skip to Main Content

ফিচার I ওয়াও রুবি য়ু

ফটোগ্রাফ-রেডি পাউট অথবা ডেইলি লুক—সবখানে দুই ছক্কা পাঁচ! টুকটুকে লাল, অথচ অদ্ভুত এক উপায়ে মানিয়ে যায় সবার ঠোঁটে। তাই আরেক নাম ইউনিভার্সাল রেড। বিশ্ব ছড়িয়ে হাজার লালের ভিড়ে অসংখ্য নারীর ঠোঁটের গল্প এসে থেমেছে এই রুবি য়ুতেই

ম্যাক কসমেটিকসের বেস্টসেলিং লিপস্টিক শেড, রুবি য়ু। কাল্ট ক্ল্যাসিক। গাঢ় শেডের লাল। নীলের আভা ম্লান। কমলা বা গোলাপির আধিপত্য নেই। টকটকে নয়; বরং রক্তিম। বলা যায় নিশ্চিন্ত লাল। ক্যাটকেটে দেখায় না; কিন্তু দারুণ ড্রামাটিক। ক্যামেরা-রেডি প্রজন্মের কাছেও অতুলনীয়।
রুশ টু রুবি
লাল লিপস্টিক ঘৃণা করতেন হিটলার। তার আদেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, অক্ষশক্তি জার্মানির নাৎসি নারীদের জন্য লাল লিপস্টিক ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অপবিত্র ও রুচিহীন হিসেবে দেখার অভ্যাস তৈরি করা হয়েছিল। ব্যাপারটিকে একটি নীরব অস্ত্রের মতো ব্যবহার শুরু করে মিত্রশক্তি। হিটলারকে বিরক্ত করতে সে সময় যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনে একযোগে মন দেওয়া হয় লাল লিপস্টিক ব্যবহারে। দেশপ্রেমের প্রকাশ হিসেবে লাল ঠোঁট তখন জুতসই উদাহরণ। রাজনীতি সেখানে এতটাই শক্তিশালী ভূমিকা রাখে, ফলে লাল লিপস্টিক উৎপাদনের জন্য অনুদানও দেয় দেশগুলোর সরকার। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল ভিক্টোরি রেড, ফাইটিং রেডসহ ইত্যাদি বেশ কয়েকটি উদ্যমী নামের শেড। প্রতিবাদ, শক্তি এবং সংহতি প্রকাশ করে উর্দির সঙ্গে লাল লিপস্টিক পরতেন মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে যাওয়া নারী সৈন্যরাও।
শেষ হয় যুদ্ধ, কিন্তু নারীদের ঠোঁটে মুক্তি আর প্রতিবাদের ভাষা রূপে রয়ে যায় রেড; বিশেষ করে টকটকে লাল। বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শেষ সময়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল লিপস্টিকের ফর্মুলা নিয়ে। প্রতিনিয়ত নতুন ফর্মুলা বাজারে আসে। সেই সঙ্গে নিত্যনতুন প্রসাধনী ব্র্যান্ডও নাম লেখাতে শুরু করে। সেই দলেই ছিল ম্যাক। ১৯৮৪ সালে কানাডার টরন্টোতে আলোকচিত্রী ও মেকআপ আর্টিস্ট ফ্র্যাঙ্ক টোস্কান ও ফ্র্যাঙ্ক অ্যাঞ্জেলোর উদ্যোগে যাত্রা শুরু ব্র্যান্ডটির। গ্রাহকের চাহিদা বুঝে শুরু থেকে জোর দেয় বাস্তবসম্মত প্রসাধনী তৈরিতে। রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ম্যাকের লিপস্টিক শেড—রাশিয়ান রেড। টুকটুকে লাল এই শেড দেখা যেত তারকাদের ঠোঁটে। ছিল সংগীত তারকা ম্যাডোনার প্রিয় লাল লিপস্টিক। ফলে দ্রুতই হয়ে উঠেছিল নারীদের মাস্ট-নিড লিপস্টিকগুলোর একটি। তবে একটিই খুঁত ছিল এই রেডের—শুধু ফরসা ত্বকেই মানাত। কিন্তু দুনিয়াতে কি শুধু টকটকে ফরসা মানুষেরই বসবাস? পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি লোক বসবাস করে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে। তাদের স্কিন টোন সাধারণত মিডিয়াম থেকে ডার্ক ব্রাউন। ফেয়ার স্কিন টোনের মানুষের বসবাস শুধু উত্তর ইউরোপে এবং এশিয়ার কিছু অংশে। সংখ্যায় ব্রাউনের তুলনায় বহুগুণ কম। তাই বর্ণ ভেদাভেদের প্রশ্নে না পড়ার প্রয়াস ছিল ম্যাকের। ১৯৯৯ রেট্রো ম্যাট লিপস্টিক লাইনের আওতায় একটি অন্য রকম লাল শেডের লিপস্টিক তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। কিছুটা গাঢ় শেডের। দ্রুত এর জনপ্রিয়তা ছাড়িয়ে যায় রাশিয়ান রেডকেও।