ফিচার I বিশদে টফু বিরিয়ানি
ভারতীয় উপমহাদেশের ভোজসভায় বিরিয়ানির রয়েছে আলাদা মর্যাদা। যেকোনো অনুষ্ঠানের ভোজে এনে দেয় অভিজাত স্বাদ, খাবারে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। তাতে টফু যোগ বেশ ট্রেন্ডি
বিরিয়ানি নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের আবেগ, উৎসব ও ঐতিহ্য। লম্বা আকারের চাল, গভীর সুবাস ছড়ানো মসলা আর দমে ওঠা ধোঁয়া—সব মিলিয়ে বিরিয়ানি মানেই রাজকীয়তা। ইতিহাসের পাতায় মূলত মাংসনির্ভর খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যবোধ ও জীবনদর্শনের পরিবর্তনে এটিও পেয়েছে নতুন রূপ। এই পরিবর্তিত ধারার অন্যতম আধুনিক ও জনপ্রিয় সংযোজন টফু বিরিয়ানি, যেখানে ঐতিহ্যবাহী স্বাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্য ও সচেতনতার ছোঁয়া।
প্রয়োজন থেকেই টফু বিরিয়ানির উদ্ভব। এর নির্দিষ্ট কোনো আবিষ্কারক বা জন্মক্ষণ জানা নেই। মূলত একটি সামাজিক ও খাদ্যসংস্কৃতির বিবর্তনের ফল এটি। বিরিয়ানি যেখানে ঐতিহাসিকভাবে মোগল দরবারের মাংসভিত্তিক খাবার হিসেবে পরিচিত, সেখানে টফু এসেছে একেবারে ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে। এর উৎপত্তি চীনে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে। সয়াবিন থেকে তৈরি এই খাবার ধীরে ধীরে পূর্ব এশিয়া ছাড়িয়ে পশ্চিমা বিশ্বেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ্বজুড়ে নিরামিষ ও ভেগান খাদ্যাভ্যাসের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে শুরু করে। একই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাণিজ প্রোটিনের বিকল্প অনুসন্ধান এবং বৈচিত্র্যময় রান্নার চাহিদা তৈরি হয়। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে নিরামিষ শেফ ও হোম কুকরা ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানিতে মাংসের বিকল্প হিসেবে টফু ব্যবহার শুরু করেন। ফলাফল—টফু বিরিয়ানি।
খাবারটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর পুষ্টিগুণ। মাংসনির্ভর বিরিয়ানির তুলনায় টফু বিরিয়ানি অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ ও হালকা। টফু মূলত উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের একটি উৎকৃষ্ট উৎস। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, যা পেশি গঠনে সহায়ক। ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম, যা হাড় ও দাঁতের জন্য উপকারী। আয়রন, যা রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সাহায্য করে। আইসোফ্ল্যাভোন, যা হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখে। অন্যদিকে, বিরিয়ানিতে ব্যবহৃত বাসমতী চাল সহজপাচ্য কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ এবং দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখতে কাজে দেয়। আর বিভিন্ন মসলা; যেমন হলুদ, দারুচিনি, এলাচি ও লবঙ্গ শুধু স্বাদই নয়; বরং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণও যোগ করে। পরিমিত ঘি ও তেল ব্যবহার করা গেলে টফু বিরিয়ানি হয়ে ওঠে একটি পরিপূর্ণ ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রধান খাবার।
আধুনিক জীবনে খাবার শুধু ক্ষুধা মেটানোর বিষয় নয়; স্বাস্থ্যকর জীবনধারা ও সচেতনতারও প্রতিচ্ছবি। টফু বিরিয়ানির প্রয়োজনীয়তা ঠিক এখানেই। প্রথমত, ক্রমবর্ধমান ভেজিটেরিয়ান ও ভেগান জনগোষ্ঠীর জন্য এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও উৎসবমুখর খাদ্যপদ। আগে নিরামিষভোজীরা অনেক সময় সামাজিক অনুষ্ঠানে মূল আকর্ষণ থেকে বঞ্চিত হতেন। টফু বিরিয়ানি সেই শূন্যতা পূরণ করেছে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীবনযাত্রাজনিত রোগ বাড়ার ফলে অনেকে এখন স্বল্প ফ্যাট ও কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবারের দিকে ঝুঁকছে। টফু বিরিয়ানি এই চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই। তৃতীয়ত, পরিবেশগত দিক থেকে এই খাবার গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণিজ প্রোটিনের তুলনায় উদ্ভিজ্জ প্রোটিন উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ ও পানির ব্যবহার হয় কম। ফলে এটি একটি টেকসই খাদ্য বিকল্প হিসেবেও বিবেচিত।
একসময় টফু বিরিয়ানি সীমাবদ্ধ ছিল নিরামিষ রেস্তোরাঁ বা হোম কিচেনের মধ্যে। এখন দৃশ্যপট বদলেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বড় শহর, এমনকি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভারতীয় রেস্তোরাঁতেও নিয়মিত মেনুতে জায়গা করে নিচ্ছে বিরিয়ানির এই পদ। ফুড ভ্লগ, ইউটিউব কুকিং চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়া এই জনপ্রিয়তায় বড় ভূমিকা রেখেছে। স্বাস্থ্যবান্ধব, ভেজিটেরিয়ান ও ফিউশন খাবারের ট্রেন্ডে টফু বিরিয়ানি এখন পরিচিত নাম। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, খাবারটি শুধু নিরামিষভোজীদের মধ্যেই নয়; মাংসপ্রেমীদের মাঝেও কৌতূহল ও আগ্রহ তৈরি করেছে। একবার সঠিকভাবে রান্না করা এ খাবার খেলে অনেকে স্বীকার করেন, স্বাদের দিক থেকেও এটি কোনো অংশে কম নয়।
স্বাদ, পুষ্টি, পরিবেশ ও সংস্কৃতি—সব দিক থেকে এটি সমসাময়িক খাবার। হয়তো ভবিষ্যতে বিরিয়ানি বললেই শুধু মাংসের কথা মনে পড়বে না; টফু বিরিয়ানিও সমান মর্যাদায় জায়গা করে নেবে আমাদের ডাইনিং টেবিলে।
ফুড ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট
