ছুটিরঘণ্টা I টুইন সিটি ট্রিপ
সৌদি আরবের পথে-প্রান্তরে, আলো-হাওয়ায় ছড়ানো ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের নানাভাবে আকৃষ্ট করে। বিশেষত মুসলমানদের কাছে দেশটির রয়েছে আলাদা আকর্ষণ। জেদ্দা শহর আর লোহিত সাগরের পাড় ঘুরে এসে লিখেছেন আশিক মুস্তাফা
আল-মুশরিফায় যে বাড়িতে উঠেছি, তার সামনের লনে মেঘের টুকরোর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি মা বিড়াল। তার পিছু যেন তিন খণ্ড মেঘ! ছোট্টমোট্ট মেঘের টুকরোগুলো মা বিড়ালের লেজ ধরতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাদের ‘মিঁউ মিঁউ’ আর ‘হিস হিস’ শব্দে হাজার বছর আগের এই আরবেরই এক গল্প মনে পড়ে গেল। তখন থেকে আরবরা ছিল বিড়ালপ্রেমী। এমনকি ইসলাম এসেও এই বিড়ালকে খুব আপন করে নিয়েছে। প্রিয় নবীজির সময়ে এক সাহাবি বিড়াল পুষতেন এবং সব সময় বিড়ালছানা সঙ্গে নিয়ে চলতেন। একদিন তিনি তার জামার আস্তিনে একটি বিড়ালছানা নিয়ে প্রিয় নবীজির সামনে উপস্থিত হলেন। বিড়ালটি তখন হুট করে বেরিয়ে পড়ে। এই দৃশ্য দেখে মহানবী তাকে আদর করে ‘আবু হুরায়রা’ বা ‘বিড়াল ছানার পিতা’ বলে ডাকলেন। এরপর আব্দুর রহমান নামধারী এই সাহাবি দুনিয়াজুড়ে আবু হুরায়রা নামেই পরিচিতি পান। আর এই আবু হুরায়রা (রা.) ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী।
দেড় হাজার বছর আগে ‘বিড়াল ছানার পিতা’ খ্যাতি পেয়ে এক আরব্য ব্যক্তি যেমন গর্ব করে নিজের পরিচয় দিতেন, সেই সৌদি আরবের পথে-ঘাটে, বাড়ির লনে কিংবা ঘরের আরাম কেদারায় বিড়াল থাকবে না, তা কী করে হয়! তবে দেশটির পথে-ঘাটে কিংবা ঝোপের আড়ালে যেসব বিড়াল দেখেছি, বেশির ভাগই বাদামি বা ধূসর ডোরাকাটা। বিড়ালগুলোর পশম খুব ছোট, মসৃণ এবং চকচকে; যা মরুভূমির গরম আবহাওয়া মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। স্থানীয়দের ভাষায় এসব বিড়ালের নাম অ্যারাবিয়ান মাউ।
অ্যারাবিয়ান মাউয়ের মিঁউ মিঁউ ডাক আর হিস হিস শব্দের সকাল বারবার যেন টেনে নিয়ে যায় ইসলামের শুরুর দিনগুলোতে। সৌদি আরবে যারাই আসেন, সম্ভবত সবাই এমন একটা টান অনুভব করেন। পুরোনো দিনের। কিংবা আরব্য রজনীর অলিগলির। পুরোনো দিনের কথা শুনতে ঘুম থেকে অনেকটা টেনেই তুলি লিটন ভাইকে। তিনি প্রায় ত্রিশ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন এই মরুর দেশে। চোখ কচলাতে কচলাতে বলেন, ‘১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে আল-মুশরিফা শহরের এই আবাসিক এলাকাগুলো গড়ে ওঠে। সেই সময়ে, আল-মুশরিফার ঘরবাড়ির মাঝখানে খোলা মরুভূমির কিছু অংশ ছিল; স্থানীয় শিশুরা সেখানে খেলাধুলা করত। তখন রাস্তাগুলো এমন পিচঢালা ছিল না। ধুলো উড়ত পায়ে পায়ে।’
লিটন ভাইয়ের কথার মাঝে বন্ধু মুন্না চলে এলো। এখনই আমাদের যেতে হবে অনুষ্ঠানে। কী অনুষ্ঠান? সে না হয় পরে বলছি! তার আগে চলুন, ঘুরে আসি জেদ্দার রেড সি তথা লোহিত সাগরের তীর থেকে।