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দৈনিক নিউজলেটার ফ্যাশনিস্তায় ম্যাকের মেকআপ আর্টিস্ট্রির পরিচালক গ্রেগরি আরল্ট বলেন, ‘যখন প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট টিম নতুন শেডটি ব্র্যান্ডের তৎকালীন ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর জেমস গেজার ও জেনিফার বালবিয়ারকে দেখায়, তারা বলেছিলেন, দারুণ একটা রং! এভাবেই জন্ম রুবি য়ুর।’ তিনি আরও জানান, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট টিম আসলে রাশিয়ান রেডের সঙ্গে মিল রাখার চেষ্টা করেছিল। একই পিগমেন্টের সংমিশ্রণ; শুধু ভিন্ন বেজ। কিন্তু রুবি য়ু ছিল একটু বেশি গাঢ় এবং প্রাণবন্ত। সেখানেই নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিতি।
ফর্মুলা ফ্যাক্ট
রুবি য়ু ম্যাট ফিনিশে তৈরি। ক্রিমি নয়। শাইনি না; গ্লসিও না। ফ্ল্যাট। পিগমেন্টেশন হাই। দীর্ঘ সময় টিকে থাকে। এনে দেয় বোল্ড ভেলভেটি লুক। তৈলাক্ত ত্বকে সহজে ব্যবহার উপযোগী। আর শুষ্ক হলে রুবি য়ুর আগে হাইড্রেটিং লিপ বাম দিয়ে প্রস্তুত করে নেওয়া যেতে পারে ত্বক। দীর্ঘস্থায়ী ফর্মুলা; সহজে ছড়ায় না।
শীর্ষে সমাদৃত
প্রায় তিন দশক ধরে লাল লিপস্টিকপ্রেমীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে রুবি য়ু। বছরে গড়ে ৬৫ হাজারের বেশি বিক্রি হয়, এমনটাই দাবি ম্যাক কসমেটিকসের। অর্থাৎ, প্রতিদিন প্রায় ১৮০টি, আর প্রতি ঘণ্টায় প্রায় আটটি রুবি য়ু কেনেন ক্রেতারা। খালি চোখে শনাক্ত করা যায় এই শেড। বিউটি এক্সপার্ট থেকে দেশি-বিদেশি সেলিব্রিটি ছাড়াও সাধারণ মেকআপপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। নীলচে লাল এই শেড বেশ চমকপ্রদ। উজ্জ্বল আভা ছড়ায় ত্বকে। দাঁত সাদা দেখায়। ভীষণ আকর্ষণীয় লাগে ক্যামেরায়। ফলে মডেল থেকে আলোকচিত্রী—রুবি য়ু জায়গা করে নিয়েছে বিউটি ইন্ডাস্ট্রির সব কোণেই। মার্কিন পপতারকা টেইলর সুইফটের অন্যতম প্রিয় শেড এটি। অন্যদিকে, বার্বাডিয়ান পপতারকা রিহানার তারুণ্য কেটেছে রুবি য়ু দিয়ে। দুজনের ত্বকের রঙে ভিন্নতা থাকলেও এই শেড মানিয়ে গেছে দারুণভাবে। রিহানার মতে, এর কারণ, লালের মধ্যে একধরনের শক্তি আছে। অবিরাম উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে চলছে বিউটি ইন্ডাস্ট্রি। পথে হারিয়েছে অনেক কিছুই। এরই মধ্যে জাদুকরি ক্ষমতাবলে টিকে গেছে রুবি য়ু। শুধু তা-ই নয়; সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে পসার। জনপ্রিয়তার পারদ প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী। ফ্যাসিবাদ হটিয়ে ফ্যাশনিস্তাদের মাস্ট নিড!

 আবৃতি আহমেদ
মডেল: আনিকা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: কৌশিক ইকবাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top