skip to Main Content

বহুরূপী I প্রিয় পাকোড়া

বৃষ্টি নামলে, বিকেলের আড্ডায় বা শাকাহারিদের থালায় কিংবা অতিথি আপ্যায়নে—পাকোড়া একাই এক শ। বাঙালি ও ভারতীয় উপমহাদেশের খাদ্যসংস্কৃতিতে বহুকাল ধরে জড়িয়ে আছে। ডালের বেসন, চালের গুঁড়া কিংবা মসুর ডালের মিশ্রণে তৈরি এই ভাজা খাবার অঞ্চল, উপকরণ ও স্বাদের তারতম্যে নানা রূপ ধারণ করেছে। প্রতিটি পাকোড়ার আছে আলাদা গল্প, ঘ্রাণ আর স্বাদ।
আলু পাকোড়া সবচেয়ে পরিচিত। মসলা মাখানো বেসনে পাতলা করে কাটা আলু ডুবিয়ে গরম তেলে ভাজা হলে, আহা! বাইরের অংশ হয় খাস্তা; ভেতরটা নরম। কাঁচা মরিচ বা ধনেপাতার চাটনি সঙ্গে থাকলে তো কথাই নেই। সাধারণ উপকরণে তৈরি হলেও এর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে।
পেঁয়াজু বা পেঁয়াজ পাকোড়াকে ইফতারির রাজা বলা যায়। পাতলা করে কাটা পেঁয়াজ, বেসন, কাঁচা মরিচ ও মসলা মিশিয়ে ছোট ছোট পাকোড়া ভাজা হয়। মসুর ডালের পেঁয়াজুর মতন সুস্বাদু। ইফতারে হোক কিংবা সন্ধ্যার নাশতায়, মুহূর্তেই প্লেট হয়ে যায় খালি। পেঁয়াজের প্রাকৃতিক মিষ্টতা আর ভাজার সময় তৈরি হওয়া সুবাস একে আলাদা মাত্রা দেয়। কেউ কেউ এতে সামান্য চালের গুঁড়া যোগ করে আরও খাস্তা করে তোলেন; তবে একটু মুড়মুড়েও কিন্তু খারাপ নয়।
বেগুনি বা বেগুন পাকোড়া বাঙালির নিজস্ব গর্ব। বেসনের আবরণে ভাজা হয় লম্বা করে কাটা বেগুন, ব্যস! সরল এই পাকোড়ার স্বাদ নির্ভর করে বেগুনের মান ও তেলের তাপমাত্রার ওপর। মিক্স পাকোড়ার স্বাদের মাঝে, বেগুন একাই যেন এক শ।
শাকপাতা দিয়েও এ দেশে তৈরি হয় নানা ধরনের পাকোড়া। মসলা ও বেসনের সঙ্গে পালংশাক, লালশাক বা কচুশাক, ধনেপাতা, কুমড়ো ফুল মিশিয়ে ভাজা হয় শাকের পাকোড়া। এতে পুষ্টিগুণ যেমন বজায় থাকে; ভাজা খাবারের মজাও মেলে আরামসে। সবজি খেতে অনীহা যাদের, শাকের পাকোড়া হতে পারে তাদের জন্য আদর্শ সমাধান। খেয়েছেন নাকি ধনেপাতার পাকোড়া কখনো?
ফুলকপি ও বাঁধাকপি পাকোড়াও কম জনপ্রিয় নয়। মসলা মাখিয়ে ফুলকপির ছোট ছোট টুকরো বা বাঁধাকপির কুচি ভাজা হলে তৈরি হয় সুস্বাদু পাকোড়া। বিশেষ করে শীতকালে তাজা ফুলকপি দিয়ে তৈরি পাকোড়ার স্বাদ আলাদাভাবে অনুভূত হয়।