জেদ্দা ঘাটে এক বেলা
বাংলাদেশি প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক ও ভ্রামণিক সৈয়দ মুজতবা আলী ও তার সহযাত্রীরা যখন আরব সাগর, লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে সুয়েজ খাল ভেদ করে ভূমধ্যসাগরের ওপর দিয়ে বিলেত যাত্রা করতেন, তখন জাহাজগুলো বেশ খানিকটা সময় নিয়ে যেখানে নোঙর ফেলত, সেটিই জেদ্দা ঘাট। সে সময় এই ঘাট থেকে জাহাজের গা বেয়ে পিপীলিকার মতো মুচি-মজুর থেকে ক্ষৌরকার, চর্মকারেরা লাইন দিয়ে উঠতেন। জাহাজের যাত্রীরাই যে তাদের উপার্জনের মাধ্যম। এমনকি কাপড়ের গাট্টি মাথায় নিয়ে দর্জিরাও উঠে পড়তেন তখন। রাজ্যের দর-কষাকষি শেষে যাত্রীদের পছন্দসই কাপড় দিয়ে পোশাক বানিয়ে গায়ে পরিয়ে তবেই তারা নামতেন জাহাজ থেকে।
আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে এই ঘাট ঘিরে গড়ে ওঠে সাধারণ এক জেলেপল্লি। তখন এই জনপদের সম্পদ বলতে কিছু খেজুরগাছ, তারও পরে ইসলামের আবির্ভাবে হজে আসা যাত্রীদের কাছ থেকে বাণিজ্য আয় আর লোহিত সাগরে ধরা মাছ। দিনে দিনে সুয়েজ খাল চালু হলো। ফুলে-ফেঁপে উঠল জেদ্দা ঘাটের ইতিহাস। তারও পরে সৌদি অর্থনীতিতে পেট্রো ডলার যুক্ত হতেই পুরো দেশের উন্নয়নের সঙ্গে এই নগরী জেগে উঠল দুর্দান্ত প্রতাপে! বর্তমানে এই জেদ্দাই দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী, শিল্পনগরী এবং প্রধান সমুদ্রবন্দর। দেশের অর্থনৈতিক রাজধানীও এটি। সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং ব্যস্ততম বিমানবন্দরও এখানেই। জেদ্দায় প্রায় অর্ধকোটি লোকের বসবাস। পাহাড়, সমুদ্র আর মরুভূমিবেষ্টিত একটি শহরে এত লোকের বাস, ভাবা যায়!
সরু গলি ধরে আরব্য রূপকথার পথে
শৈশবে গ্রামের স্কুলের সহপাঠী মুন্না। জেদ্দায় এসে তার বিলাসবহুল জিএমসি ইউকন ২০২৫ ভার্সনের গাড়িতে যখন পিচঢালা পথ ধরলাম, মনে হলো আমরা শৈশবের দিনগুলোর দিকেই যেন ছুটছি। কত কত জমানো গল্প ডানা মেলতে থাকে! মুন্না থেকে থেকে বলে, ‘বাইরে দেখ।’ গাড়ির জানালায় চোখ রেখে পথের দুপাশে আনমনে খুঁজতে থাকি—শুষ্ক পাহাড়, মরুভূমি, বালিয়াড়ি, ক্বচিৎ মরূদ্যান কিংবা মরু জাহাজের পাল। কিন্তু না; কিছু খেজুরগাছ, পেট্রো ডলারের দাপুটে উন্নয়ন আর সুরম্য অট্টালিকা শোভিত পথের দুপাশ। সৌদি সরকারের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশটি পর্যটন খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। তারই অংশ হিসেবে নতুন হাওয়া লেগেছে জেদ্দায়। একটু এগোতেই স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে মুন্না বলে, ‘বন্ধু, দেখ, এটা গলাকাটা মসজিদ।’ কিছুটা নড়েচড়ে বসি। বলি, ‘এখানেই তবে অপরাধীদের শিরচ্ছেদ করা হয়?’ সে বলে, ‘হুম্। তবে এখন আর তেমন দেখা যায় না!’
