাত জাগা এবং এর পাশাপাশি ভারী খাবার গ্রহণ করাও কর্টিসল অনিয়ন্ত্রণে নাড়তে পারে কলকাঠি। তাই এসব খাদ্যাভ্যাস ও জীবনচর্চা বর্জনই মঙ্গল।
এই সমস্যার সমাধানে প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটার চেষ্টা করা শ্রেয়; সঙ্গে স্ক্রিন টাইম কমিয়ে, শান্তিপূর্ণ ঘুমের মাধ্যমে শরীরকে করে ফেলতে পারেন প্রশান্ত।
ইমোশনাল ইটিংয়ের অভ্যাস থাকলে প্রতিদিন সকালে বা রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত ১০ মিনিট মেডিটেশন করা ভালো।
থাইরয়েড
আমাদের মেটাবলিজম কন্ট্রোলে কাজ করে এই হরমোন। খুব কম খাবার গ্রহণের পরেও ওজন বেশি হওয়ার কিংবা বেশি খাবার গ্রহণের পরও ওজন না বাড়ার সমস্যায় যারা ভোগেন, তারা আসলে থাইরয়েডের শিকার! সত্যি বলতে, আমাদের দেহে থাকা এই হরমোনই ওজনসংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণ করে। এর ভারসাম্য বজায় রাখতে আয়োডিনযুক্ত লবণ, ডিম, দুধ ও দইয়ের পাশাপাশি সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ খাবার; যেমন নাটস, সামুদ্রিক মাছ এবং জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার; যেমন ডাল, সিডস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে খাদ্যতালিকায়। তবে গয়ট্রোজেনিক ফুড হিসেবে বাঁধাকপি, ফুলকপি, সয়াবিনজাত খাবারগুলো কম গ্রহণই মঙ্গল। খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ, পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম, নিয়মিত কার্ডিও বা হালকা ব্যায়াম বেশ জরুরি।
হরমোনের কাজগুলো খুব সূক্ষ্ম হয়ে থাকে। মুহূর্তেই সরাসরি কোনো উপসর্গ দেখায় না; বরং দীর্ঘ সময় অনেকটা নীরবে পাড়ি দিয়ে আচমকাই খুব জটিল রূপ ধারণ করে। তাই মানসিক বা শারীরিক যেকোনো পরিবর্তন দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। হরমোন-বেজড ডায়েটগুলো এ ধরনের সমস্যার সমাধানে কাজ করে সত্যি; তবে খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে কী ধরনের হরমোন কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা চাই, তা নিশ্চিত হতে পুষ্টিবিদের দ্বারস্থ হওয়া শ্রেয়।
লেখক: প্রধান পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
ছবি: ইন্টারনেট