ডাল পাকোড়ার কথা না বললেই নয়! মসুর, মুগ বা ছোলার ডাল ভিজিয়ে বেটে তৈরি হয়। তুলনামূলক ভারী হলেও এটি প্রোটিন সমৃদ্ধ এবং পেট ভরানো খাবার। কোথাও কোথাও এতে পেঁয়াজ, জিরা বা আদা যোগ করে স্বাদ বাড়ানোর চল রয়েছে। আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে পাকোড়াকে বলে বড়া। ডালের বড়া থেকেই পাকোড়াকে এমন নামে ডাকার সূত্রপাত।
পাকোড়ার জগৎ বিচিত্র। পরিচিত কয়েকটির বাইরে আরও অনেক ধরনের পাকোড়া আছে, যেগুলো স্বাদ ও উপকরণে ভিন্নতা এনে দেয়। চিংড়ি পাকোড়া বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়। ছোট চিংড়ি পরিষ্কার করে বেসন, রসুন, আদা ও হালকা মসলা মাখিয়ে ভাজা হয়। চিংড়ির স্বাভাবিক মিষ্টতা এবং বেসনের খাস্তা আবরণ একসঙ্গে মিলে এনে দেয় অনন্য স্বাদ। সন্ধ্যার নাশতা হিসেবে কিংবা অতিথি আপ্যায়নে চিংড়ি পাকোড়া বেশ সুস্বাদু ও মানানসই।
কলা পাকোড়া ভীষণ মজার এবং খানিকটা ভিন্ন স্বাদের উদাহরণ। কাঁচা বা পাকা কলা পাতলা করে কেটে বেসনে ডুবিয়ে ভাজা হয়। কাঁচা কলার পাকোড়ায় একটু লবণ যোগ করলে নোনতা ও মসলাদার, আর পাকা কলারগুলো হালকা মিষ্টি স্বাদের। চায়ের সঙ্গে এমন পাকোড়া অনেকের প্রিয়।
ডিম পাকোড়া তুলনামূলক ভারী ও পুষ্টিকর। সেদ্ধ ডিম অর্ধেক বা চাকা করে কেটে মসলা মাখানো বেসনে ডুবিয়ে ভাজা হয়। বাইরে খাস্তা আর ভেতরে নরম ডিমের স্বাদ শিশুদের প্রিয়। ইফতার বা বিকেলের ক্ষুধা মেটাতে ডিম পাকোড়ার লোভ সামলানো বড়দের পক্ষেও মুশকিল!
কচু পাকোড়া গ্রামবাংলার এক ঐতিহ্যবাহী খাবার। কচুর ডগা বা কচুপাতার কুচি মসলা ও বেসনের সঙ্গে মিশিয়ে ভাজা হয়। সঠিকভাবে রান্না করলে খেতে অস্বস্তি লাগে না; বরং বিশেষ ঘ্রাণ ও স্বাদ সৃষ্টি করে। বিশেষত বর্ষাকালে গ্রামবাংলার অনেক বাড়িতেই এমন পাকোড়া তৈরির ধুম পড়ে।
লাউ পাকোড়া হালকা ও সহজপাচ্য বিকল্প। লাউকুচি বা পাতলা করে কেটে বেসনের সঙ্গে মিশিয়ে ভাজা হয়। যারা খুব ঝাল বা ভারী খাবার পছন্দ করেন না, তাদের জন্য এটি আদর্শ পাকোড়া। একটু সবজি ধরনের স্বাদের হলেও ভাজা খাবারের আনন্দ পুরোপুরি মেলে এতে।
আধুনিক সময়ে চিজ পাকোড়া, চিকেন পাকোড়া কিংবা ফিশ পাকোড়ার মতো নতুন ধরনের পাকোড়াও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী বেসনের সঙ্গে নতুন উপকরণের মেলবন্ধনে পাকোড়া এখন স্ন্যাকস থেকে হয়ে উঠেছে পাতের অন্যতম বাহারি পদ।

 ফুড ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top