গাড়ি চলছে। পাশেই নয়নাভিরাম লেক। অসংখ্য শপিং মল। আমার পর্যটন মন যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, লোহিত সাগরের তীরে সৌদি আরবের সাংস্কৃতিক রাজধানী জেদ্দার বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছি। চলতে চলতে জেদ্দার পুরোনো শহর আল বালাদে ঢুকে পড়েছি। ইউনেসকো স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী এই বালাদে শত বছরের পুরোনো বাড়ি, সরু গলি ও ঐতিহাসিক মসজিদ যেন বয়ে বেড়াচ্ছে আরব্য রজনীর গল্পকথা। গাড়ি থেকে নেমে, সরু গলি ধরে আমিও আরব্য রূপকথার পথে হাঁটা ধরলাম!
পৃথিবীর প্রথম মানবীর ঘুম
কথিত আছে, পুরোনো এই শহরেই পৃথিবীর প্রথম মানবী ঘুমিয়ে আছেন! শহরটির নাম যে জেদ্দা; সেই নামের উৎসও পৃথিবীর প্রথম মানবী মা হাওয়া থেকে। ‘জাদ্দা’ আরবি শব্দ। যার অর্থ দাদিমা। হযরত হাওয়াকে (আ.) মুসলিম দুনিয়ার ‘দাদিমা’ হিসেবেও গণ্য করা হয়; সে হিসেবে মা হাওয়ার শহরের নামকরণ ‘জেদ্দা’। পৃথিবীর প্রথম মানবীর অস্তিত্বই যেন সাগর-পাহাড় আর শুষ্ক মরুর বুকে পর্যটকদের সুশীতল ঝরনাধারার সুখ বিলিয়ে বেড়াচ্ছে। দুই বন্ধু গেলাম তার খোঁজে। ছোট্ট একটি মসজিদ। পাশেই তিনি ঘুমিয়ে আছেন! যদিও স্থানীয়রা স্বীকার করতে চান না যে এই স্থানেই ঘুমিয়ে আছেন পৃথিবীর প্রথম মানবী।
লাল সাগরের তীরে
ঘুরতে ঘুরতে কখন যে সময় শেষ বিকেলে গড়াল, বুঝতে পারিনি। দীর্ঘ ক্লান্তি ভুলে লোহিত সাগরের পাড়ঘেঁষা নান্দনিক সড়ক ধরে লং ড্রাইভের মতো ঘুরছি আমরা। দেশ থেকে আসার সময় আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সকে ইন্টারন্যাশনাল করে নিয়েছি, যেন বিদেশে গাড়ি চালাতে সমস্যা না হয়। মুন্নার সঙ্গে স্টিয়ারিং হুইল ভাগাভাগি করলাম। আমরা লং ড্রাইভে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি চলতে চলতে। এরই মধ্যে চোখে পড়ে পশ্চিমা পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ইয়ট ক্লাব। তার পাশেই লোহিত সাগরের পানির ওপর আধুনিক স্থাপত্যকলায় নির্মিত দৃষ্টিনন্দন আর-রহমা মসজিদ। শ্বেতপাথরের মসজিদটি সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক দেখিছি। এই প্রথম সামনাসামনি দেখতে পেলাম। ১৯৮৫ সালে লোহিত সাগরের তীরে গড়ে ওঠে এই মসজিদ। দূর থেকে মনে হয়, পানির বুকে ভাসছে কোনো কাগুজে স্থাপনা। শেষ বিকেলের কনে দেখা আলোর স্বর্ণালি আবেশ মসজিদটিকে স্বর্গীয়রূপে প্রকাশ করছে। শুধু তা-ই নয়, সকালের কোমল স্নিগ্ধ আলো, দুপুরের কাঠফাটা