skip to Main Content

অ্যাডভার্টোরিয়াল I ল্যাব থেকে শ্রেণিকক্ষে : একজন শিক্ষা-উদ্ভাবকের রূপান্তরের গল্প

‘শিক্ষা কোনো বিশেষাধিকার হওয়া উচিত নয়, এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার।’
— লিসা সাহা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে আধুনিক ও অনুসন্ধানভিত্তিক ধারায় রূপান্তর করতে যারা কাজ করছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ব্রিটিশ কলাম্বিয়া স্কুলের প্রিন্সিপাল ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর লিসা সাহা। তার মিশন শিক্ষাকে ফলাফলকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা থেকে বের করে এনে চিন্তার স্বাধীনতা, সহমর্মিতা এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পথে এগিয়ে নেওয়া।
তার যাত্রা শুরু শ্রেণিকক্ষে নয়; ল্যাবরেটরি থেকে। ইউনিভার্সিটি অব আমস্টারডাম থেকে মেডিকেল বায়োলজিতে মাস্টার্স এবং যুক্তরাজ্যের কোভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি থেকে বায়োমেডিকেল সায়েন্সে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি কাজ করেছেন কুইন এলিজাবেথ হাসপাতাল বার্মিংহাম ও ব্রিটিশ প্রেগন্যান্সি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ক্লিনিক্যাল পরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় তার নতুন মিশন—বাংলাদেশের শিশুরা যদি প্রশ্ন করতে এবং তথ্য বিশ্লেষণ করতে না শেখে তবে তারা আধুনিক বিশ্বের জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হবে কীভাবে?
মুখস্থনির্ভরতা থেকে অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা
দেশে ফিরে তিনি দেখলেন, শিক্ষার মূলধারা এখনো ‘মুখস্থ করো, পাস করো’ মানসিকতায় আবদ্ধ। নীরব শ্রেণিকক্ষকে দক্ষ শিক্ষার প্রতীক মনে করা হয়। এই গভীর সাংস্কৃতিক আসক্তি ভাঙাই ছিল তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ! কিন্তু তিনি শুধু সিলেবাস বদলেই থেমে থাকেননি; বদলেছেন মানসিকতা। অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করেছেন ‘ওপেন ডে’ ও কাউন্সেলিং কর্মশালায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিক্ষার্থী যখন প্রশ্ন করতে শেখে, সে বৈশ্বিক মূল্যায়নেও সফল হয়; কারণ, সে উত্তরের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের পেছনের যুক্তিও বোঝে।
শিক্ষা নিয়ে তার বিভিন্ন ব্যতিক্রমী কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘নাসা ডে’ আয়োজন করা। এই ধরনের আয়োজন চাপমুক্ত শিক্ষা ও বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক কৌতূহল তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের একধাপ এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা
মিস লিসা সাহার কাজের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো নিউরো-ইনক্লুসিভ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি দৃঢ় অবস্থান। এডিএইচডি, ডিসলেক্সিয়া কিংবা সেরিব্রাল পালসির মতো শেখার পার্থক্যকে তিনি সীমাবদ্ধতা নয়; স্বকীয় শক্তি হিসেবে দেখেন। তার ভাষায়, ‘একটি জাতির অগ্রগতি বোঝা যায়, সে তার ভিন্নধর্মী শিক্ষার্থীদের কতটা ক্ষমতায়ন করতে পারে, সেটির ওপর।’
এই দর্শনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছে একাধিকবার। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গ্লোবাল এডুকেশন লিডার অব দ্য ইয়ার’ এবং যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসে ‘ইনোভেটর ইন কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট’ সম্মান প্রাপ্তি তার কাজকে বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শিক্ষায় তার অনন্য অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটি তাকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব ফিলোসফি ইন এডুকেশন (অনারারি)’ উপাধিতে সম্মানিত করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের পাশাপাশি সমাজে সক্রিয় ভূমিকার জন্য তিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কায় ‘শি ফর দ্য নেশন’ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
গত এক বছরের মাইলফলক
২০২৫ সাল ছিল তার যাত্রার এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। সে বছর তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে ভূষিত হন, যা তার নেতৃত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষাক্ষেত্রে উদ্ভাবনী অবদানের বৈশ্বিক স্বীকৃতি বহন করে। উল্লিখিত তিনটি সম্মাননার পাশাপাশি তিনি ‘আউটস্ট্যান্ডিং মেন্টর অব দ্য ইয়ার’ এবং ‘গ্লোবাল আইকন অব দ্য ইয়ার ইন এডুকেশন’ সম্মাননা অর্জন করেন।
ডিসেম্বর ২০২৫-এ উদ্বোধন করা হয় ব্রিটিশ কলাম্বিয়া স্কুলের নতুন জুনিয়র ক্যাম্পাস, যা তার শিক্ষাদর্শের এক বাস্তব ও দৃশ্যমান রূপ। এটি শুধু একটি ভবন নয়; বরং এমন সযত্নে নির্মিত পরিবেশ, যেখানে প্রারম্ভিক শৈশব শিক্ষায় খেলাধুলাভিত্তিক শেখা, মানসিক সুস্থতা ও স্বাভাবিক কৌতূহলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এখানে শিশুরা চাপ নয়; আনন্দ ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাদের শিক্ষার যাত্রা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে প্রথমবার ‘নাসা ডে’ উদ্‌যাপনের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতায় রোবোটিকস কর্মশালা ও ইউনিভার্সিটি পাথওয়ে প্রোগ্রাম আয়োজন করা হয়।
শিক্ষা: পেশা নয়, ভবিষ্যৎ গড়ার অবিরাম প্রয়াস
মিস লিসা সাহার কাছে শিক্ষা কোনো পেশা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক চলমান অঙ্গীকার। তার স্বপ্ন একটি প্রতিষ্ঠানের সীমানা ছাড়িয়ে শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় পুনঃজাগরণ, যেখানে বাংলাদেশ বৈশ্বিক শিক্ষা-চিন্তার সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠবে।
তিনি বিশ্বাস করেন, শুধু ডিগ্রি নয়; প্রয়োজন যুক্তিনির্ভর চিন্তা, সৃজনশীল সমস্যা সমাধান এবং আত্মবিশ্বাস। নিউরো-ইনক্লুসিভ শিক্ষাব্যবস্থাকে তিনি ভবিষ্যতের ভিত্তি হিসেবে দেখেন, যেখানে ‘স্পেশাল নিডস’ কোনো সীমাবদ্ধতা নয়; বরং সম্ভাবনার ভিন্ন রূপ। পাশাপাশি ‘স্টেম’ শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে নারী ক্ষমতায়নেও তিনি কাজ করছেন।
ল্যাবরেটরির নির্ভুলতা থেকে শ্রেণিকক্ষের মানবিকতায় তার এই যাত্রা দেখিয়েছে, শিক্ষা কেবল ফলাফল অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি চিন্তার স্বাধীনতা, চরিত্রের দৃঢ়তা এবং নেতৃত্বের বীজ রোপণের প্রক্রিয়া।
তার বিশ্বাস গভীর ও স্পষ্ট—‘প্রত্যেক শিশু, তার শেখার ধরন যেমনই হোক, সম্ভাবনায় পূর্ণ। সঠিক পরিবেশ পেলে সে শুধু পরীক্ষায় নয়; বিশ্বমঞ্চেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড়াতে পারে।’

লেখা ও ছবি: সংগ্রহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top