রোদ আর রাতের কৃত্রিম আলোয়ও আলাদা রূপে ধরা দেয় এই অনন্য স্থাপনা। একে কেন্দ্র করেই জেদ্দার উপকূল পেয়েছে নতুন স্বকীয়তা। ২ হাজার ৪০০ বর্গমিটার আয়তনের মসজিদটি যেন সমুদ্রে ভাসমান জাহাজ। এর নীলাভ গম্বুজ সাগরের ঢেউয়ে দোল খেয়ে বেড়ায়। দূর থেকে চোখে পড়ে এর সুউচ্চ মিনার। জোয়ারে পানির উচ্চতা বাড়লে মসজিদের নিচের পিলারগুলো প্রায় পুরোপুরি ডুবে যায়। দূর থেকে তখন মনে হয়, এটি সাগরেই ভাসছে। গম্বুজ, মিনার, খিলান ও বৈচিত্র্যময় জ্যামিতিক নকশা এই মসজিদকে ঐতিহ্যের ধারায় যুক্ত করেছে। এর পাশের খোলা জায়গায় অনেকে পরিবার নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। শিশুরা ছোটাছুটি করছে। একটু এগিয়ে সাগরের কোল ঘেঁষে ঢেউ গুনি; কখনো হেঁটে, কখনো আবার দূর থেকে শেষ বিকেলের স্নিগ্ধ বাতাস আর মসজিদের আলোর স্বপ্নিল পরিবেশে নিজেকে ডুবিয়ে অন্য কোনো আলোর খোঁজ করতে থাকি। যে আলোতে ঝাপসা হতে হতে পষ্ট ভেসে ওঠে লোহিত সাগরের অপার্থিব কনেরা!
সবচেয়ে উঁচু কৃত্রিম ঝরনায়
লোহিত সাগরের কনেদের ঘোর কাটিয়ে সি পোর্ট ধরে এগোতেই দূর থেকে চোখে পড়ে কিং ফাহাদ ফাউন্টেন। এই ঝরনারও দারুণ ক্ষমতা। রাজ্যের মানুষকে জড়ো করেছে নিজ সৌন্দর্য বিলিয়ে দিতে। পানি ছোড়ার গতি দেখে অবাক হয়ে তড়িঘড়ি গুগল করে দেখি, এটিই বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু কৃত্রিম ঝরনা। ১ হাজার ২৪ ফুট উচ্চতায় পানি ছোড়া এই ঝরনার চারপাশে ৫০০ স্পটলাইট দিনের আলোর মতো আলো বিলাচ্ছে। চলতে চলতে জেদ্দা পোর্ট লাইটহাউস ও ল্যান্ড পার্ক ঘুরে জেদ্দা কর্নিশ বা জেদ্দা ওয়াটারফ্রন্টের রাস্তায় হাঁটতে থাকি। স্থানীয়দের কাছে এই কর্নিশ খুবই প্রিয় স্থান। দিনের আলো নিভতেই তারা পরিবার আর খাবারের তল্পিতল্পা নিয়ে জড়ো হতে থাকেন এখানে। তারপর গল্প-আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়ায় রাত গড়াতে থাকে গভীরের দিকে। তারাও রাতের গভীর থেকে নিজেদের সরিয়ে ধরেন বাড়ির পথ। ভোর ও সন্ধ্যায় এই কর্নিশের রূপ আলাদা। মূলত লোহিত সাগরই এই স্থানকে প্রতিটি প্রহরে অনন্য রূপে রাঙিয়ে তোলে। সে যাক, লোহিত সাগরের ঠান্ডা বাতাস শরীরে অন্য রকম এক ভালো লাগা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
গাওয়া, মুতাব্বাক, খেবসা, মান্দি ও কুনাফা
সেই ভালো লাগা গায়ে মেখে আবার এগিয়ে যাই লোহিত সাগরের কোলঘেঁষা ৫০০ বছরের পুরোনো নিদর্শনের বালাদ শহরে। এখানে এসেছি আরবের ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় খাবারের স্বাদ নিতে। বসলাম ঐতিহ্যবাহী এক রেস্তোরাঁয়। ওয়েটার শুরুতেই দিয়ে গেলেন ওয়েলকাম ড্রিংকস—গাওয়া। এটি আরবের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী পানীয়। অ্যারাবিয়ান কফিও বলা হয় একে। এলাচি, জাফরান ও বিভিন্ন মসলা মিশিয়ে তৈরি। চুমুক দিতেই যেন দিনের সব ক্লান্তি উড়ে গেল লোহিত সাগরের দিকে!
এরপর আসে সান্ধ্য নাশতা—মুতাব্বাক। শুধু সৌদি আরব নয়; ইয়েমেন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, থাইল্যান্ডেও ভীষণ জনপ্রিয় এই সুস্বাদু খাবার। দেখতে অনেকটা পরোটার মতো। স্থানীয়রা সন্ধ্যাকালীন নাশতা হিসেবে খেয়ে থাকেন।
এরই মধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রিয় বড় ভাই আব্দুল মজীদ লিটন। জানতে চাইলেন, ‘এবার কী খাবে, বলো?’ বললাম, পেট ভরে গেছে। আর লাগবে না।’ তিনি নাছোড়বান্দা। বললেন, ‘মান্দি না খেবসা? শোনো, খাবারের বর্ণনাটা দিই, তারপর না হয় পছন্দ করো।’ এই বলে তিনি বর্ণনা দিতে থাকেন, ‘মান্দি খেতে পারো। এটি সৌদি আরবের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মজার খাবার। এর স্বাদ মুখে লেগে থাকে। মাটির নিচে বিশেষভাবে রান্না করা ভাত ও মাংসের মিশ্রণে তৈরি। আরও খুলে বলি, মাটিতে গর্ত করা চুলায় কয়লা দিয়ে সেই আগুনের তাপে ভাত ও মাংস সেদ্ধ করা হয়। ভাতের মধ্যে দারুচিনি, এলাচি, কিশমিশ যোগ করা হলেও মাংসে কোনো মসলা দেওয়া হয় না। খাসি বা দুম্বা জবাই শেষে পরিষ্কার করে তাতে লবণ আর তেল মাখিয়ে আস্ত শরীরটাই চুলার ওপর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। চুলার নিচে ভাতের পাতিল থাকে, আর ওপরে ঝুলন্ত খাসি বা দুম্বা। চুলার প্রচণ্ড তাপে খাসি বা দুম্বার চর্বি গলে নিচে ভাতের ওপর পড়তে থাকে। এ জন্যই মান্দির স্বাদ হয়ে ওঠে আরও লোভনীয়!’
এমন করে খাবার রান্না হতে পারে, আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। এরই মধ্যে তিনি খেবসার বর্ণনা শুরু করলেন, ‘শোনো মিয়া! খেবসা সৌদি আরবের আরেক জনপ্রিয় খাবার। আমরা তো বাঙালি; ভাত আমাদের প্রিয় খাবার। এটিও ভাত দিয়ে তৈরি। তবে এই ভাতে বাসমতী চাল ও বিশেষ মাংসের মিশ্রণ থাকে। মুরগি, গরু, ভেড়ার মাংস, এমনকি মাছ দিয়েও তৈরি করা হয় খেবসা। বিরিয়ানির মতো অল্প মসলা ও তেল ব্যবহারে খাবারটি রান্না করা হয়। অনেকে হয়তো জানেন না, খেবসা সৌদি আরবের জাতীয় খাবার। খেলেই বুঝতে পারবে, কী এর কারণ। এবার বলো, কোনটা খাবে?’
আমি জাতীয় খাবারটিই বেছে নিলাম। লিটন ভাই তাই অর্ডার করলেন; তবে সঙ্গে একটি মান্দিও অর্ডার করে বললেন, ‘ওই খাবারটারও স্বাদ নিতে পারো।’ আমরা তিনজন ভাগাভাগি করে খেলাম। তবু খেতে খেতে হাঁপিয়ে উঠলাম। তবে খুবই সুস্বাদু। সব শেষে এলো কুনাফা। এটি মূলত খাবার শেষে দেওয়া হয়; পনির ও চিনির শিরা দিয়ে তৈরি বিখ্যাত মিষ্টান্ন।
রেড সি মলে
খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ গল্প করে জেদ্দার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বিলাসবহুল রেড সি মলে ঢুঁ মারলাম। পেট টইটম্বুর। তাই কেনাকাটায় মন না দিয়ে, শপিং মলটির অসাধারণ অবকাঠামো এবং দারুণ ইন্টেরিয়রে চোখ রেখে মুগ্ধ হতে থাকি। বিশ্বের সেরা ব্র্যান্ডের বিভিন্ন শোরুম, বিলাসবহুল ক্যাফে এবং রেস্টুরেন্ট—কিছুই তখন আর টানে না আমায়! লিটন ভাই বললেন, ‘চলো, কাল সন্ধ্যার পর আবার আসা যাবে। এখন গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল আবার তোমার অনুষ্ঠান।’
আরে, সত্যিই তো; লোহিত সাগরের মুগ্ধতা আর দীর্ঘ ক্লান্তিতে ভুলেই বসেছি, রেড সি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের কথা!
চলচ্চিত্র উৎসব প্রাঙ্গণে
এই লোহিত সাগরের পাড়ে ২০২১ সালে শুরু হয় রেড সি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। তারপর থেকে নিয়মিতই আয়োজিত হচ্ছে। উৎসবে লোহিত সাগরপারের দেশগুলোই অংশ নেয়। এর মাধ্যমে সৌদি তরুণদের চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ছবির আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বাজারও তৈরি করছে সরকার। এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আমন্ত্রণেই আমি ঢাকা থেকে উড়ে আসি জেদ্দায়। গেল ডিসেম্বরে উৎসবের পঞ্চম আসরে যোগ দিয়ে বুঝতে পেরেছি, চলচ্চিত্রে সৌদি সরকার ইরানকে মডেল ধরে তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। মানে চলচ্চিত্র দিয়ে ইরান যেভাবে বিশ্বদরবারে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে, তাদের মতো সৌদি আরবও চাচ্ছে চলচ্চিত্রকে কোমল শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে। এই আয়োজনে যুক্ত হয়ে এ-ও বুঝতে পেরেছি, সৌদি আরবই চলচ্চিত্রের নতুন কেন্দ্র হতে যাচ্ছে আগামীতে!
বছরের শেষ আলোয় লোহিত সাগরের পাড় থেকে ঘুরে এলেও এখনো যেন পুরোনো জেদ্দা শহরের আয় আয় ডাক কানে এসে লাগছে। সমুদ্রের স্নিগ্ধ বাতাস, হাজার বছরের চেনা মরু পথ, পুরোনো ভবনের পলেস্তারা আর আধ্যাত্মিকতার এই আবেগপ্রবণ সংযোগের শহর স্মৃতির ঘরে নিয়ন আলোর মতো জ্বলতেই থাকবে হয়তো অনন্তকাল!
ছবি: লেখক ও ইন্টারনেট
